শেষ স্যালুট

কাশ্মীরের এই লড়াইটা বড় আজব কিসিমের। সুবেদার রব নাওয়াজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। পরিষ্কার করে কোনো কিছু ভাবতে পারে না। নিজেকে মনে হয় সেই রাইফেলের মতো যার ট্রিগারটি বিকল হয়ে গেছে।

বিগত বিশ্বযুদ্ধকালে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে সে অগ্রভাগে থেকে লড়েছে। কিভাবে মারতে হয় এবং কিভাবে মরতে হয় সব তার ভালো করে জানা আছে। ছোট-বড় সমস্ত অফিসারদের মাঝে তার প্রতি একটা আলাদা সমীহ রয়েছে—তার সাহস, বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্বার কারণে। প্লাটুন কমান্ডার হামেশা সবচে’ কঠিন কাজটা তাকেই দেন। সেও প্রত্যাশার চে’ বেশি উত্তীর্ণ হয়।

কিন্তু এই যুদ্ধের ঢঙটাই বড় অদ্ভুত রকমের। মনে প্রচণ্ড জোর আছে, জোশও আছে। দানাপানি থেকে বেপরোয়া হয়ে একটাই নেশা—দুশমনদের কচুকাটা করা। তবু যখনই সে শত্রুর মুখোমুখি হয়, তখনই ভেসে উঠে পরিচিত মুখেরা! কোনো কোনো বন্ধুর মুখ, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু! বিগত যুদ্ধেও যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মিলিত জোটের শত্রুর মোকাবেলা করেছে। সেই তারাই এখন জানের দুশমন হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে।

কখনো কখনো সুবেদার রব নাওয়াজের কাছে সব স্বপ্ন মনে হয়; বিশ্বযুদ্ধের ঘোষণা, সৈনিকের খাতায় তালিকাভূক্তি, দেহের উচ্চতা ও বুকের মাপজোখ, পিটি-প্যারেড, টার্গেট প্রাকটিস, যুদ্ধের এই ফ্রন্ট থেকে ওই ফ্রন্টে দৌড়াদৌড়ি এবং সর্বশেষ যুদ্ধের সমাপ্তি। তারপর ধুম করে পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরের যুদ্ধ। আগপাশ কতকিছু ভাবে রব নাওয়াজ। নাটের গুরুরা এইসব ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করেই সাজিয়েছে যেন সাধারণ মানুষেরা বিভ্রান্ত হয় এবং কিছু বুঝতে না পারে। নতুবা এও তো কথা এত দ্রুত কিভাবে এত বড় বিপ্লব ঘটতে পারে।

অবশ্য এতটুকু সুবেদার রব নাওয়াজের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওরা কাশ্মীরের জন্য যুদ্ধ-জং করছে। কাশ্মীর কেন জয় করতে হবে তা সে-ও ভালো করে বুঝতে পারে। পাকিস্তানের টিকে থাকার জন্য কাশ্মীরের দখল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ও নিশানা স্থির করার সঙ্গে সঙ্গে যখন কোনো পরিচিত মুখ বন্দুকের সামনে চলে আসে তখন কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে যায় সে আসলে কী উদ্দেশ্যে লড়ছে!
এ কারণে বারবার তার নিজেকে নিজেই স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে, এখন সে শুধু বেতন, এক টুকরো আবাসস্থল এবং পুরস্কারের জন্য নয় বরং স্বদেশের জন্য লড়ে যাচ্ছে! এই দেশ পূর্বেও তার দেশ ছিল। সে এই এলাকারই বাসিন্দা ছিল যা এখন পাকিস্তানের অংশ হয়ে গেছে। এখন তাকে নিজের সেই স্বদেশবাসীর সঙ্গেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে যারা একসময় তার সর্বসঙ্গী ছিল, যাদের পরিবারের সঙ্গে তার পরিবারের ছিল যুগযুগান্তরের পুরনো সম্পর্ক।

যে মাটির পানি পর্যন্ত সে পূর্বে পান করেনি এখন সেটিই তার দেশ। সে দেশের জন্য সরাসরি কাঁধে বন্দুক রেখে হুকুম জারি করা হয়েছে, ‘যাও, যেখানে নিজের ভিটে তৈরির জন্য এখনো দুটো ইট বসাতে পারোনি, যে মাটির বাতাস ও পানি এখনো জিহ্বায় ঠিকমতো বসেনি সেই—তোমার দেশ, যাও সে দেশের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করো, সে পাকিস্তানের সঙ্গে—যার হৃদয়ে তোমার জীবনের এতটা বছর কাটিয়ে এসেছ, যাও!’

