মুক্তগদ্যের ফর্ম বা গদ্যের পসরা

মুক্তগদ্য বলে আদতে কিছু আছে কি-না/ছিলো কি-না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে আমার। কোনোকিছু নিয়ে ভাবনার তবলায় বাড়ি দেওয়ার পর লেখার যে তব তব আওয়াজ বের হয়ে আসে—কেউ কেউ এটাকে মুক্তগদ্য বলে। পরবর্তীতে আরো কয়েকজন যখন ঐ গদ্যের রাফখাতা দেখেন এবং বলেন ‘এতো সুন্দর মুক্তগদ্য লিখেন উনি, আহা!’ এমন মন্তব্য করলে/না করলেও লেখাটার নাম হয়ে ওঠে মুক্তগদ্য। স্বাধীন চিন্তার মানুষকে নাস্তিক বা ভালোমানুষি দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে যে স্মৃতির পালকি খাতা/কম্পিউটার বা মোবাইল/ট্যাবলেটের কীবোর্ডের উপর মন্থর গতিতে চলতে থাকে ওগুলোকেও তো কতজন ‘এতো সুন্দর গদ্য তোমার, জানো আমি এমন লেখা লিখতে পারি না। তুমি পারো তাই তোমার এমন মুক্তগদ্যের হাত দেখে খুব হিংসা হয় জানো!’ এগুলো বলে। যেন জগতের ভাত রুটি ছাড়া আর সবকিছুর আলাপ মুক্তগদ্যের গোলাপে কাঁটার সদৃশ। মানুষ ভাবতেও পারে বাবা!

***

এই কদিন আগে জিম মিমের বিয়ে হলো, ওদের বিয়ে নিয়ে যে কত কথা রটে গেলো পুরো পাড়া মহল্লায়;—কই, ওদের তো গায়ে মাখার কোনো নজির চোখে পড়ছে না। ওদের বউ ওদের অনেক কাছের আত্মীয় বলে কেউ কেউ তো বলেই ফেলেছে ওদের বিয়ে টিকবে না বাবু দেইখো! সিগারেটের পুটকিতে সুখ টান দিয়ে ধোয়া বাতাসে গোল গোল করে উড়ায়ে দেওয়ার মতো ওদের আলাপগুলারেও ধোয়ার সাথে তুলনা করি। বলি জীবনকে নিয়ে তোদের কোনো স্বাদ/বেস্বাদের আলাপ নেই। তোরা হলি পুরো পাড়া মাতিয়ে রাখা একটা বয়স্ক মোরগের মতন, সেকেন্ডে সেকেন্ডে সবকিছু কেমন আউলায়া ফেলিস। হঠাৎ বাতাসে তুব করে মোমবাতি নিভে সবকিছু কেমন কোমল হয়ে ওঠার মতো ওরা আমার জীবনের আলাপ শুনে দমে যায়। নেশাখোরের মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার কথা ওরা কানের ভেতর প্রবেশ করাবে বলে আগ্রহের সুরে টার্কি মুরগীর মতো গলা বাড়াতেই আমি ভেগে যাই!

***

ঢাকা কোচ স্ট্যান্ডে একটা মসজিদ আছে, বাইরে ওজুখানা, কলপাড়, একদম রাস্তার সাথে লাগোয়া আরকি। মসজিদের মুয়াজ্জিন মতো বুড়ো লোকটা বার্জার কালার ব্যাংকের রঙের কৌটা নিয়ে ঢাকাগামী প্রত্যেকটা বাসে উঠেন, মসজিদের জন্য টাকা কালেকশন করেন, বিনিময়ে মৃত্যুর পরের জীবনের ভালো কামনা করে নেমে আসেন। (আচ্ছা, যারা মৃত্যুর পরের সময়কে বিশ্বাস করে না তারা এই কৃত্তিম কৃতজ্ঞতার ভাষাকে কিভাবে আমলে নেন?) ঢাকাগামী দূরপাল্লার বাসগুলো খুব দ্রুত লালন শাহ ব্রিজে পৌঁছুতে চায়, কারণ ওখানকার টোল প্লাজায় সাপের লেজের মতো জ্যাম লেগেই থাকে। তাই ভেড়ামারার যাত্রী নিয়ে দ্রুত রাস্তা মাড়াতে গিয়ে রাস্তা পার হতে যাওয়া কুকুরটার মুখের উপর দিয়ে বাসটা চলে যায়। নীথর দেহর পুরোটা অংশ কতো মোলায়েম, পশমগুলো ডুবলো ঘাসের মতো সোজা দাঁড়িয়ে, হাত-পা হালকা গোছানো; যেন রাতের প্রহরা শেষে মাত্র ঘুমিয়েছে। শুধু চোয়ালের দুইপাশটা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে থাকায় কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না। বিকৃত কোনোকিছুকে মানুষ পছন্দের তালিকায় রাখে না, সেটা মানব হোক বা কোনো পশু। আমাদের সবকিছু এমন, ভুলে, না জেনে বা কখনো কখনো সবকিছু জেনেশুনে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি অসফলতা বা নিরানন্দের চাকার নিচে। রক্তাক্ত মন, খুলে পড়ে যাওয়া অকেজো মানসিকতা নিয়ে সফলতার তাপানুকূল কোচে চড়ে দূরে ফিরে যেতে পারি না। এখানে সবাই থামে না, আমরা তবুও থেমে যাই, সবাই না ফিরে কতদূরে সুখের পাহাড়ে আনন্দের মেঘ দেখে উৎফুল্ল হয়ে যায়, আমরা তো ফিরে ফিরে চলে আসি বিলে/ধানি আবাদি জমিতে/কৃষকের মাথাল মাথায় রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলার গ্রামে/ঘুমকাতুরে লোকটার কর্মঠ হয়ে যাওয়া কর্মের স্থলে তো ফিরে ফিরে আসি। কোনো ক্লান্তিকর সিচুয়েশন আমাকে ছোঁয় না, দুশ্চিন্তার রাজ্য আমার কাছে প্রশান্তির হেলদি স্যালারির কোম্পানি মনে হয়।
এই তো, এটাই। এভাবে সব বেড়ে ওঠে, শান্তিতে আমাদের ঘুম উবে যায়। ব্যথার মাতলামি নিয়ে পানি ওঠা রাস্তায় পাগলামি দেখি। সময়, ভালোবাসি তোমাকে!

