সুলতান মাহমুদের নগরে

কাবুল থেকে বিরাশি মাইল পাথুরে বন্ধুর পথ পেরিয়ে গোধুম রঙা ধুলি উড়িয়ে এগিয়ে চললো আমাদের গাড়ি। বহুদূর পর্যন্ত মহাসড়ক ছিলো পরিচ্ছন্ন। তেমন কোনো খানাখন্দ পড়েনি চলার পথে। থেকে থেকে আমাদের দৃষ্টি গিয়ে আছড়ে পড়ছিলো দূর পাহাড়ের গায়ে। অতঃপর পাহাড়ের গা বেয়ে দৃষ্টি নেমে গিয়ে স্থির হয়ে থাকে অবারিত ফসলের মাঠ আর প্রশস্ত উপত্যকার বুকে। উপত্যকার বুকের ঠিক মধ্যিখান দিয়ে বয়ে গেছে শীতল পানির পাহাড়ি এক ঝরনা। এই পাহাড়ি ঝরনাই উপত্যকাগুলোর প্রাণ। ঝরনার পানিতে তৃষিত থেকেই উপত্যকাগুলো হয়ে ওঠে সবুজ শ্যমলিমাময়। ফসলি জমির চাষাবাদের কাজেও ব্যবহৃত হয় এই ঝরনার স্বচ্ছ পানি।

উপত্যকার সবটুকু জমিনই ছিলো চাষযোগ্য। এবং জেনে আনন্দিত হলাম— আফগানিস্তানের কৃষকেরা এসব জমিন অনাবাদী ফেলে রাখে না। বরং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাকে আবাদ রাখে প্রতি মওসুমে। কাবুল থেকে গজনি পর্যন্ত সারি সারি ফসলের মাঠ। এখন অবশ্য তার সবই শুন্য পড়ে আছে। ফসল নেই কোনো জমিনে। অবশ্য চাষাবাদের মওসুম এটা নয়। এখানে ফসল ফলে গ্রীষ্মকালে। শীত চলে যাবার পর বরফ-গলা জলে জমিন যখন নরম ও উর্বর হয়ে ওঠে তখন হেসে ওঠে দিগন্তবিস্তৃত এইসব ফসলি জমিন।

এখানে জনপদ গড়ে ওঠে নদী ও ঝরনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে। নদী ও ঝরনাপ্রবাহ যেদিক থেকে বয়ে যায় তার কাছাকাছি তীরবর্তী স্থানে গড়ে ওঠে জনপদ। ফের যখন প্রকৃতিক কারণে এই নদী বা ঝরনাপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় কিংবা পরিবর্তিত হয়ে যায় তাদের গতিপথ জনপদও তখন সরে যায় অন্যত্র। যদি কখনও দেখা যায় নদী বা ঝরনাপ্রবাহ নিজের গতিপথ পাল্টে বিপরীত দিকে বইতে শুরু করেছে তখন জনপদও তাদের আসবাব পত্র সব তুলে নিয়ে সেই বিপরীত পাশে গিয়ে গড়ে তোলে তাদের নতুন বসতি। বাড়ি ঘর তোলা হয় সব কাঁচা মাটির দেয়াল করে। ঘরের ছাদও সাধারণত মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়। বর্ষা তো বলতে গেলে এ দেশে হয়ই না। ঘর বাড়ির ছাদ যে কারণে মাটির হলেও মজবুতভাবে টিকে যায় দীর্ঘদিন।

আমাদের চলার পথে উঁচু উঁচু পাহাড় এমনভাবে সামনে এসে পড়ছিলো একেকবার ভ্রম হচ্ছিলো—হয়তোবা সামনে আর রাস্তা নেই। তারপরও সামনে যদি যেতেই হয় এই পাহাড়গুলোকে টপকেই তবে যেতে হবে। কিন্তু যত সামনে এগোচ্ছিলাম আঁকাবাঁকা সরুপথ বেরিয়ে আসছিলো পাহাড়ের গা ঘেঁষে।