রব নাওয়াজ ভাবে, একই অবস্থা সেই সব মুসলিম সেনাদেরও যারা হিন্দুস্তানে নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে এখানে এসেছে। ওখানে ওদের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হয়েছিল, এখানে এসেও ওদের বন্দুক ছাড়া আর কীইবা মিলেছে। একই ওজনের বন্দুক, দেখতেও একই রকম, একই কোম্পানির একই শক্তির বন্দুক।

পূর্বে সবাই মিলে এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল যাদেরকে পেট, পুরস্কার ও সম্মানের খাতিরে দুশমন বলে বিশ্বাস করেছিল। আর এখন নিজেরাই দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আগে সবাইকে বলা হতো ‘হিন্দুস্তানি ফৌজ’। আর এখন একদলকে বলে ‘পাকিস্তানি’, আরেকদলকে ‘হিন্দুস্তানি’। এদিকে ভারতে মুসলিমরা হিন্দুস্তানি ফৌজে রয়েছে, রব নাওয়াজ যখন ওদের নিয়ে ভাবে তখন মাথায় অদ্ভুত এক বিহ্বলতার সৃষ্টি হয়। আবার কাশ্মীরের কথা ভাবলে মাথা একদম তালগোল পাকিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাশ্মীরের জন্য লড়াই করছে নাকি কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্য? তাদের দিয়ে কাশ্মীরি মুসলমানদের জন্য যুদ্ধ করানো হয়ে থাকলে কেন হায়দারাবাদ এবং জোনাগড়ের মুসলমানদের জন্যও তাদের দিয়ে যুদ্ধ করানো হচ্ছে না? আর এ যুদ্ধ যদি নিরেট ‘ইসলামি যুদ্ধ’ হয়ে থাকে তবে কেন তামাম দুনিয়ার অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্র এতে অংশ নিচ্ছে না?

রব নাওয়াজ অনেক চিন্তাভাবনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, এইসব চিকন চিকন ব্যাপারে সৈনিকদের একদম ভাবা উচিত নয়। তাদের মাথামোটা হওয়া উচিত। মোটা বুদ্ধির লোকেরাই ভালো সেপাই হতে পারে। কিন্তু পরিবেশগত কারণে বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে সে আড়ালে এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে ফেলে, পরবর্তীতে নিজের এই কাজ নিয়ে নিজেই হেসে লুটিপুটি খায়।

কিষাণ গঙ্গার পাড় ধরে যে সড়কটি মুজাফফরাবাদ থেকে কিরাণ পর্যন্ত গেছে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধ হয়। বড় অদ্ভুত সেই লড়াই। রাতে ফায়ারের শব্দের বদলে আশেপাশের পাহাড়গুলো কখনো কখনো নোংরা গালিগালাজের শব্দে গুলজার হয়ে উঠে।

একদিন সন্ধ্যায় সুবেদার রব নাওয়াজ তার প্লাটুনের সৈনিকদের নিয়ে অতর্কিত হামলা করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। দূরে নিচের এক গিরিখাদ থেকে গালিগালাজের তুফান শুরু হয়। প্রথমে সে ঘাবড়ে যায়। মনে হচ্ছিল অনেকগুলো ভূত মিলে এক সঙ্গে নাচছে আর বিকট শব্দে খিলখিল করে হাসছে। রব বিড়বিড় করে,‘শালা শুয়োরের দল… কী হচ্ছে এসব?’ প্লাটুনের এক সদস্য মুখ সাফ করে বলে, ‘সুবেদার ছাব, খানকির পোলারা আমাদের গালি দিতাছে!’

প্রচণ্ড উসকানিমূলক ও অপমানকর সেসব গালিগালাজ শুনে রব নাওয়াজ প্রথমে উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠতে চায়। কিন্তু তা করা হতো মস্ত বড় ভুল। সুতরাং সে খামুশ থাকে। কিছুক্ষণ পর্যন্ত জোয়ানেরাও চুপচাপ থাকে। কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে ওরাও গলা ফাটিয়ে গালিবর্ষণ শুরু করে। রব নাওয়াজের জন্য এধরনের যুদ্ধ একেবারেই নতুন। জোয়ানদের সে কয়েকবার খামুশ থাকতে বলে। কিন্তু ওদিককার গালি এমনই নোংরা ছিল যে, যেকোনো মানুষের পক্ষে চুপ থাকা অসম্ভব।

