সাইফ সিরাজের আটটি সনেট

নাকফুল

নাকফুলে বেঁচে থাকা, স্মৃতিগুলো হতে
মা, নিজের কথাগুলো ধীরে ধীরে লিখে
রাখেন প্রেমের খামে। যে কোনো হালতে
রোদেলা উষ্ণতা দিয়ে—ঢাকে পৃথিবীকে।

বীজের দেখানো গানে! জীবন জড়িয়ে
পাতা আর ফুল-প্রেমে সুরেলা আগামী
দেখে; অচেনা পেয়ালা কামনায় নিয়ে—
মা, মা ধ্বনিতে এখন লুকিয়েছে ‘আমি’।

চাঁদনি রাতের বেলা; জোস্নাছোঁয়া গানে
নিজের মায়াবী ধ্যানে- আর কেউ আসে
আর কারো প্রেমে তার শতো ব্যথা হাসে
নাকফুলে জেগে থাকা; স্মৃতি সব জানে।

‘আমি’ হারানো তাদের দানে আমি আসি
কী অপার! ভালোবেসে; নাকফুলে ভাসি।

প্রেমান্ধ মেঘ

গোমরা চেহারার; আকাশ যেন আজ
মেঘের ব্যথাগুলো—ঢালছে সারা গায়
থামছে না ক্যাচাল; জল তবে নারাজ
বেহুশ যোগাযোগে! মেঘ নদী সাজায়।

অবেলা নামা ঢলে, মেঘেরা চুপ থাকে
মাটিরা দলে দলে ‘আকাশ পেতে চায়’
পাতারা নিজ থেকে ‘বৃষ্টি এসো’ ডাকে
প্রাণ তো জল-ছুঁয়ে; আকাশটা নাচায়।

বড়ো আরাধনাতে! কবিতা আসে যদি
জলের সারগামে; আমায় গেয়ে নিয়ো
আনোখা বৃষ্টিতে, আমাকে প্রেম দিয়ো
তোমাকে গেয়ে যাব; কেয়ামত অবধি।

কতো না কসরতে মেঘেরা নেমে আসে
এখানে যদি কেউ গোপনে ভালোবাসে!

সুফীর চোখে

থমকে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। দেখো!
কাউকে যদি ভালো লাগার মতো পাও
তাহলে! তার চলে যাওয়া দেখে শেখো
তোমরা তো কেবল থেমে থাকা বানাও!

যাব না! ভেবে যদি পাথরে বসে থাকো
নিজেকে নিয়ে কিছু—স্থবিরতা সাজাও
কেউ-ই তো তোমার সারথী হবে নাকো
তোমাকে বলে যাবে কেবল হেঁটে যাও!

সাথীরা থামে না তো; যতই তুমি থামো
তুমিও থামো না হে! এগিয়ে যাও দূরে
অচেনা গতিপথে; থাকো না তানাফুরে
থামতে পারবে না। জীবনে তাই নামো!

গভীরে ভেবে যদি থামার ঘোরে ঘামো
প্রথারা ঠেলে নেবে; যদিও ভয়ে থামো!

জানাজায়

জানাজায় লাশ খুঁজে কিছু কথা পেয়ে
আমি তফাতে দাঁড়াই। খাটিয়া ডাকছে
শুনতে পেয়েছি তাও; আমি গান গেয়ে
দেখি; আমার ভেতরে লাশেরা নামছে!

আকাশের নীল নামে বোবা ঠোঁট বেয়ে
লাশেরা চোখের জলে; মিছিল থামছে
জানাজায় কেউ নেই! কথাগুলো খেয়ে
অচেনা মুখেরা দেখি; অঝোরে ঘামছে।

চেহারাতে রোশনাই; খোদা! এরা কারা
আমাকে দেখাও তুমি, জানাজার লাশ
এতো এতো কায়া দেখে; হয়েছি হতাশ
জানাজা এখানে আজ হবে লাশ ছাড়া।

লাশেরা এসেছে দেখো! চলে নয়া ধারা
আকলে আটকে গেছি। হয়ে মাথা হারা!