পেশোয়ার ও কাবুলের মধ্যবর্তী যে ভয়ঙ্কর রাস্তা আমরা দেখে এসেছি তার সামনে এই রাস্তাকে অবারিত খোলা প্রান্তর বলবো। কোথাও কোথাও অবশ্য রাস্তার মধ্যখানে খানাখন্দ পড়ছিলো। তবে তা অনায়াসে পেরিয়ে যাবার জন্যে পুলের ব্যবস্থা ছিলো। আমাদের চলার পথে এরকম খানাখন্দ কমই পড়েছিলো যা পেরোনোর জন্যে পুলের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে দুয়েকটি এমন বন্ধুর যায়গায় গিয়ে আমরা পড়েছিলাম আমরা যেখানে গর্ত তো ছিল বেশ গভীর এবং চওড়া তবে তা পেরোনোর জন্যে একদমই কোনো পুল দেওয়া ছিলো না তাতে; কিংবা পুল থাকলেও তা ছিলো অত্যন্ত ভঙ্গুর। এমন যায়গায় এলে গাড়ির ভেতরে বসে আমাদের মন শঙ্কিত হয়ে পড়তো—এমন খাদ পেরিয়ে গাড়ি সামনে এগোবে কীভাবে! এখানে আমাদের আফগানি ড্রাইভারের প্রশংসা করতেই হয়। এসমস্ত খানাখন্দ এলে গাড়ি এত মোলায়েমভাবে পার করিয়ে নিয়ে যেতো যে, সামান্য ঝক্কি ও আমরা টের পেতাম না।

পথিমধ্যে দুয়েকটি বড়সড় পাহাড়ের দেখা মিললো। সঙ্গের সেনা অফিসার জানালেন এসব পাহাড়ে প্রায় সারাবছরই সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা ক্যাম্প করে অবস্থান করে।

পণ্যবাহী বহু ট্রাককে টপকে গেলো আমাদের গাড়ি। বিপরীত দিক থেকেও বহু সময় পর পর আসছিলো মালবাহী ট্রাক। প্রাচীন পদ্ধতিতে উটের পিঠ বোঝাই করেও মালামাল বহনের দৃশ্য চোখে পড়লো। চোখে পড়লো বেশ কটি যাযাবর কাফেলা। কাফেলায় পুরুষ নারী ও শিশুরা পথ অতিক্রম করছিলো গাধার পিঠে করে। এসব কাফেলার সাথে পথ পাড়ি দিচ্ছিলো তাদের মোরগ, মুরগী এবং পাহারাদার কুকুর। দূর থেকে যাযাবরদের কাফেলা দেখতে ছিলো অত্যন্ত মনোরম।

দুপুরের সূর্য মাথার ওপর নিয়ে ছুটে চলছিলাম আমরা। তবে গরম তেমন অনুভূত হচ্ছিল না। বাতাসে বরং ছিলো শীতের একটা মিষ্টি আমেজ। গায়ে চাপিয়েছিলাম গরম পোশাক। তারপরও বাতাসের শৈত্য থেকে বাঁচার জন্যে গাড়ির কাঁচ উঠিয়ে দিয়েছিলাম।

একটা বিষয় আমাকে খুব অবাক করে—এতদূর পথ পেরিয়ে এলাম কিন্তু আকাশে একটা পাখি উড়তে দেখলাম না। ব্যাপারটা সত্যিই বিস্ময়ের। পাখিহীন জনপদ এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়লো না। পরক্ষণেই খেয়াল হলো—মাঠের পর মাঠ শূন্য পড়ে আছে। ফসলের ছিটেফোটাও কোথাও নেই। এসব কারণেই হয়তোবা সেখানকার আকাশ ছিল পাখিমুক্ত। দানাহীন জনপদে পাখির আর কাজ কী! সবাই তো সন্ধানে থাকে রুটি রুজির। হয়তোবা তারা সব পাড়ি জমিয়েছে কোনো সমৃদ্ধ জনপদে। আবার যখন ভরে উঠবে এই সব ফসলের মাঠ, দুলে উঠবে আদিগন্ত সবুজের কোমল গালিচা ফিরে আসবে তারা এই জনপদে; দল বেঁধে আনন্দ মিছিল করতে করতে।