শত্রুপক্ষের সেনাদের সাধারণত দেখা যেত না। রাতে তো এমনিতেই অন্ধকার। এমনকি দিনেও তাদের দেখা মিলত না। শুধু ওদের নোংরা গালিগালাজ পাহাড়ের নিচ দিক থেকে উঠে এসে পাথরে বাড়ি খেয়ে খেয়ে ছড়িয়ে পড়ত। রব নাওয়াজের প্লাটুনের জোয়ানরা সেইসব গালির জবাব গালি দিয়ে দিলে মনে হতো তা যেন নিচে পৌঁছতে পারে না, উপরের দিকে উড়ে যায়। এতে তার উপর এক প্রকার স্নায়ুচাপের সৃষ্টি হয়। বিরক্ত হয়ে শেষমেষ হামলা করার হুকুম দিয়ে দেয় সুবেদার।

ওখানকার পাহাড়গুলোর একটা অদ্ভুত ব্যাপার রব নাওয়াজের চোখে পড়েছে। খাড়া উপরের দিকে পাহাড়গুলো গাছগাছালিতে ছেয়ে থাকে। ঢালুর দিকে কাশ্মীরি বিত্তের মতোই একেবারে অনুর্বর, টাক! বিপরীতও দেখা যেত, কোনো কোনো পাহাড়ের উপরের দিকে টাকের মতো আবার ঢালুর দিকে গাছ আর গাছ। এক ধরনের লম্বা পাতা বিশিষ্ট পরগাছা হয় যার উপর ফৌজি বুট বারবার পিছলে যায়।
যে পাহাড়ে সুবেদার রব নাওয়াজের প্লাটুনের অবস্থান এর ঢালু গাছ ও ঝোপঝাড় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। নিঃসন্দেহে এই অবস্থায় আক্রমণ করা ছিল ‘বহুত খতরনাক’। তবু সুবেদারের জোয়ানেরা হামলা করার জন্য সানন্দে রাজি ছিল। গালির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। পরিকল্পনামতো আক্রমণ হলো এবং সাফল্যও এল। দুজন জোয়ান মারা গেছে। চারজন আহত হয়েছে। শত্রুদল হারিয়েছে তাদের তিনজন সেনাকে। বাকিরা মালসামানা-রসদপাতি ফেলে পালিয়েছে।

সুবেদার রব নাওয়াজ ও তার জোয়ানদের বড় দুঃখ হলো, দুশমনদের কোনো সেপাইকে জিন্দা ধরা গেল না! জীবিত হাতে পেলে ওদের উৎকৃষ্ট গালিগালাজের মজাদার উত্তরটা দেওয়া যেত। লাভের লাভ যা হলো, ঘাঁটিটা জয় করতে পারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড় ওদের কবজায় চলে এল। রব নাওয়াজ ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে প্লাটুন কমান্ডার মেজর আসলামকে তখনই এই সাফল্য সম্পর্কে অবহিত করে নিজের সাবাশিটা আদায় করে নিয়েছে।

আশেপাশের সবগুলো পাহাড়ের চূড়াতেই পানির জন্য জলাশয়ের মতো একটা জায়গা থাকে। এ পাহাড়েও একটা আছে। অন্য পাহাড়ের তুলনায় এর জলাশয়টা বেশ বড়। পানিও কাঁচের মতো পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। প্রচণ্ড ঠান্ডা। তবু সবাই স্নান করেছে। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ হচ্ছে। কেউ পরোয়া করছে না। সবাই যখন এ নিয়ে ব্যস্ত এমন সময় ফায়ারের বিকট শব্দ শোনা গেল। সবাই বিবস্ত্রাবস্থাতেই মাটিতে শুয়ে পড়ল। কিছু সময় পর সুবেদার রব নাওয়াজ খান চোখে দুর্বিন লাগিয়ে ঢালুর দিকে শত্রুর অবস্থান খোঁজতে লাগল। কিন্তু শত্রুর গোপন আশ্রয়স্থল ঠাহর করতে পারল না। চোখে দুর্বিন থাকাবস্থাতেই আরো একটা গানশট ছুটে এল। এবার সে দেখতে পেল কাছের একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পাহাড়ের ঢালুর নিচ দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে। মুহূর্তমাত্র দেরী না করে জোয়ানদেরকে ফায়ারের নির্দেশ দিলো।

এদিক থেকে বৃষ্টির মতো ফায়ার চলতে থাকে, ওদিক থেকেও উত্তর আসতে থাকে। সুবেদার রব নাওয়াজ দুর্বিন দিয়ে শত্রুর পজিশন বোঝার চেষ্টা করে। ওরা যথাসম্ভব বড় বড় পাথরের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু এই পাথরের আড়াল-আশ্রয় বেশ ছোট। সে নিশ্চিত খুব বেশি সময় ওরা নিজেদের ওখানে হেফাজত করে রাখতে পারবে না। পাথরের আড়াল থেকে যেই সামান্য নড়াচড়ার চেষ্টা করবে তার সুবেদার রব নাওয়াজের কবজায় তার আসা অবধারিত।