চোখ

দিনের রোদ যদি—আকাশে ফিরে যায়
শোকের বিকেলটা লুকিয়ে থাকে চোখে
সে কার চোখ! আমি দেখেছি জানালায়
দেখেনি সেই চোখ প্রেম-অভাবে লোকে!

চোখের পাতা ডাকে আসেনি হাতছানি
পুঁইবীজে ঠোঁটের রাঙানো; হাসি আসে
আসে না তাও রোদ লুকানো চোখখানি
জানালা খুলে থাকে—দুয়ারের ওপাশে!

চোখের ভাষা পাঠে আমার গেলো দিন
দেখে কি তবে! আমি হয়েছি প্রেমাতাল
রোদের মতো দিলো কি তবে প্রেমজাল
তোমার চোখে দেখ! বাড়ছে কতো ঋণ!

জানালা কতো আর! খুলবে ছায়া-হীন?
দরোজা ফেলে করো; দু’চোখ পরাধীন।

নিজের যাপন

গণিতের সূত্র ধরে সাজানো অপেরা
দেখার সময় চোখে যোগ বিয়োগের
একটা পতন হলে লাগে ছেড়া ছেড়া
অযথা অচল থাকে প্রজ্ঞা অতীতের।

বড়ো যতনে বানানো রঙিলা নখেরা
দরকারে সাদাকালো! ধুসর আখের
এবার তাহলে দেখো, স্বাধীন শখেরা
কতোটা চমক নিয়ে; হয়েছে হাজের!

তোমার আলাপে যতো, সুরের নাচন
কোথাও থাকে না তার শুদ্ধ সারগাম
তুমি থাক শুধু ভেসে, তালিকা বেনাম
বাতাসেরা জেগে থাকে হবে যে বাহন।

সাজানো আলাপে যত; বেহুদা কাহন
তারচেয়ে ভালো লাগে, নিজের যাপন!

প্রাণের সংকটে প্রাণ

আহা! প্রাণ– সংকটে অপারগ হয়ে
দুঃসময় পারি দিতে কী যে সাধনায়
পথের ফকির বেশে– রতি কামনায়
প্রেম করেছি তালাশ লোভ-সমন্বয়ে

কথার ভেতরে কথা জড়িয়ে নিছক
খেলছে আমায় ধরে আমার মগজ
বাড়ছে দেখি অবাধ প্রাণের করজ
জমছে কপাল জুড়ে কলঙ্ক তিলক।

হায়! সরবে দু’চোখ জলজ মেঘের
আশায় বসতি করে মরুভূমি ঘিরে
সময় হারিয়ে দ্রুত অসুখেরা ফিরে
প্রাণের বলয়ে মন কেষ্ট হাসে ফের।

পাগল ঠাওরে নিয়ে মানুষেরা ভয়ে
হায়! চলে গেছে দূরে চুপ ক্রমান্বয়ে।

ঘুম

তুমুল করতালিতে কেঁপে ওঠা মঞ্চে
দু’চোখ বন্ধ করেছে অতিথি গায়ক
তার পেছনে সরবে অতীতের ছায়া
গেয়ে উঠছে অচেনা পিয়নোর সুর

গায়কের কণ্ঠে তাই নেমেছে যাদুর
মাদক-মদির তান। মানুষেরা আজ
ঠিকানা ছেড়ে অচিন গন্তব্যে বিমূঢ়
সুরের ঐন্দ্রজালিক প্রপঞ্চে আটক।

ঘুমঘোর চোখ দু’টি পেয়ালার খুঁজে
ভুলে যায় গতকাল হারিয়েছে ভাষা
জনতার ভিড়ে যেই হয়েছে অলোক
বিষের পেয়ালা ধরে গিলে যায় সুর!

গায়কের অন্তরালে অভিনীত গানে
আমাদের চোখে নামে কুম্ভকর্ণ-ঘুম।

Facebook Comments