***

মানিক বাবুর ‘জননী’ উপন্যাসে শ্যামা আর শীতলের মনোভাব বুঝতে বুঝতে আমাদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। ছ্যাতছ্যাতে ভেজা রাস্তার পানি স্যান্ডেলের গোড়ায় লেগে এলোপাথাড়ি ছড়িয়ে শরীরের কোথায় লেগে গেলো, এমন অদরকারি প্রশ্নে সুন্দর, গোছালো একটা বিষয় এদিকওদিক ছুটে যাওয়ার মতো সবকিছু মিশমার হতে থাকে সবার। উদ্ভট সব কথার কালবোশেখি ঝড়ের মধ্যে একটা অর্থহীন বাক্যকে কোনো কথা ছাড়া যখন ভালো লাগতে শুরু করবে—ভাবি, জীবন হয়তো এমন। আবার কখনো এলোপাথাড়ি নোংরা কাদার মতো বিরক্তিকর, মাঝেমধ্যে তো জননী’র শীতল চরিত্রে যে, মাটির হাঁটু কাদা রাস্তা, বাঁকের পরে বাঁক দেখতে অসহ্য হয়ে ‘ধুর ছাই’ বলে ঘাসের উপর অস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা গরম বায়ুর মতো মনে হয়। মনে হয়, এটাও হয়তো জীবনের অংশবিশেষ।

***

ভেড়ামারায় যে রেল স্টেশন আছে না? ঐ-যে যেখানে একজন বিডিআর কর্মকর্তা ট্রেনে কাটা পড়েছিলো, ঐটা। টুকরো হয়ে পড়ে থাকা ঐ রেলপথের উপর সন্ধ্যাবাতাস খেতে খেতে যখন ‘আজ বউ কী রানছিলো জানিস? ডাল, পানি না দি, খালি তেল পিয়াজ মরিচ দি সিদ্দ করছিলো, আর আলুভত্তা। সালার বো’তো দুইখেন আলুর মইদ্দ্যে একশ গিরাম তেল ঢালি দিছে, সালার কীযে টেস্ট ভাই, না খালি তুই বুঝবি না’ এটুকু শুনি, তখন আমার আমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় হিপোক্রেসি লোক বলে মনে হয়। চিন্তার অলিগলিতে তখন একটা কথায় ঘূর্ণিঝড়ের মতো ফিরে ফিরে চলতে থাকে যে, এটাই হয়তো জীবন! আমরা হয়তো জানি না, বুঝি না বলে বিবাহিত লোকদের থেকে দূরে দূরে থাকি, (বিয়ের পরে মানুষের লাজ লজ্জা কমে যায় বলে শুনেছি, প্রমাণও পেয়েছি) কেন এগুলো করে এসেছি ওসব আর ভাবতে পারি না। ট্রেনের কড়া হুইসেলে আমার পা আমাকে সরিয়ে চায়ের দোকানে এনে বসিয়ে দেয়

খন্ড খন্ড এসব আলাপকে কেউ মুক্তগদ্য বলবে কি-না জানি না। আমার কোনো পাঠক নেই। তাই বাড়তি একটা যন্ত্রণা থেকে খোদার অদৃশ্য শক্তি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে আনন্দ পাই। মনে যা আসে লিখি। প্রিয় পাঠক, বনরুটির মধ্যে একটা ডিম ভেজে ছেড়ে দিলে মানুষজন বার্গার মনে করে যে হারে খেতে থাকে, খোদা! আমার এই লেখাটাও তেমন। লেখায় কিছু নেই, কিন্তু নাম দিয়েছি মুক্তগদ্য, আপনারা যারা পড়লেন আপনাদের বিরক্তির কারণ হতে পারাই আমার সফলতা।

Facebook Comments