মির্জা গালিব: শতাব্দীজয়ী গদ্যরীতি উদ্ভাবকের বহুরৈখিক জীবন

সাহিত্যিকদের আলাপচারিতায় যখনই কাব্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে, তখন একটা নাম স্বমহিমায়ই আসন পেতে বসে হৃদয়ে—মির্জা গালিব! মনে হয় যেন আমাদের উর্দূ সাহিত্যটাই গালিব ছাড়া অভাবনীয়। যেমনটা অভাবনীয় পৃথিবীখ্যাত ভালোবাসার সৌধ তাজমহলশূন্য আমাদের হিন্দুস্তান! কথা, চিন্তার নূতনত্বেরই হোক বা কল্পনার! কিংবা নতুন গদ্যের অস্তিত্বের। ভাষা ও সাহিত্যের সবখানেই তাকে ইমামতির মুসল্লায়ই দেখা যায়! কারণ একটাই; দেড়শ বছর অতীত হয়ে যাবার পরও শুধু গালিব কাব্যিকতায়ই নয়, বরং তার গদ্যের জাদুকরি কারিশমায়ই সাহিত্যিকদের মস্তিষ্ক জয় করে নিয়েছে। অর্থাৎ সাহিত্যে গালিবকে আজও অতটা আগ্রহের সাথেই পড়া হয়। পড়ানো হয়। যতটা কিনা আজ থেকে দেড়শ বছর পেছনে হতো! ব্যাপারটা অনেকটাই এমন যেন, গালিবের সমূদয় সৃষ্টিই সাহিত্যের ভুবনে কেয়ামত অবধি অবিনশ্বর! তার কর্মসূর্যের কোনো আস্তাচল নেই! বলার ঐকান্তিক যে কুশলতায় গালিব সাহিত্যামোদিদের হৃদয়ে ঘর বেঁধে নিয়েছেন, সেই ঐকান্তিক কুশলতাটা শুধু তারই মস্তিষ্কপ্রসূত ছিলো না বরং সমকালীন কবিদের থেকে ভিন্নপথ অবলম্বন করাই ছিলো তার বৈশিষ্ট্যের অনন্য ভূষণ। এ কারণেই গালিবের কণ্ঠে বেজে ওঠে উক্ত বিষয়ের মীমাংসা, কবিতায়—

‘গালিবের চেয়েও মস্তিষ্কধারী আছে পৃথিবীত
তারা কেবল গালিবের কুশলতায়ই বয়ান করে যায়!’

নিজের ফার্সি কবিতার উপর গালিবের ভালোবাসা ছিলো স্বীকৃত। কিন্তু তার গ্রহণযোগ্যতার জন্যই উর্দূতে তার একটি কবিতার বইয়ের জন্ম হয়। যেটা তাকে শুধু উর্দূতেই নয় বরং পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষি কবিদের উপরেও তাকে বিজিত করে রেখেছে।
আজকে আমরা গালিবের কবিতার বিপরীত দিকের রঙের উপর দৃষ্টি আকর্ষণ করার পাশাপাশি তার সর্বজনবোধ্য উর্দূ গদ্যের উপরেও আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তার পূর্বেই আমরা গালিবের কথাকে অধ্যায়ের শুরুতে নিয়ে আসি। চলুন তাহলে তার জীন্দেগীর উপর একবার চোখ ফিরিয়ে আসা যাক—
মির্জা গালিবের আসল নাম ছিলো আসাদুল্লাহ খান বেগ। পিতা, আব্দুল্লাহ বেগ। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর আগ্রায় জন্ম তার। শৈশবেই এতিম হয়ে যান গালিব। তারপর তিনি চাচা নাসরুল্লাহ বেগের হাতে বেড়ে উঠেন। গালিব আট বছরে পা দিতেই চাচাও পৃথিবীকে বিদায় জানান। তারপর নাওয়াব আহমাদ খান গালিবের পরিবারকে ইংরেজদের থেকে ভাতার ব্যবস্থা করিয়ে দেন। সেই সূত্রেই ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে গালিবের ১৩ বছর বয়সেই নওয়াব আহমাদ বখ্সের ছোটো ভাই মির্জা ইলাহি বখ্সের মেয়ের সাথে তার বিবাহ হয়। বিবাহের পর গালিব নিজের পিতৃভূমি খায়রাবাদ-এর কথা বলে সর্বদার জন্যই দিল্লিতে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। পরবর্তীতে গোটা জীবনই তিনি দিল্লিতেই থেকে জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে কাটিয়ে দেন। সেই সূত্রেই একটা লম্বা সময় গত হওয়ার পর বাহাদুর শাহ্ জাফরের দরবারে কবিদের শিক্ষক হিসেবে তার নিযোগ মিলে।
সেই সময় তিনি নাজমুদ্দৌলা, দাবীরুল মুলক, মির্জা নওশা, আসাদুল্লাহ খান গালিব, বাহাদুর নিজাম জঙ্গ-এর মতো নামের ভূষণ লাভ করেন। ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উর্দূ ও ফার্সি ভাষায় দ্যুতিছড়ানো এই কাব্যপ্রতিভা লোকান্তরিত হন। দিল্লিতেই নিজামুদ্দিনের নিকটস্থ এক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
গালিবের কবিতার গতর জীবনের সঞ্জীবনি রস ও সুফিবাদের আঁচড়ে চিত্রল। একটা চরণে চোখ ফেরাই—

