রেজওয়ান তানিমের কবিতা চতুষ্টয়

শুধুই তোমাকে
আশ্চর্য এই—দূরত্বের আঘাতেও বেদনাকে অনুভব করিনি আমি। মেনেছি সত্য বলে, ভালোবাসা বেদনারই আরেক রূপ। ভালোবাসা যেমন, যে হৃদয় কাছে, উদ্বিগ্ন থাকা সর্বক্ষণ তার মঙ্গল কামনায়। যত প্রেমগাঁথা যুগে যুগে অমর হয়ে আছে স্বপ্নে ও কল্পনার আঁচড়ে—সমস্তই যে না পাওয়ার বেদনায় দগ্ধ হবার ইতিকথা। তাই এই যে নিগূঢ় প্রেম, আমাকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে ভাসিয়ে—সেও নিবিড় বেদনাময়।

বেদনার নীলে স্নান করিয়ে কাছে টেনে নিলাম আনত মনের প্রেমকে, ওর বুকেও দেখি লেখা আছে অজানা কথার সুখ। বেদনারও যে ভাষা, আনকোরা রোদ হয়ে তাকে ছুঁয়ে দেই। আলিঙ্গনে নিয়ে সে বলে ওঠে নিঃশর্ত সমর্পণে—ভুলগুলো ক্ষমা করো তুমি।

পাশে থাকা ছায়ার কখনো হয় না বিরাম, এমনকি মৃত্যুতেও। বলে ভালোবাসা নৈঃশব্দের ভাষায়, আমি আছি, তোমার কাছাকাছি—ছায়া হয়ে, পাতা ঝরা বয়েসী কোনো অচিন বৃক্ষ হয়ে, গান ভুলে যাওয়া ক্লান্ত কোকিল হয়ে, দলে যাওয়া দূর্বাদল হয়ে, মাড়িয়ে যাওয়া সজনে ডাটা হয়ে, তৃষ্ণার্ত চাতক হয়ে, তোমার এ বেদনার স্বপ্নগুলো হয়ে।

তিনি
হাতে সকাল তুলে দিয়ে একদিন
বলেছিলেন, ঠিক এভাবেই
পূর্ণ করবেন হৃদয়, গলে যাওয়া বেদনার আলোয়!
হরিণের চোখে পেখম মেলবে
এইটুকু উষ্ণতা!

প্রতীক্ষার সূর্য হেলে পরে অপেক্ষায়
কৌতুক নিয়ে দেখছি
ব্যক্তিগত অসুখের বৃষ্টি যাচ্ছে, আসছে বারংবার।
ভিজিয়ে দিয়ে শেখাচ্ছে
কাতরতা এক মাতাল অসুখ।

আলোয় ভরিয়ে আমাকে, গাইছে প্রণয় প্রস্থান
উপভোগ্য অবশিষ্ট উষ্ণতাটুকু,
ফুরিয়ে যাচ্ছে শ্বাসহীন মোমের মতো!

রাত নেমে গেলে, আহত হরিণ চোখে
প্রেম নামে না আর…

আলো অসুখের গান
অথবা সাক্ষ্য দিক আলো অসুখ
ম্যারিয়ান গির্জা, এইভাবে শুয়ে থাকা পাশাপাশি,
জলপাই দিন, আর রোদের দরদ
লুকনো যাপন, নোখে আঁকা নীল প্রেম।

শুনেছি সূর্যাস্তের সময়, নগ্ন হতে নেই
এমনকি নিজের কাছেও! অবিশ্বাস নিজস্ব আগুন
বিকিকিনি করে, শিরীষ পাতার প্রেম
গ্লানিময় ঘৃণা তখন, নিষিদ্ধ আপেল!

কেউ মনে রাখেনি সে ডুবি ভাসি চিলেকোঠা,
বেদনার পায়ে নদীর নূপুর, পোড়া চিবুকের ভাষাহীন কথা!
এই শীত শিখিয়ে গেছে অবজ্ঞার মন্ত্র, তাই
একবার চুমু লিখে পুনর্জন্ম নিলো ইতিহাস!

শাড়িতে রক্তের পাড় একে দিয়ে,
কখন বারুদ ভুলে গেছে গত জন্মপাপ—
বলেনি বেহায়া ঘুণ্টিঘর! অপেক্ষার
তীব্র তমোহর, ভুল বিপ্লব এনেছে বারবার!

অনেক মাতাল, মহুয়ার বনে
বসে লিখে যাচ্ছে নেশা ধুতুরার গান।
আমি শুধু দেখি বিবর্তনের ধারায়
উল্টে যাচ্ছে সময়, স্নান শেষে চেনাদুপুর রঙ পাল্টায়।

পুনরুত্থান
অপর্যাপ্ত আলোর শোকে যে সব
বেদনার্ত বিকেল, অনেক ক্লান্তিতে শুয়েছিল
উপশম খুঁজে নিতে, তোমাদের কোলে; উপবাস ভঙ্গকালে
একবার চেয়েছি, সে যেন গেয়ে ওঠে জলমোছা দিন
আর উল্টো জীবন ধরে বয়ে বেড়ানো গান—
যারা নত হয়েছিল প্রার্থনায়, অসমাপ্ত সঙ্গমের আহ্বানে!

হয়তো ওরা শুনেছিল কোনো এক
পূর্বপুরুষের কাছে, এইরকম বেভুল মেঘ আর
কান্নাময় দিনে পৃথিবী ছেড়েছিলেন
নাজারেথের জলোচ্ছ্বাস, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ!
যে কিনা শপথ নিয়েছিল নশ্বর সকাল শেষে
পুনর্জন্মের গল্প লিখবে বিষণ্ন রোববারে।

হায় অন্ধকার,
জানে না এসব পতঙ্গপ্রায় মানুষেরা
পৃথিবীতে হয়তো কখনোই থাকে না কোথাও
এইসব অপার্থিব আর মহৎ মোক্ষ সঙ্গম।
তাই তারা বারবার প্রত্যাখ্যাত হয় আর
ফিরে ফিরে আসে, হেলে পরা বিকেলের
অনেক অসুখ আর বেদনাকে মনে রেখে…

Facebook Comments