আরো কিছু সময় গুলাগুলি চলতে থাকে। এরপর সুবেদার রব নাওয়াজ তার জোয়ানদের বেহুদা গুলি খরচ করতে মানা করে দেয়। শুধু বন্দুক তাক করে রাখার নির্দেশ দেয়। যখনই দুশমনের কোনো সেনা পাথরের দেয়ালের এদিকওদিক যাওয়ার চেষ্টা করবে ওমনি ওকে যেন উড়িয়ে দেয়। নির্দেশ দিয়ে সে তার সম্পূর্ণ বিবস্ত্র দেহের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, ‘দুশশালার… কাপড় ছাড়া মানুষকে জন্তু-জানোয়ারের মতো লাগে!’

থেমে থেমে বিরতি দিয়ে শত্রুপক্ষ থেকে এক-আধটা ফায়ার চলতে থাকে, এদিক থেকেও কখনো কখনো তার জবাব দেয়া হয়। এই খেলা পুরো দুই দিন চলতে থাকে। আবহাওয়া হঠাৎ করে অসহনীয় মাত্রায় শীতল হয়ে পড়ে। এত ঠান্ডা পড়তে থাকে যে, দিনের বেলাতেও রক্ত জমাট বেঁধে যায়। সুবেদার রব নাওয়াজ চায়ের আয়োজন করে। সব সময় আগুনের উপর একটি কেটলি বসানো থাকে। ঠান্ডা বেশি জাঁকিয়ে বসলেই এই গরম পানীয়ের এক চক্র হয়ে হয়ে যায়। তাই বলে দুশমনের উপর থেকে চোখ সরে না মোটেও। একজন সরলে আরেকজন চোখে দুর্বিন নিয়ে বসে যায়। হাড্ডি থেকে মাংস খসে পড়ার মতো ঠান্ডা পড়া শুরু হয়েছে। নজরদারীর দায়িত্বে থাকা জোয়ান জানায় পাথরের দেয়ালের পেছনে একটা কিছু ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। সুবেদার রব নাওয়াজ ওর হাত থেকে দুর্বিন নিয়ে ভালো করে দেখে। নাহ, কোনো নড়াচড়া সে দেখতে পায় না। ঠিক তখনই একটি উচ্চ গলা ভেসে আসে। অনেকক্ষণ সে গলা পাহাড়ে ভেসে ভেসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। রব নাওয়াজ এর অর্থ করতে না পেরে ঠাসঠাস করে গুলি ছুঁড়ে দেয়। গুলির শব্দ পাহাড়ে গুঞ্জরিত হয়ে থামলে ওদিক থেকে আবারো একটি আওয়াজ আসে। এবার স্পষ্ট তাকেই সম্বোধন করে কিছু বলতে শোনা গেল। রব নাওয়াজ চিৎকার করে বলে,‘শুয়োরের বাচ্চা! বল, কী বলতে চাস!’

দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। রব নাওয়াজের কথা দুশমন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নিশ্চিত হওয়া গেল ওদিক থেকে গালির উত্তর আসায়,‘গালি দিস না ভাই!’

রব নাওয়াজ তার জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে বলে, ‘ভাই!’ তারপর দুহাত গোল করে মুখের সামনে ভেঁপু বানিয়ে বলে, ‘ভাই না তোর মায়ের নাগর… এখানে সবাই তোর মায়ের খদ্দের, বুঝলি!’

সঙ্গে সঙ্গে ওদিক থেকে একটি আহত গলা ভেসে আসে, ‘রব নাওয়াজ!’

রব নাওয়াজ কেঁপে উঠে। এই আওয়াজ আশেপাশের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ভাসতে থাকে আর নানারকম প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হয়, রব নাওয়াজ! রব নাওয়াজ! প্রতিধ্বনি হতে হতে রক্তজমাট করা ঠান্ডা বাতাসে ভেসে না জানি কই ভেসে যায় সেই ডাক।

অনেকক্ষণ পর রব নাওয়াজ জিজ্ঞেস করে,‘ইয়ে কৌন থা?’ নিজে নিজে বিড়বিড় করে, ‘শুয়োরের বাচ্চা!’

