সীমান্ত থেকে সাম্রাজ্য : এক বিস্মৃত স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

ডিজাইন : চিত্রণ

তুর্কি সিরিজ ‘দিরিলিস আরতুগরুল’ (Diriliş: Ertuğrul) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই সিরিজ দেখার পর সারা বিশ্বের অনেক দর্শক আরতুগরুলের উত্থান এবং তার ব্যক্তিজীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সব দর্শকদের মাঝে একজন হলো আমার ছাত্র অমি।

ভেবে দেখলাম, সিরিজে অনেক অত্যুক্তি এবং তথ্য-বিকৃতি থাকতে পারে, তাই ভালো হয় উসমানিদের এই পূর্বপুরুষ সম্পর্কে ওর হাতে একটা বই তুলে দেওয়া। আর সে সময় দেখলাম আইনুল হক কাসিমীর ‘আরতুগরুল গাজি’ বইটি প্রকাশ পেয়েছে। আমি সুযোগটা কাজে লাগালাম। তবে উপহার দেবার আগে চোখ বুলাতে ভুলিনি। সে অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা লিখছি বইটি সম্পর্কে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো—বইটির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক হিসেব করলে একটাই—লেখকের প্রচুর তথ্যের সন্নিবেশ। ১৪৪ পৃষ্ঠার বইটিতে আরতুগরুল গাজির নাম আসে অনেক পরে; ৮৫তম পৃষ্ঠায়। তার আগ অবধি লেখক পর্যায়ক্রমে তুর্কি, সেলজুক, আব্বাসি, বাইজেনটাইন এবং মোঙ্গলদের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করেছেন।

প্রথম অধ্যায় ‘যুগসূত্রে গাঁথা মালা’ আমার বেশি ভালো লেগেছে। এই অধ্যায় পড়ে অনেক পাঠকের একটা মস্ত বড় ভুল ভেঙে যেতে পারে। সেটা হলো—উসমানি আর তুর্কিদের পারস্পারিক যোগসূত্র। অনেকের ধারণা—তুর্কি জনগণ মানে তুরস্কের মানুষ। কিন্তু মূলত তুর্কিস্তান হলো বর্তমান চিনের উইঘুরদের জিংজিয়াং প্রদেশ থেকে আনালোতিয়ার, মানে বর্তমান তুরস্কের পশ্চিম সীমানা (ইউরোপ) পর্যন্ত। এই বিশাল ভূ-খণ্ডে বসবাসরত সবাই মূলত তুর্কি জাতির।

আর তুর্কি বলতে উসমানিদের ভাবাও অনেক বড় ভুল। তুর্কিদের ২০টা বড় বংশ ছিল। সেগুলোর একটি ছিল অঘুজ-তুর্ক বংশ। আর সেই অঘুজ-তুর্ক বংশের ২৪ গোত্রের একটির নাম হলো কায়ি গোত্র। আর এই কায়ি গোত্র থেকে আরতুগরুল গাজির উত্থান ঘটে এবং পরে তার পুত্র উসমান গাজি প্রতিষ্ঠা করেন উসমানি সাম্রাজ্য। তার মানে উসমানিরা হলো জাতিগত দিকে থেকে বিশাল তুর্কি জাতির শুধুমাত্র ক্ষুদ্র একটা অংশ।

তবে এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে আমি কিছুটা বিরক্ত বোধ করেছি। কারণ, লেখক মাত্র ১৬ পৃষ্ঠায় পুরো সেলজুক সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন, যা ১৬০ এর অধিক পৃষ্ঠাতেও কম হতে পারে। এই ১৬ পৃষ্ঠায় লেখক এত বেশি তথ্যের (শাসক ও স্থানের নাম) সন্নিবেশ করেছেন যে কোনো পাঠক এক বসায় বইটি পড়তে গেলে খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। এই সমস্যা কম-বেশি সাম্রাজ্য-সম্পর্কিত অন্য অধ্যায়গুলোতেও ছিল। এই জন্য ছাত্রকে বলে রেখেছি সাম্রাজ্যের অধ্যায়গুলো যেন সে পুরো একদিন একদিন সময় লাগিয়ে পড়ে।

তবে বইটার সব থেকে সেরা দিক হলো লেখকের নিরপেক্ষতা। অনেক তথাকথিত সেক্যুলার লেখকের মাঝেও ইতিহাস নিয়ে প্রচুর পক্ষপাতদুষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। তবে লেখক আইনুল হক কাসিমী ইসলামি ভাবধারা থেকে লিখেও তথ্যের ব্যাপারে চমৎকার নিরপেক্ষতা দেখিয়েছেন। উনি মুসলিম ইতিহাসবিদদের পাশাপাশি নন-মুসলিম ইতিহাসবিদদের থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন অনেকবার। ক্ষেত্রবিশেষে পক্ষ অবলম্বন করলেও উল্লেখ করেছেন উভয়পক্ষের দলিল।

তবে যারা আরতুগরুল গাজির বিস্তারিত জীবনী হিসেবে বইটি পড়তে চান তারা হতাশ হতে পারেন। কারণ, আরতুগরুল অধ্যায়টির পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র ২৪। নিরপেক্ষ তথ্যের সীমাবদ্ধতায় লেখক নিজের অপারগতা একাধিকবার স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে উসমানিদের পূর্বপুরুষদের একটা মোটামুটি চিত্র বইটিতে আছে। কিন্তু মধ্য এশিয়ার মুসলিম এমনকি নন-মুসলিম প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে বইটি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আশা করি লেখকের লেখার সাথে আবার সাক্ষাৎ ঘটবে অন্যকোনো বইতে, অন্যকোনো পৃষ্ঠায়।

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন আরতুগরুল গাজি

বই : আরতুগরুল গাজি
জনরা : নন-ফিকশন
সাব-জনরা : ইতিহাস
লেখক : আইনুল হক কাসিমী
সম্পাদক : নেসারুদ্দীন রুম্মান
প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক : পুনরায় প্রকাশন
কাগজ : 80gm কালারপ্রিন্ট
বাঁধাই : পেপারব্যাক
মুদ্রিত মূল্য : ২১৬৳
পৃষ্ঠা : ১৪৪

Facebook Comments