‘নিজেকে ভুলে গেলেই হবে তুমি বিস্মৃত
দরবেশীর কি আছে এখানে!’

যাপিতের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে দুঃখের সাথে এমনই সহাবস্থান আমাদের, জীবনের সমূহ যাতনা অন্তর ফুঁড়ে কান্না হয়ে ঝরে। গালিবের কন্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘দিল তো পাথর বা ইট নয়, বেদনা তো উথলাবেই
আমরা কাঁদবো হাজারবার, কেউ আমাদের কেন-ই বা কষ্ট দেবে!’

গালিবের এই অনুভবটা সদাই জাগ্রত ছিলো যে, হয়তো আমি মালিকের সব হক আদায় করতে পরি নি! তাই তার কন্ঠে অনুরণিত হয় ব্যথার সুর—

‘কোন্ মুখে তুমি কাবায় যাবে গালিব
লজ্জাকে কি ঝেটে বিদেয় করেছ তবে!’

এই গজলেরই অপর পঙতিতে মূর্ত হয়ে ওঠে মৃত্যুর অনিবার্যতা—

‘সূর্যসত্য মৃত্যুর একটি দিন
তবু কেন ঘুম আসে না রাতে!’

গালিবের অনুভব এখানেও সজাগ! তাকে আল্লাহ তাআলা যে সুস্থ মস্তিষ্ক, আধ্যাতিক মানস ও যোগ্যতার গুণে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সেই পথে যদি তিনি হাঁটতেন, তাহলে আল্লাহর অলি হয়ে যেতেন। গালিবের কন্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘তাসাউফের এই মাসআলা তো তোমারই বর্ণানোর ছিলো গালিব
তোমাকে তো অলিই মনে করতাম আমরা, যদি না তুমি ভবঘুরে হতে!’

গালিবের কিছু কিছু কবিতা এমনও আছে, যেগুলোর মাঝ দিয়ে তাকে সাহাবাদের চেতনার নায়ের যাত্রী অনুভূত হয়!
যেমন হজরত আবু বকর রা.। যাকে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতেই প্রভু মারফত জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন! তবু তিনি কেয়ামত দিবসে মালিকের সামনে হাজিরীর ভয়ে বলতেন—‘হায়! যদি আমি সেদিন গাছ হয়ে যেতাম, যাকে কেটে ফেলা হোতো!’ কখনো বলতেন—‘হায়! যদি আমি ঘাস হতাম, জানোয়ার আমাকে খেয়ে নিতো!’ আবার কখনো বলতেন—‘হায়! যদি আমি কোনো মুমিনের শরীরের পশম হতাম!’
একবার বাগানে গিয়ে কোনো এক প্রাণীকে নির্বিকার বসে থাকতে দেখে একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন—‘তুই কতোই না সৌভাগ্যবান! বাগানে খাস। গাছের ছায়ায় ঘুরে বেড়াস। ঘরে ফিরে যাস ফের! দিনশেষে তোর কোনো হিসেব কিতেব নেই! হায়, আবু বকরও যদি তোর মতো হোতো!’
আমরা বুঝতে পারি, গালিব উপরোক্ত ঘটনার ভাবানুবাদ নিম্নোক্ত কবিতায়ই দেখাবার চেষ্টা করেছেন—

‘ছিলো না কিছুই তবু তো খোদা ছিলো, কিছু না থাকতো তবু তো থাকতেন খোদা
আমাকে তো চুবানোর ছিলো, যদি না হতো তাহলে কি হোতো!’