দুই
দুপুর একটা।
গজনির সীমানা-প্রাচীর ভেসে উঠতে শুরু করলো আমাদের চোখের তারায়। কম্পমান আঁখি যুগল ওপরে তাকালো বার কয়েক। কিন্তু প্রতিবার সে ফিরে এলো ব্যর্থ হয়ে। আমাদের চোখে ভাসছিলো পুরাতন দিল্লীর দৃশ্যাবলী। আমরা মনে করেছিলাম—দিল্লীর মতোই শহরের প্রবেশ পথে চোখের সামনে ভেসে উঠবে কেল্লা, মসজিদ এবং প্রাচীন স্থাপনার মিনার ও গম্বুজ। কিন্তু আমাদের প্রতিক্ষীত আঁখি-যুগলের সান্ত্বনা হয়ে তেমন কিছুই দেখা দিলো না।

গাড়ি এগিয়ে চলছিলো আপন গতিতে। একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম শহরের সীমান্ত প্রাচীরের একদম কাছে। সরকারি অতিথিশালা প্রাচীরেরই বাইরে উঁচু মতোন এক যায়গায় অবস্থিত। ড্রাইভার গাড়ি অতিথিশালার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে একদম অতিথিশালার ভবনের সামনে নিয়ে রাখলেন। ধুলোয় ধূসরিত গাড়ি থেকে নেমে এলাম আমরা। আমাদের অভ্যর্থনার জন্য দরোজার মুখেই দাড়িয়ে ছিলেন শহরের পুলিশ প্রধান এবং মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। তারা দুজন আমাদেরকে স্বাগত জানালেন মুখে স্মিত হাসির রেখা টেনে। দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসে থেকে হাত পা কেমন ঝিম ধরে গিয়েছিলো। গাড়ি থেকে নেমেই হাত পা ছুঁড়ে একটু স্বাভাবিক হয়ে নিচ্ছিলো সবাই। এসব দেখেই হয়তোবা পুলিশ প্রধান এবং মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেব প্রস্তাব করলেন যেন আমরা শহরের বাজার থেকে একবার ঘুরে আসি। প্রস্তাবটি মন্দ ছিলো না। আমরা তখনই তাদের পিছু পিছু শহরের বাজার পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লাম।
ভবনের পেছন দিকে ছিলো একটা বাগান। সেদিক থেকে নিচে নেমে প্রধান সড়কের দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রধান সড়ক থেকে দুটি পার্শ্ব রাস্তা বের হয়ে একটি গেছে বাজারের ওপর দিয়ে একদম শহরের শেষ পর্যন্ত। অপর যে পার্শ্ব রাস্তাটি তা উঁচু একটি টিলা ঘুরে বাজারের মধ্যে নেমে গেছে। এই রাস্তাতেই বাজারে প্রবেশের খানিক পূর্বে একটি কাঁচা মসজিদ ছিলো। আর রাস্তা থেকে ঠিক মসজিদ বরাবর একটু নিচে বয়ে চলছিলো শান্ত স্রোতের ছোট্ট একটি নদী।

তিন
আমরা মসজিদের গাঁ ঘেষে এগিয়ে চলা রাস্তা ধরে বাজারে গিয়ে পৌঁছলাম। সবার সামনে হাঁটছেন পুলিশ প্রধান তারপর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেব তারপর তাদের পিছু পিছু আমরা এবং আমাদের সাথে আসা সিপাহীরা। দোকানপাট সব খোলাই ছিলো। তেমন বড়সড় কোনো বাজার নয়। সাধারণ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিকিকিনি চলে। একটা দোকানে দেখলাম টুকরো কাপড় বিক্রি হচ্ছে। আর অধিকাংশ দোকানেই পোসতীন (চামড়ানির্মিত এক ধরনের পোশাক) বিক্রি হতে দেখলাম। ছোটো পোসতীনের দাম পনর রুপি আর একটু বড় হলে তার দাম বিশ রুপি। দাম একটু বেশি মনে হলেও পোসতীনগুলো ছিলো খুবই সুন্দর এবং মোলায়েম। পোস্তীনগুলোর বাইরের অংশ ছিলো হলুদ রঙের। আর আস্তিন ও কলারের কাছে তাগির সামান্য কাজ ছিলো। যা পোসতীনে যোগ করেছিলো বাড়তি সৌন্দর্য।