টেটওয়াল ফ্রন্টের আকছার সেপাই যে সাবেক টু/নাইন রেজিমেন্টের ছিল এতটুকু সে জানত। সে নিজেও ওই রেজিমেন্টেরই। কিন্তু এই গলাটা কার? সে এমন বেশুমার মানুষের কথা জানে, যারা এক সময় তার কাছের বন্ধু ছিল, ব্যক্তিগত কারণে আবার কারো কারো সঙ্গে ছিল তার পুরনো শত্রুতা, কিন্তু এ কে যে তার গালিতে আহত হয়ে এমন করুণভাবে চিৎকার করে তাকে সম্বোধন করল?

রব নাওয়াজ দুর্বিন লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু দোলায়িত পাহাড়ি ঘাস ও জঙ্গলের কারণে কিছুই দেখতে পেল না। দুহাত দিয়ে ভেঁপু বানিয়ে আবারো জোরসে বলে, ‘ইয়ে কৌন থা… রব নাওয়াজ বুল রাহা হ্যায়… রব নাওয়াজ… রব নাওয়াজ!’

এই ‘রব নাওয়াজ’ও অনেকক্ষণ পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। রব নাওয়াজ বিড়বিড় করে, ‘শালার, শুয়োরের বাচ্চা!’ তখনই ওদিক থেকে উচ্চ গলা ভেসে আসে, ‘মেঁ হুঁ… মেঁ হুঁ রাম সিং!’

রব নাওয়াজ এ কথা শুনে এমনভাবে লাফিয়ে উঠে যেন এখনই পাখনা লাগিয়ে ওই পাড়ে উড়াল দিতে চায়! প্রথমে স্বগতোক্তি করে, ‘রাম সিং?’ তারপর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে, ‘রাম সিং? আরে রাম সিঙ্গা! শুয়োরের লেজ!’

‘শুয়োরের লেজ’ কথাটা এখনো পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে হারিয়ে যায়নি ওদিক থেকে রাম সিংয়ের গলা ফাটানো আনন্দ-আওয়াজ ভেসে আসে, ‘শালা কুমারের ছা!’

রব নাওয়াজ উত্তেজনা আর কৃত্তিম রাগে গরগর করে তার জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে, ‘শালা শুয়োরের লেজটা একটু বেশিই বকে…!’ রাম সিংকে জবাব দেয়, ‘আবে বাব টালকে কারাহ পারশাদ… আবে খিনজির কি ঝাটকে!’

রাম সিং হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ে। রব নাওয়াজও জোরে জোরে হাসতে থাকে। পাহাড়েরা এই হাসির শব্দ উদারভাবে এদিকওদিক পৌঁছে দেয়। সুবেদার রব নাওয়াজের জোয়ানেরা খামুশ।

হাসিপর্ব শেষ হলে ওদিক থেকে রাম সিংয়ের গলা ভেসে আসে, ‘দেখো ইয়ার, হামে চায়ে পিনি হ্যায়!’

রব নাওয়াজ বলে, ‘পিউ… এশ কারো!’

রাম সিং চিৎকার করে বলে, ‘ওই বেটা, ফূর্তি করব কিভাবে রে, সব মালসামানা তো ওদিকে পড়ে আছে!’

রব নাওয়াজ জিজ্ঞেস করে, ‘কিধর?’

রাম সিং, ‘ওই দিকে, যেখানে গেলে তোমাদের বন্দুকের নল আমাদের উড়িয়ে দিতে পারবে!’

রব হাসে, ‘তো কী চাই তোদের… শুয়োরের লেজ!’

রাম সিং বলে, ‘আমাদের জিনিসপত্তরগুলো আনার সুযোগ দে।’

‘যা, নিয়ে যা!’ এ কথা বলে সে তার জোয়ানদের দিকে তাকায়।

রাম সিংয়ের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ গলা শুনা যায়, ‘তুই তো গুলি মেরে উড়িয়ে দিবি, কুমারের ছা!’

রব নাওয়াজ আন্তরিকতার সঙ্গে বলে, ‘বকিস না, শালা নোংরা মাথার কচ্ছপ কোথাকার!’

রাম সিং হাসে, ‘কসম খা, ফায়ার করবি না!’

রব নাওয়াজ জিজ্ঞেস করে, ‘কিসকি কসম খাও?’

রাম সিং বলে, ‘কিসি কি ভি খালে!’

রব নাওয়াজ হাসে, ‘পাঠিয়ে দে কাউকে, নিয়ে যাক জিনিসপত্তর।’

কয়েক মুহূর্ত নিরব থাকে। যে জোয়ানের হাতে দুর্বিন ছিল সে সুবেদার রব নাওয়াজের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। ট্রিগার চাপতে উদ্যত হলে রব নাওয়াজ বাঁধা দেয়, ‘নেহি… নেহি!’