গালিব জানতেন একদিন মৃত্যু আসবেই! এবং বান্দাকে তার ভালোমন্দ আমলেরও হিসেব দিতে হবে আখেরাতে। একারণেই নিজের অস্তিত্বের উপর দণ্ডাজ্ঞা প্রকাশ করে বলেন—‘যখন পৃথিবীতে কোনোকিছুরই অস্তিত্ব ছিলো না তখন খোদা ছিলেন। যদি পৃথিবীর সবকিছুই মানব মানবী ছাড়া কিছু না হোতো, তবুও খোদা একক সত্বায়ই বিদ্যমান হতেন। কিন্তু আমার অস্তিত্বই আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে! যদি আমি পৃথিবীতে জন্মলাভ না করতাম, তাহলে প্রতিদান দিবসের হিসাব থেকে রক্ষা পেতাম! অপর এক কবিতায় গালিব কেয়ামত দিবসে গুনাহের কারণে বা আল্লাহর সাথে নাফরমানির ভয়ে তার সম্মুখস্থ হতে কেঁপে ওঠেন! গালিবের কন্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘মরে আমরা যেই লজ্জাবনত হলাম, তারচে নদীতে ডুবে গেলাম না কেনো!
না কখনো আমাদের জানাজা হোতো,
আর না উঠতো কোথাও মাজার!’

এক কবিতায় গালিব এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করেন যে, যতদিন পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীতে জীবিত থাকে—এ জীবন দর্শনের। পৃথিবীর এই জেলখানায় শাস্তির সাথে সাথে দুঃখও একীভূত। মৃত্যুর পূর্বে এই দুঃখবোধ ও লাঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়াটাও দুষ্কর! সেজন্যই মানুষদের দুঃখ কষ্টের যাপিতের মাঝে সহনশীলতা ও ধৈর্যের পাঠ প্রর্থিত। গালিবের কণ্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘বন্দিত্বের জীবন ও দুশ্চিন্তায় গিলে খাওয়া ইনসান তো একই
মৃত্যুর পূর্বে তাহলে মানুষ মুক্তিই বা পাবে কেন!

গালিবের এই গুণটি প্রশংসনীয়ই ছিলো। তিনি যে কারোর কবিতাকেই মূল্যায়নে কৃপণতা করতেন না! কখনো এতোটাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন যে, উনাকে বাড়াবাড়ি করছেন বলে মনে হোতো! যখন তিনি মুমিন-এর এই কবিতাটি শোনেন—

‘আমার কাছেই থাকো তুমি
দ্বিতীয় কেউ কাছে না থাকে যখন!’

তখন ওই মজলিসেই তিনি পতিক্রিয়াক্রান্ত হয়ে বলেন—‘হায়! মুমিন যদি আমার সমগ্র কবিতাই নিয়ে নিতো, স্রেফ এই দু’চরণের বদলায়!’
একবার দাগ-এর এই কবিতাখানি বারবার পড়ে পড়ে প্রশংসায় মেতে উঠতেন—

‘অগ্নিময় হয়ে ওঠার আগেই সে হাপর বন্ধ করে বলে
আঁধার চলে যায় অথবা পরওয়ানা আসে দেখো!’

শুখন মীর ও তাকী মীর-এর প্রতি শ্রদ্ধায় গালিবের কন্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘পতিতদের উস্তাদ তুমি নও হে গালিব
কথিতই তো, আগের কালে কোনো মীর হয়তো ছিলো!’

এর পূর্বে আমরা গালিবের চিঠি অথবা তার লিখনীর ধাতের দিকে একটু চোখ ফিরিয়ে আসি। আমরা নবীন উর্দূ কবি এবং প্রবীন সমালোচক, জীবনী লেখক মাওলানা আলতাফ হুসাইন হালীর কথা বলি। যাকে গালিবের আশাপ্রদ শাগরেদদের মধ্য থেকে গণ্য করা হয়। যিনি গালিবের জীবনের প্রবহমানতাকে খুব কাছ থেকেই পরখ করেছেন। তিনি লিখেন—‘মির্জা গালিবের আখলাক খুবই প্রশস্ত ছিলো। যে-ই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতো, তার সাথেই খোলামেলা ও হাস্যমুখে সাক্ষাৎ করতেন, গালিব। আর যে-ই তার সাথে একবার সাক্ষাৎ করতে পারতো, সে-ই পুনর্বার সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হয়ে থাকত! বন্ধুদের দেখা পেলে গালিব খুশিতে টইটুম্বুর হয়ে যেতেন। তাদের সুখে সুখী আর দুখে দুখী হয়ে যেতেন। এই স্বভাবগুণেই কারণেই তার বন্ধুত্বের জাল ছিলো বিস্তৃত। প্রত্যের অদর্শ ও মাযহাব থেকেই ছিলো সেটা। শুধু দিল্লিতেই নয়, সমগ্র হিন্দুস্তানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো।’
মাওলানা হালী গালিবের সময়কাল স্মরণ করে তাকে একজন ‘জারিফ ইনসান’ বলেছেন। গালিবের সাথে যদি প্রিয়দের কেউ সাধারণ থেকে সাধারণ বিষয়েও কথা বলত, কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে তার কথারই একটা ধাত বের করে নিতেন। একবার রমজান চলে যাওয়ার পর তিনি খানকায় যান। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—মির্জা, তুমি কয়টা রোজা রেখেছ? তখন গালিব বলেন—‘পীর ও মুর্শেদ আমার! স্রেফ একটা রোজা রাখিনি।’