অদ্ভূত ব্যাপার কি—আমরা যে দোকানের সামনে দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলাম দোকানি দাড়িয়ে গিয়ে সালাম দিচ্ছিলো আর বলছিলো ‘মান্দাহ নাবাশী’ (ক্লান্তি যেন আপনাকে স্পর্শ না করে) মেহমানদের কল্যাণার্থে তাদের উচ্চারিত এমন দোয়াবাক্যে আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম। আসলে আফগানিস্তানের পথে প্রান্তরে হেঁটে গেলেই আপনার কাছে পরিষ্কার ধরা দেবে—তারা কতটা অতিথিপরায়ণ। আর কারো বাড়িতে মেহমান হলে তো কথাই নেই! অনেক সময় তাদের মেহমাননেওয়াজি ‘নির্যাতন’ মনে হতে পারে।

বাজারে কজন হিন্দু এবং হলুদ পাগড়ি বাঁধা শিখ দোকানিকেও পেলাম। জানি না—ঠিক কবে থেকে এরা আফগানিস্তানে বসবাস করেছে।
ছোট্ট একটি বাজার। দৈর্ঘে মাত্র দুই ফার্লং (এক ফার্লং=২২০ গজ) এর মতো। তার ওপর পুরোনো শহরের বাজারগুলোর মতো সম্পূর্ণ বাজার ছাউনীঘেরা। বাজারের এক দিক থেকে হেঁটে গিয়ে সংযোগ সড়ক দিয়ে আমরা আবার পেছনে ফিরে আসি। বাজার এদিকটাতেও ছিলো প্রধান সড়কের সাথে লাগোয়া। দোকান ছিলো কেবল একমুখী। মাঝের একটি দোকান থেকে গ্রামোফোনের আওয়াজ আসছিলো। ভালো করে কান পাততেই বুঝে নিই—রেকর্ডে উরদু গান বেজে চলেছে। কাবুলে তো উরদু দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা রাখে। এবং সেখানে হিন্দুস্তানিদের আধিক্যের কারণে এমন উরদু গান শুনতে পাওয়াটা আশ্চর্যের কিছু ছিলো না। কিন্তু গজনিতে উরদুর এমন ডামাডোল দেখে খানিক পুলকিত হলাম। কোনো হিন্দুস্তানিই উরদু রেকর্ড বাজাচ্ছে হয়তোবা। নতুবা এই দূর গজনিতে এমনভাবে উরদু গান আর কে বাজাতে যাবে!

বাজারের এই দ্বিতীয় গলিপথ ধরে হেঁটে গিয়ে আমরা সেই মসজিদটির কাছে পৌঁছলাম যার পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছিলাম খানিক আগেই। ইতোমধ্যে জোহরের সময় হয়ে এসেছে। মনস্থির করলাম—জোহরের নামাজ এই মসজিদেই আদায় করে নেবো।

মসজিদটি ছিলো কিছুটা উঁচুতে। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে মসজিদে প্রবেশ করতেই দেখি—জোহরের জামাত চলছে। কিন্তু অবাক হলাম অজুর কোনো ব্যবস্থা নেই দেখে। অজু না করে এখন জামাতে শামিল হই কি করে! খোঁজ নেয়ার পর জানা গেলো নিচে মসজিদের সিঁড়ি ঘেঁষে যে নদী বয়ে চলেছে সেটাই ব্যবহৃত হয় মসজিদের ‘হাউজ’ হিসাবে। আর সেজন্যই মসজিদের সংলগ্ন অজুর কোনো ব্যবস্থা রাখার দরকার পড়ে না। বাধ্য হলাম ফের নিচে নেমে আসতে।