তারপর সে নিজেই দুর্বিন হাতে নিয়ে চোখে লাগায়। দেখে একটা লোক পাথরের পেছন থেকে ভয়ে ভয়ে বেরুচ্ছে। কিছু দূর পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ করে দ্রুত দৌড়ে একটা ঝোঁপের আড়ালে গায়েব হয়ে যায়। দু’ মিনিট পর যখন ফেরত এল তখন দুহাতেই কিছু জিনিসপত্তর দেখা গেল। মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে দ্রুত দৌড়ে পাথরের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে যায়। ও দৃষ্টির আড়াল হতেই রব নাওয়াজ তার বন্দুকের ট্রিগার টেনে ধরে। গুলি বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রব নাওয়াজ হাহাহা করে হাসিতে ফেটে পড়ে। গুলি আর হাসির শব্দ এক সঙ্গে মিলে কিছুসময় প্রতিধ্বনিত হয়।

তারপর রাম সিংয়ের গলা ভেসে আসে, ‘থ্যাঙ্কিউ!’

‘নো ম্যানশন!’ বলে রব নাওয়াজ জোয়ানদের দিকে তাকায়, ‘এক রাউন্ড হয়ে যাক!’

আনন্দে দু’ তরফ থেকে মুহুর্মুহু কয়েক রাউন্ড ফায়ার হয়ে যায়। তারপর আবার নিরব। রব নাওয়াজ দুর্বিন লাগিয়ে দেখতে পায় পাহাড় থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সে জিজ্ঞেস করে, ‘চা বানিয়ে ফেলেছিস রাম সিঙ্গা?’

উত্তর আসে, ‘এখনো হয়নিরে কুমারের ছা!’

রব নাওয়াজ জাতে কুমার ছিল। কেউ সে দিকে ইঙ্গিত করলে রাগে তার খুন চড়ে যেত। একমাত্র রাম সিংয়ের মুখে সে তা বরদাশত করে নিত। কারণ রাম সিং ছিল তার জানেজিগর দোস্ত। একই গ্রামে দুজন বেড়ে উঠেছে। দুজনের বয়সের পার্থক্যও মাত্র কয়েকদিনের। তাদের পিতারা এবং তাদের পিতাদের পিতারাও পরস্পরের বন্ধু ছিলেন। একই স্কুলে দুজন প্রাইমারি পর্যন্ত পড়েছে। একই দিনে সেনাবাহিনীতে ঢুকেছে। বিশ্বযুদ্ধে একই ফ্রন্টে দুজন এক সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।

রব নাওয়াজ জোয়ানদের সামনে নিজেকে নিয়ে কিছুটা বিব্রতবোধ করে, বিড়বিড় করে বলে, ‘শালা শুয়েরের লেঙ্গুর, এখনো গালিগালাজটা ছাড়তে পারল না!’ তারপর রাম সিংকে ডেকে বলে, ‘বকাবকি ছাড়, শালা উকুনেভরা বান্দর!’

রাম সিংয়ের ঠা ঠা অট্টহাসি ভেসে আসে। রব নাওয়াজের বন্দুকের নল শত্রুপাহাড়ের দিকে তাক করাই ছিল, আনন্দের ঠেলায় বেমালুম সে ট্রিগার টেনে বসে। সঙ্গে সঙ্গে একটি আর্ত-চিৎকার ফালা ফালা করে দেয় পাহাড়ি বাতাসের মগ্নতাকে। রব নাওয়াজ তড়িঘড়ি করে চোখে দুর্বিন বসিয়ে দেখে—একজন মানুষ, নাহ! মানুষ না, রাম সিং! পেট চেপে ধরে পাথরের নিরাপত্তাবেষ্টনি থেকে সামান্য দূরে ছিটকে পড়ে আছে।

রব নাওয়াজ শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠে—‘রাম সিঙ্গা!’ রব লাফ মেরে দাঁড়িয়ে যায়। ঠিক তখনই ওদিক থেকে তিন-চারটি ফায়ার হয়। একটি গুলি রব নাওয়াজের ডান বাজু ঘষে চলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। এবার দুদিক থেকেই পাল্টাপাল্টি ফায়ার শুরু হয়। ওদিকের কিছু সেপাই এই সুযোগে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এদিক থেকেও ফায়ার চলতে থাকে কিন্তু নিশানা ছুঁতে পারে না। রব নাওয়াজ তার জোয়ানদের নামার নির্দেশ দেয়। সেখানেই তিনজন খতম। কিন্তু বাকি জোয়ানেরা আপ্রাণ চেষ্টা করে শেষতক সেই পাহাড়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

রাম সিং রক্তের ভেতর লুটোপুটি খেতে খেতে চোখ থেকে পানি ফেলছিল। গুলি লেগেছে সোজা পেটে। রব নাওয়াজকে দেখে তার চোখ ছলছল করে উঠে। মুচকি হাসি দিয়ে বলে, ‘ওই কুমারের ছা, ইয়ে তু নে কিয়া কিয়া?’