গালিবের লেখা পড়ার পর এটাই মনে হবে যে, তাতে কোনোও বার্তা নেই। বরং আগমন স্পষ্ট! মাওলানা হালী বলেন, তার কারণ এটাই—‘মির্জার পূর্বে না কেউ এই পদ্ধতিতে কিতাব লিখেছেন না পর্বর্তীতে কেউ তার পুরোপুরো অনুসারী হতে পারবেন!’
সন্দেহাতীতভাবেই গালিব নবীন এই গদ্যরীতির উদ্ভাবক ছিলেন। তার এই বিশেষত্ব স্বীকার করেই শীবলি নোমানি রহ. লিখেন, ‘উর্দূ কাব্যরীতির নবীন এই ঢঙের সংস্কারক ও ইমাম তো ছিলেন মরহুম সাইয়্যিদ সাহেব। কিন্তু তার পাথুরে ভিত্তিপ্রস্তর করেছেন মূলত মির্জা গালিবই!’
এই ধারাবাহিকতায়ই অর্থাৎ গালিবের কাবিতার প্রশংসা করতে গিয়ে শায়েখ আকরাম বলেন—‘দিল্লির ভাষাকে গালিব সত্যিকার ভাষার জামা পরিয়েছেন। নতুন ধাতের শিল্পকর্মের এমনই স্ফূরণ ঘটিয়েছেন তাতে, যার কারণে উর্দু ভাষা সাধারণ অসাধারণ সব মহলেই আদর পেয়েছে। এবং উর্দূ গদ্যের জন্য ভাষার একটা ধারা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার অনুসরণ, অন্যান্যদের জন্য অঘোষিতভাবেই জরুরি হয়ে পড়ে।’

প্রকৃত অর্থে গালিবের লিখনীটা তার জীবন এবং তৎকালীন রাজনীতির উথ্যান-পতনের দলিল। একজন মর্যাদবান ব্যাক্তি এই বিষয়ে লিখেন—‘গালিবের লেখালেখি যতটা সুদূরপ্রসারী, তার সময়কালের রাজনৈতিক স্বকীয়তা ও আচরিক বিপ্লব যতটা দৃষ্টিগ্রাসী, তার চেয়েও বেশি স্বচ্ছ একজন লেখকের জীবনের দর্পণ। সেই আয়নার গালিবের জিন্দেগীর ভরপুর প্রেমের দর্শন মিলে!’
নিজের রচনায় গালিব যে আলাদা স্বকীয়তার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, সেটাকে একালের ভাষার লেখনীর অভিনব স্টাইলই বলতে হবে। গালিব নিজেই বলেন—‘আমি লিখনীতে এমন সংস্কারের সূচনা করেছি, চিঠিপত্রকে কথপকথনে রূপায়ন করে দিয়েছি।’
গালিবের লেখায় যে পরিশোধনের সিরাপ (দাওয়াই) গোচরীভূত হয়, এটা তারই অংশ ছিলো। প্রকৃতার্থে গালিব লেখালেখিকে আত্মার আহার্য মনে করতেন। এক চিঠিতে তিনি লিখেন—‘তোমার চিঠি আসায় সে তেমনি খুশি হয়, যেমন নাকি কোনো বন্ধুর আগমন তাকে খুশি করে!’
অপর এক চিঠিতে তিনি তাফতাহ্কে লিখেন—‘এই একাকিত্বের মাঝে আমি কেবল চিঠির সান্নিধ্যই অর্জন করি। অর্থাৎ, যার চিঠিই আসে—আমি বুঝতে পারি যে সে এসেছে। আল্লাহর করুণা, কোনোদিন এমন অতিবাহিত হয়নি, যেদিন এদিক-সেদিক থেকে দু-চারটা চিঠি না আসে…। দিন, এগুলো পড়তে লেখতেই কেটে যেত!’