চার
গজনির রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা অবস্থিত শহর থেকে কিছুটা দূরে উঁচু একটি যায়গার ওপর। অতিথিশালার কামরাগুলো ছিলো বেশ পরিপাটি। কামরার ফার্নিচারগুলো মধ্যমমানের হলেও সাজানো গোছানো ছিলো। একটি কামরা ছিলো প্রশস্ত হল রুমের মতোন। সেটা ব্যবহার হয় সাক্ষাৎ ও খাবার দাবারের জন্য। আর অতিথিদের বিশ্রাম ও আরাম করবার জন্যে ব্যবহৃত হয় অতিথিশালার ছোট ছোট কামরাগুলো। প্রতিটি কামরাতেই খাট, মশারি, বিছানা, পর্দা সব খাটানো ছিলো বেশ কায়দা করে।

বাজার থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে নিই আমরা। ভালো চায়েরও বন্দোবস্ত ছিলো। মেহমানদের যত্ন-আত্তির কোনো কমতি রাখেননি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেব। খাবার দাবার আপ্যায়ন ইত্যাদি শেষ হলে কিছু সময় আমরা বিশ্রাম সেরে নিলাম। আমাদের এবারের গন্তব্য গজনির বিখ্যাত সব মাজার আর কিছু ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। বেলা চারটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়ি গজনি শহরের উদ্দেশ্যে।

পাঁচ
গজনিকে আমরা আমাদের বিধ্বস্ত দিল্লির মতো আবাদ মনে করেছিলাম। ভেবেছিলাম—ধ্বংস, লয়, ক্ষয়ের পরও বেঁচে আছে ঐতিহাসিক নগরী গজনি। কিন্তু পুরোনো গজনিতে পা ফেলা মাত্রই মনটা বিষাদে ভরে উঠলো। কণ্ঠনালির কাছে জমে উঠলো বেদনাসিক্ত হাহাকার। গজনির নাম-নিশানা পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। কি জৌলুস ছিলো এই নগরীর! এখন তার ছিটেফোটাও নেই শহর-প্রাচীরের গায়ে। শত বছর থেকে নাকি গজনি এমন জীর্ণ দশা পার করছে। বেহদ আফসোস জমে উঠলো মনের কোণে গজনির এমন হাল দেখে।

ইতিহাসে পড়েছিলাম—গজনির শেষ দিকে এসে আলাউদ্দীন ঘুরি গজনি শহর জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দিয়েছিলো। যে কারণে তার নাম পড়ে যায় ‘জাহাঁ সূঝ’ (বিপর্যয় সৃষ্টকারী) কিন্তু তারপরও, ইতিহাসের বর্ণনায় গজনিকে এমন করুণভাবে চিত্রিত হতে দেখিনি বাস্তব যতোটা নির্মম ছিলো। এমনভাবে বরবাদ করে গেছে সে এই নগরির যে, একটা ইটও স্থাপিত নেই আজ তার আপন যায়গায়।

ছয়
হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুর দিকে গজনি বংশের পতন আর ঘুরি বংশের শক্তির উত্থান সূচিত হয়ে গিয়েছিলো।

আব্বাস নামের একজন সাহসী বাহাদুর যোদ্ধা ঘুরি বংশের গোড়াপত্তন করেন। তারই অধস্তন নবম পুরুষ ছিলেন ইজ্জুদ্দীন হুসাইন। এই ইজ্জুদ্দীন হুসাইন গৌড়ের ‘হাস্তাঁ’তে ছোটখাটো একটি জমিদারির পত্তন করেন। সাতজন পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে তার ঔরসে। যাদের একজনের নাম ছিলো কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদ, আরেকজন সাইফুদ্দীন সূরী, আর তৃতীয়জনের নাম ছিলো আলাউদ্দীন হুসাইন। কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদের উপাধি ছিলো মালিকুল জিবাল। এই কুতুবুদ্দীন প্রাণনাশের শঙ্কায় নিজের ভাইদের থেকে পালিয়ে গজনিতে চলে আসেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি তার চারিত্রিক উৎকর্ষ এবং উত্তম আখলাকের মাধ্যমে সবার প্রিয় ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। গজনির সিংহাসনে তখন বাহরাম শাহ গজনি (৫২২-৫৪৭ হিজরী) দরবারের হিংসুক লোকেরা কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদের বিরুদ্ধে সুলতানের কান ভারি করে তুললে সুলতান বাহরাম শাহ তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে ফেলেন।