রব নাওয়াজ, রাম সিংয়ের ব্যথা যেন তার নিজের পেটে অনুভব করছিল। কিন্তু ও মুচকি হেসে তার দিকে ঝোঁকে দু’জানু ফেলে বসে রাম সিংয়ের বেল্ট খুলতে থাকে, ‘শুয়োরের লেজ, তোকে বাইরে বের হতে বলেছিল কে?’ বেল্ট খোলায় রাম সিং তীব্র ব্যথা পায়। ব্যথার চোটে চিৎকার করতে থাকে। বেল্ট খোলা হয়ে গেলে রব নাওয়াজ যখন আঘাতের পরীক্ষানিরীক্ষা করছিল তখন রাম সিং রব নাওয়াজের হাত ধরে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘আমি তোকে দেখানোর জন্য বাইরে বেরিয়েছিলাম, আর তুই দিলি ফায়ার করে!’

রব নাওয়াজের গলা ধরে আসছিল, ‘এক আল্লাহর কসম, আমি এমনিতেই বন্দুক চালিয়েছিলাম, জানতাম না তুই যে বাইরে বেরিয়েছিস, আমি অত্যন্ত দুঃখিত!’

রাম সিংয়ের প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। রব নাওয়াজ ও তার জোয়ানেরা কয়েক ঘণ্টা পর ওখানে পৌঁছেছিল। এতক্ষণে অন্তত এক বালতি পরিমাণ রক্ত বের হয়ে যাওয়ার কথা। রাম সিং যে এখনো বেঁচে আছে তাতেই তো রব নাওয়াজ বিস্মিত। তার কোনো আশাই ছিল না যে, এতক্ষণ সে বাঁচবে। ওকে টানাহেঁচড়া করা ভুল হবে। তবু ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে প্লাটুন কমান্ডারের কাছে এখানে একজন ডাক্তার পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে বলেছে, তার বন্ধু রাম সিং মারাত্মক রকমের আহত।

ওখানে ডাক্তারের পৌঁছা, তার উপর আবার সময়মতো পৌঁছা অসম্ভব ব্যাপার। রব নাওয়াজের বিশ্বাাস ছিল রাম সিং আর মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য বেঁচে আছে। তারপরও ওয়ারল্যাসে খবর পাঠিয়ে মুচকি হেসে রাম সিংকে বলে, ‘ডাক্তার আ রহা হ্যায়, কোয়ি ফিকর না র্ক!’

রাম সিং অত্যন্ত ডুবন্ত গলায় ভেবে বলে, ‘ফিকর কিসি বাতকি নেহি… ইয়েহ বাতা… মেরে কেত্নে জোয়ান মারে হ্যায় তুম লোগো নে?’

রব নাওয়াজ উত্তর দেয়, ‘স্রিফ এক!’

রাম সিংয়ের গলা আরো তলিয়ে যায়, ‘তেরে কেত্নে মারে গায়ে?’

রব নাওয়াজ মিথ্যা বলে, ‘ছেহ!’ এ কথা বলে রব নাওয়াজ তার জোয়ানদের দিকে বিশেষ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়।

‘ছয় জন… ছয় জন!’ রাম সিং একেকজনের খোঁজ নেয়, ‘আমি আহত হয়ে গেলে ওদের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ে। তারপর আমি বললাম, খেল্ যাও আপনি আওর দুশমনকি জান্ সে… ছেহ… ঠিক হ্যায়।’ এরপর সে অতীতস্মৃতি রোমন্থনে চলে যায়, ‘রব নাওয়াজ, ইয়াদ হ্যায় ওহ দিন তুমহে?’

রাম সিং অতীতস্মৃতিতে হারিয়ে যায়। ছেলেবেলার কথা, তাদের গ্রামের কথা, স্কুলের গল্প, টু/নাইন জেট রেজিমেন্টের কেচ্ছা, কমান্ডিং অফিসারদের কৌতুক, বিদেশি আজনবি নারীদের সঙ্গে প্রেমের স্মৃতি স্মরণ হতেই কয়েকটি চিত্তাকর্ষক ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। এসব মনে করে হাসতে গেলে হাসির তরঙ্গে পেটে প্রচ- ব্যথা পায়। তবু ব্যথা উপেক্ষা করে রব নাওয়াজকে বলে,‘ওই শুয়োর, মনে আছে তোর সেই ম্যাডামের কথা?’