চিঠি লেখার সময় চিন্তা করতেন, তার চিঠির জবাবে প্রাপক কী লিখতে পারে! এবং এর প্রতিউত্তরে তাকে পুনর্বারই-বা কী লিখতে হবে!
কেননা, এক কবিতায় তিনি বলেন—

‘ডাকপিয়নের পুনরাগমনের পূর্বেই আরেকটি জবাবী চিঠি লিখে রাখো
আমি জানি! যেটা সে লিখবে, উত্তরে!’

ঠিক এমনিভাবেই নানা জায়গায় চিঠিপ্রীতি ঝলকিত হয় তার বলায়, লেখায়। গালিবের কন্ঠ আবার বেজে ওঠে—

‘উদ্দেশ্য কিছুই না হোক, চিঠি লিখবোই
আমারা যে তেমার নামের পাগল!’

***

আমাদের দিয়েই লেখাক, কেউ যদি তাকে লেখায়ই চিঠি
কানের উপর কলম রেখেই ঘর থেকে বেরুবে সে, সকাল হলে!
গালিবের জীবনপাঠ করাকালীন বিভিন্ন জায়গায় তার বন্ধু, প্রিয়দের সাথে বলা কথাবার্তা, ঘটনার সূরত ধারণ করে নিয়েছে!

গালিবের সময়ে দিল্লিতে কবিতার গণ মজলিস হতো। অধিকাংশ মজলিসই দীর্ঘ রাত করে শেষ হতো। এমনি এক কবিতার জলসান্তে বহিরাগত একজন কবি, যিনি দিল্লির বাহির থেকে তাশরীফ এনেছিলেন। গালিবের সাথে তার ঘরের দিকেই যাচ্ছিলেন। চলতে চলতে গলির মোড়ে একটা গাধা দেখতে পান। একটু এগিয়ে আরেকটা মোড় পেরুতে গিয়ে ঘটনক্রমে আরেকটা গাধা দেখে ফেলেন। মনে মনে গালিবকে হেনস্তা করার ছক এঁকে ফেলেন কবি। জিগেস করে বসেন—‘গালিব সাহেব! দিল্লিতে তো অনেক গাধা দেখছি!’ গালিব অত্যন্ত সাদামাটাভাবে জবাব দেন—‘কি করবো সাহেব! বাহির থেকে চলে আসে!’
একজন চিন্তাবিদ বলেছেন—‘কোনো বিষয়ের পাঠের উপর দিয়ে যদি বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তবুও তার পাঠ আগের মতোই বহাল থাকে, তাহলে এটা তার মহানত্বেরই দলিল!’
চিন্তাবিদের উপরোল্লিখিত উক্তিটি গালিবের সৃষ্টিশীলতার উপরই সত্যায়িত হয়। এজন্যই যে, বর্তমান সময়েই গোপী চান্দ নারাঙ্গের গালিবকে নিয়ে লেখা (জাদালিয়্যাতি ওজা) উর্দূ কিতাবের অনুবাদ ইংরেজীতে শ্রীন্দর দেবল ‘GHALIB ..Innvative Meanings and the Ingenious Mind’ নামে করেছেন। যা এখনই, বিগত বছরেই অক্সফোর্ড বিশ্বদিদ্যালয়ের প্রেস দ্বারা পাঠকদের জন্য দেখা হয়েছে। এই বই পাঠান্তে পতিক্রিয়া পেশ করত শীর্ষস্থানীয় গীতিকার, চিত্রনায়িকা গুলজার বলেন—‘After reading this book one feels enriched and englightened by a master scholer’s word on Ghalib.’

গালিব এমনই একজন উঁচু মাপের ব্যক্তি ছিলেন, যার কবিতা ও গদ্য ছিলো স্থান, কাল এবং জবানের কয়েদমুক্ত, স্বাধীন! তার সমস্ত সৃষ্টিজুড়ে যে সৌন্দর্য ও চিত্তাকর্ষতার সুরুজ লুক্কায়িত রয়েছে, সাহিত্যের পৃথিবীতে তার জাগতিক পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া অব্দি কোনো আস্তাচল নেই!
পরিশেষে গালিবের শব্দেই তার আলোচনার ইতি টানতে চাচ্ছি—

‘গালিব মরে গেছে অনেকদিন হলো, অতঃপর মনে পড়ে
তার প্রত্যেক কথায় বলা কথাটি, এমন হলে কেমন হতো!’

Facebook Comments