হত্যার খবর পৌঁছে যায় কুতুবুদ্দীনের সহোদর আলাউদ্দীনের কানে। ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতে গজনিতে হামলা করে বসে আলাউদ্দীন। এবং বিজয় তার ললাট চুম্বন করে। আলাউদ্দীনের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে সুলতান বাহরাম শাহ পলায়ন করে চলে যায় পার্শ্ববর্তী হিন্দুস্তানে। এদিকে আলাউদ্দীন তার ছোটে ভাই সাইফুদ্দীন সূরীকে গজনির সিংহাসনে বসিয়ে গৌড়ে ফিরে যায়। সুযোগ বুঝে বাহরাম শাহ তার হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে গজনিতে হামলা করে এবং তার সিংহাসন দখলে নেয়। আর সাইফুদ্দীন সূরীকে বন্দী করে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে বাহরাম শাহ। গৌড়ে বসে এই সংবাদ যখন জানতে পারে আলাউদ্দীন তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সে। প্রতিশোধের বাসনায় সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে গজনির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

ইতোমধ্যে গজনিতে ঘটে যায় আরেক ঘটনা। বাহরাম শাহ (৫৪৭ হিজরী) ইন্তেকাল করে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গজনির ক্ষমতায় বসে বাহরাম শাহের পুত্র খসরু শাহ। সে ও পিতার মতো পালিয়ে লাহোর চলে যায়। ঘুরিদের মোকাবেলার সাহস করে ওঠে না। আলাউদ্দীনের বুকে জ্বলছে ভাই হত্যার প্রতিশোধের আগুন। সেই আগুন নেভাতে সে গজনিতে গণহত্যার নির্দেশ জারি করে। জ্বলিয়ে পুড়িয়ে রাখ করে দিতে বলে সমগ্র গজনি। আলাউদ্দীনের নির্দেশে জ্বলে ওঠে গজনি। জ্বলে ওঠে সুবক্তগীন, সুলতান মাহমুদ আর সুলতান মাসউদের শহর গজনি। সাতদিন পর্যন্ত পুড়তে থাকে আলাউদ্দীনের ক্রোধের আগুনে। এমনকি পুড়িয়ে দেয়া হয় বড় বড় আলেম ফকীহ মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের মাজারও। সুলতান মাহমুদ, সুলতান মাসউদ এবং সুলতান ইবারহীম একটু রক্ষা পান। তারা ছাড়া অন্য সুলতানদের কবর থেকে হাড্ডি পর্যন্ত তুলে ঝলসানো হয় উত্তপ্ত আগুনে।

ইতিহাস বলে—শহর যখন পুড়ে অঙ্গার হচ্ছিলো দাউ দাউ আগুনে, নির্বিচারে মানুষ হয়ে যাচ্ছিলো লাশ গৌড়ের নিরো আলাউদ্দীন তখন দরবারে বসে কবিদের মুখে নিজের স্তুতি শুনছিলো বিভোর হয়ে।

তবে ইতিহাস এই হৃদয়হীন আলাউদ্দীনকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। তার শাস্তি অত্যন্ত নির্মম। আলাউদ্দিন থেকে এমন নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে ইতিহাস যে, পৃথবী আজ তাকে জাহাঁ সূ ঝা (ফেতনাবাজ) নামে স্মরন করে। আমার নাম শুনলেই মানুষ ছি ছি করে উঠবে—এরচেয়ে নির্মম প্রতিশোধ আর কী হতে পারে!