রব নাওয়াজ জিজ্ঞেস করে, ‘কোন ম্যাডাম?’

রাম সিং, ‘ওই যে ইটালির… আমরা কী যেন নাম দিয়েছিলাম… মহিলা খতরনাক পুরুষখাদক ছিল!’

রব নাওয়জের মহিলাটির কথা মনে পড়ে,‘হু হু, ওই ম্যাডামের নাম দিয়েছিলাম—‘মানিতা ফিনিতা’—প্যায়সা খতম তো তামাশা খতম! তো তোকে কখনো কখনো অতিরিক্ত দয়া করত ওই মুসিলিনির মাগিটা!’

রাম সিং হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসির দমকের সঙ্গে জখম থেকে রক্তের একটি দলা বেরিয়ে আসে। রব নাওয়াজের বাঁধা পট্টি খোলে গেছে। আবার ঠিক করে দিয়ে রাম সিংকে বলে,‘আব খামুশ রহো!’

রাম সিংয়ের গায়ে তীব্র জ্বর। এ কারণেই বোধহয় তার মাথা খুব দ্রুত কাজ করছিল। কথা বলার শক্তি গায়ে নেই তবু বলেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চুপ হযে যায়। যেন চলার আগে দেখে নেয় ট্যাঙ্কিতে পেট্রল কেমন আছে। কিছুক্ষণ পর প্রলাপ বকা শুরু করে। মাঝেমাঝে আবার পূর্ণ হুঁশবুদ্ধি ফিরে আসে। এমনই এক অবস্থায় রাম সিং বন্ধু রব নাওয়াজকে জিজ্ঞেস করে,‘ইয়ার, সাচ সাচ বাতা, কিয়া তুম লোগোকো ওয়াকেয়ি কাশ্মীর চাহিয়েঁ?’

রব নাওয়াজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বলে, ‘হ্যাঁ, রাম সিঙ্গা!’

রাম সিং তার মাথা দুলিয়ে বলে, ‘নেহি, ম্যায় নেহি মান সিক্তা… ইউ হ্যাভ বিন টেইকেন ফর অ্যা রাইড!’

রব নাওয়াজ বিশ্বাাস করানোর জন্য বলে, ‘নো… ইউ হ্যাভ বিন টেইকেন ফর অ্যা রাইড! পঞ্জতন পাকের (আহলে বাইতের) কসম!’

রাম সিং রব নাওয়াজের হাত ধরে বলে, ‘কসম খাস না ইয়ার! তুই হয়তো সত্যই বলছিস!’ কিন্তু রাম সিংয়ের গলা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে রব নাওয়াজের কসমে বিশ্বাস করেনি।

সন্ধ্যা নামার সামান্য আগে প্লাটুন কমান্ডার মেজর আসলাম এসে পৌঁছলেন। সঙ্গে কিছু জোয়ান। কিন্তু কোনো ডাক্তার নেই। রাম সিং অর্ধচেতন অবস্থায় অন্তিম যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। গলার স্বর এতটাই নিচু ও ভাঙা যে তা ধরতে পারা অত্যন্ত মুশকিল। মেজর আসলামও টু/নাইন রেজিমেন্টে ছিলেন। রাম সিংকে খুব ভালো করেই জানতেন। রব নাওয়াজের কাছে সব কথা শোনার পর রাম সিংকে ডাকলেন, ‘রাম সিং… রাম সিং!’

রাম সিং চোখ মেলে শোয়াবস্থা থেকেই সতর্ক হয়ে স্যালুট করে। চোখ খুলে মুহূর্তের জন্য মেজর আসলামকে ভালো করে দেখে, স্যালুট করার জন্য উত্তোলিত হাতখানা তারপর দুম করে পড়ে যায়। রব নাওয়াজ কেঁপে উঠে নিচু শব্দে বলে, ‘ওই রাম সিয়াঁ… শুয়োরের ঠেং…ভুলে গেলি তুই—এটি একটি যুদ্ধ…জং!’

রাম সিং তার কথা শেষ করতে পারেনি। বন্ধ হতে যাওয়া চোখে রব নাওয়াজের দিকে কিছুটা অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকায়.. তারপর একেবারে শীতল হয়ে পড়ে।

Facebook Comments