পুরাতন গজনি এই মর্মান্তিক ট্রাজেডির সাক্ষী হয়েছিলো যেদিন বছরের হিসেবে সেটা হিজরী ৫৪৮ সাল।

সাত
গজনিতে আমাদের সাথে পরিচয় হয় মোল্লা কুরবান নামের এক বুজুর্গ দরবেশের সাথে। শহরের এক কোণে কবরের মতোন নির্জন এক যায়গায় তিনি একলা একা বসে থাকেন। শহর দেখতে বের হবার আগে সরওয়ার খান তার কথা স্মরণ করলেন। তার কাছে গিয়ে বসেছি তো মনে হলো যেন গজনির ইতিহাসের কোনো একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ আমার হাতে এসে পড়েছে। বয়স আশি নব্বুইয়ের কাছাকাছি। কঙ্কালসার দেহ। মুখের দাঁতগুলিও পড়ে গেছে সব। শুন্য হাতে আমাদের সামনে এসে বসলেন। আর একে একে বলে যেতে লাগলেন গজনির বরবাদির ইতিবৃত্ত। শোনালেন গজনির বড় বড় বুজুর্গ ব্যক্তিদের জীবনের বৃত্তান্তও। যেন সে মুসার খিজির। কল্পনার চোখে তার পিছু পিছু আমরা হেঁটে বেড়াতে থাকলাম পুরাতন গজনির সব গলিপথে।

আট
মুল্লা কুরবান আমাদের সাথে মোটর গাড়িতে চরে বসলেন। চলার পথে একেক যায়গার দিকে ইশারা করেন আর গল্পের মতো করে বলে চলেন সেখানকার বৃত্তান্ত। পুরাতন গজনি বর্তমান জনপদ থেকে পূর্ব দিকে। উভয় গজনির দূরত্ব দুই তিন মাইলের বেশি হবে না। চলার পথে সামনে পড়ছিলো উঁচু নিচু ছোটো বড় টিলা। কিছু কাঁচা ঘরও দেখতে পেলাম। কিছুদূর যাবার পর মুখোমুখি দুটি সটান মিনার আমাদের নজরে এলো। দুই মিনারের মধ্যবর্তী ব্যবধান ছিলো এক দেড় ফার্লাং। মুল্লা কুরবান জানালেন যে, মিনার দুটি সুলতান মাহমুদ গজনবির সময়কার। সেই যামানায় সুলতানের বহিনী যখন শহর থেকে বের হতো মিনারের ওপর থেকে তখন নাকারা বাজানো হতো। মিনার দুটি ছিলো পাতলা পোড়া মাটির।

আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতে সড়কের পাশে টিলার ওপর মাজারের গম্বুজ সদৃশ কিছু দেখা গেলো। মোল্লা জানালেন—এটা বাহলুল দানার মাজার। তারই পাশে আরেকটি গম্বুজ দেখে উঠলাম আমরা। সেটার অবস্থানও সড়কের পাশেই। মোল্লাকে বলতে শুনি—এটি সুলতান ইবরাহীম গজনবীর মাজার। এই দুটি গম্বুজ পেরিয়ে সামনে এগোলে আরেকটি গম্বুজের দেখা পাই। আমাদের জানানো হলো—এ মাজারটি সুলতান মাহমুদ গজনবীর মহান পিতা সুলতান সুবক্তগিনের। গম্বুজটি কিছুটা প্রাচীন ধারার পোড়া মাটির নির্মান বলে মনে হচ্ছিলো।

নয়
নতুন গজনি থেকে সোজা একটি সড়ক চলে গেছে সুলতান মাহমুদ গজনবির মাজার পর্যন্ত। মাজারের কাছাকাছি পৌঁছলে ছোট্ট একটি জনপদের দেখা মেলে। সেটা পেরিয়ে এক গলিমুখে গিয়ে থেমে দাঁড়ালো আমাদের গাড়ি। প্রবেশ পথের সংলগ্ন পাহাড় থেকে কলকল বয়ে গেছে একটি পাহাড়ি ঝরনা। ঝরনার পানি একেবেকে বয়ে গেছে প্রবেশমুখের সেই ছোট্ট জনপদটিতে। তাদের পানির উৎস এই ঝরনা। নিচে পাথর দিয়ে একটি বাঘের প্রতিকৃতি তৈরি করা। ঝরনার পানি সেই বাঘের মুখে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আরও গতি নিয়ে নেমে যাচ্ছে পাথরের গা বেয়ে। মোল্লা জানালেন—ঝরনাটা বহু প্রাচীন। সুলতানের সময় থেকেই প্রবহমান।

ঝরনার কয়েক কদম দূরেই মাজারের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বার পেরোলেই একটি প্রশস্ত আঙিনা। আঙিনার পাশ ঘেঁষে সুন্দর একটি বাগান করা হয়েছে। সুলতানের মাজারের গম্বুজ চোখে পড়লো সেই বাগানের এক পাশে।

* * *

মাজারে প্রবেশ করতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহান সুলতান মাহমুদ গজনবীর কবর। আহ্! এ তো সেই মহান সুলতানের কবর চীনের প্রাচীর থেকে শুরু করে সোমনাথ পর্যন্ত ছিলো যার রাজত্ব। যার গাম্ভীর্য ও প্রতাপের সামনে বড় বড় শাসকেরা মাথা নুইয়ে দিতে বাধ্য হতো। যিনি পৃথিবীর ধন ভাণ্ডার গজনির পথে পথে বিছিয়ে দিয়েছিলেন। যার বাহিনীর ঘোড়ার খুর খাইবার উপত্যকার পাহাড়ি বন্ধুর পথ পেরিয়ে রাজপুতানার বিশুষ্ক মরুভূমি, আরব সমুদ্রের সমুদ্রতট, তুর্কিস্তান ও খাওরিজমের বিস্তৃত উপত্যকা এবং ইরানের বিয়াবন সব ছুঁয়ে এসেছিলো। যার বাহিনী ভীষণ গরমের দিনে ইরান ও তুর্কিস্তানের বুক থেকে ছিনিয়ে আনতো জয়। আর প্রচণ্ড শিতের মধ্যে হিন্দুস্তানকে করে দিতো এলোমেলো। তার দরবারে কবিকুল এমন সব কবিতার জন্ম দিয়েছিলো যার বদৌলতে বর্তমান পৃথিবীতে ফারসী পেয়েছে জীবন্ত ভাষার মর্যাদা। সেই প্রতাপশালী মহান সুলতান পৃথিবীর এক কোণে কোনো এক সুনসান বাগিচায় একদমই একাকী মাটির বিছানায় শুয়ে আছেন।

কল্পনার কানে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুগাঁথা যেন মাজারের দেয়ালে দেয়ালে গুঞ্জরিত হতে শুনলাম।

মাজারের ওপর বর্তমান যে গম্বুজটি ১৩২৩ হিজরিতে সেটি স্থাপন করে দিয়েছেন আমির হাবিবুল্লাহ খান। মর্মর পাথরের ওপর ফারসী হরফে খোদাইকৃত একটি ফলক দেয়ালের গায়ে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। তবে কবরটা রয়ে গেছে সেই প্রাচীন সময়েরই কাঠামোতে। সুলতানের কবরের সাথে লাগোয়া যে ফলকটি তাতে সুলতানের মৃত্যুর তারিখ লেখা হয়েছে কুফার আরবি হস্তলিপিতে। এবং ফলকের ভাষাটাও বিশুদ্ধ আরবি। লেখাগুলো কবরের চার পাশ ঘুরিয়ে এমনভাবে খোদাই করা যে বর্তমানে তার পাঠোদ্ধার সহজ নয়। বহু চেষ্টা কোশেশের পর একটি বাক্য আমি পড়ে উঠতে সমর্থ হলাম। যাতে সুলতানের মৃত্যুর দিনতারিখ লিপিবদ্ধ করা।

(অনুবাদ) ‘আল্লাহ তায়ালা সুলতানের কবরকে নুরান্বিত করে দিন। তার চেহারাকে তিনি করে দিন উজ্জ্বল। সুলতান ইন্তেকাল করেন চারশ একুশ হিজরি সনের তেইশ রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়।’

গজনবির সুলতানদের নিয়ে রচিত হয়েছে যে ইতিহাস গ্রন্থ ‘যাইনুল আখবার’ তাতেও সুলতান মাহমুদ গজনবির মৃত্যু তারিখ এমনটাই লেখা হয়েছে।

দশ
মাথার ওপর ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। নেমে আসতে শুরু করেছে শীতরাত। অন্ধকার আরও গাঢ় হওয়ার আগে আগেই আমরা ফিরে আসি গজনির সরকারি অতিথিশালায়।

Facebook Comments