মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা

হুসাইন আহমাদ মাদানী: ফিরে দেখা জীবন
হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. (৬ অক্টোবর ১৮৭৯ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭) ছিলেন একাধারে হানাফী মাজহাবের ফকিহ, হাদিসশাস্ত্রবিদ, আধ্যাত্মিক সূফি, স্বক্রীয় রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি চিন্তক। দারুল উলুম দেওবন্দের মুহাদ্দিস হিসেবেও তিনি কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদানের কারণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মভূষণ পদক লাভ করেন।[১]

১৯২০-এর দশকে কংগ্রেস-খেলাফত ইস্যুতে মাদানী রহ. মৌলিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ ই. পর্যন্ত বিভিন্ন বক্তৃতা ও লেখালেখির মাধ্যমে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সাথে একীভূত হয়ে সহযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন জমিয়তে উলামাকে।[২] ১৯৩৮ সালে তার বিখ্যাত রাজনৈতিক গ্রন্থ ‘মুত্তাহিদায়ে কওমিয়াত আওর ইসলাম’ প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তিনি ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেন।[৩]

তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের বঙ্গমৌ নামক একটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এই গ্রামেই একটা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। তার নাম সৈয়দ হাবিবুল্লাহ। তারা পারিবারিকভাবে মূলত ফয়েজাবাদ জেলার টান্দার বাসিন্দা।[৪] তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন বাবার কাছেই। কায়েদায়ে বোগদাদী আর কোরআনের প্রথম পাঁচ পারা মায়ের কাছে নাজেরা পড়েন। এরপর বাবার কাছেই খতম দেন পুরো কোরআন। ফারসি ভাষায় লেখা আরবি ব্যকরণ গ্রন্থ আমাদনামা, দস্তুরুস সিবইয়ান, শেখ সাদির গুলিস্তাঁর একাংশ বাড়িতেই তিনি আয়ত্ব করেন। স্কুলে ভর্তি হয়ে গণিত, জ্যামিতি, ইউক্লিডের মাকালায়ে উলা, জিওগ্রাফী, ইতিহাস পড়েন। এগুলোর প্রাথমিক জ্ঞান তিনি অর্জন করেন আট বছর বয়সেই। ১৩ বছর বয়সে তাকে দেওবন্দে পাঠিয়ে দেন তার বাবা। আগ থেকেই তার বড় দুজন ভাই সেখানে অবস্থান করছিলেন। হুসাইন আহমাদ তার বড় ভাইদের ছায়ায় দেওবন্দে পড়ালেখা শুরু করলেন। সেখান থেকে মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দির কামরা নিকটেই ছিল।
বাড়িতে হুসাইন আহমাদ মাদানী খেলাধুলার কিছুটা স্বাধীনতা পেতেন। কিন্তু দেওবন্দে যাওয়ার পর তার সেই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেন তার দুই ভাই। হুসাইন আহমাদ মাদানীর ভাষ্যমতে, তাদের এই শাসন ও তদারকি তাকে খেলাধুলার বদলে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলে।[৫] সেখানে তিনি বড় বড় যোগ্যতাসম্পন্ন উস্তাদদের সোহবতে ধন্য হন। তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেন জ্ঞানের সুধা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি। তার কাছেই বেশি পড়েছেন। তার কাছে অধ্যয়ন করেছেন দুস্তুরুল মুবতাদি, যারাদি, যানজাহানী, মিরাহুল আরওয়াহ, কালে আকওয়াল, মিরওয়াত, তাহযিবে কুতবি তাসদিকাত, কুতবি তাসাউরাত, মির কুতবি, মুফিদুত তালিবিন, নাফহাতুল ইয়ামান, মুতাওয়াল, হিদায়া (শেষ দুই খণ্ড), তিরমিযি শরিফ, বুখারী, আবু দাউদ, তাফসিরে বাইযাবি, নুখবাতুল ফিকার, শরহে আকায়েদে নাসাফী, হাশিয়ায়ে খায়ালি, মুআত্তা ইমাম মালেক, মুআত্তা ইমাম মুহাম্মদ। তার অন্যান্য উস্তাদ ছিলেন, মাওলানা যুলফিকার আলি, মাওলানা আবদুল আলি, মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরী, মুফতি আজিজুর রহমান, মাওলানা গুলাম রাসূল প্রমুখ।
পড়াশোনা শেষ করেই তিনি মদিনায় গিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৩১৮ হি. পর্যন্ত তার শিক্ষকতার গণ্ডি সীমাবদ্ধ ও প্রাথমিক পর্যায়েই ছিল। এ বছর তিনি হিন্দুস্তানে চলে আসেন। দুবছর পর আবার ফিরে যান মদিনায়। তখন ধীরে ধীরে তার শিক্ষকতার গণ্ডি বিস্তৃত হতে থাকে। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এশিয়া, আফ্রিকা, চীন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে তার কাছে ছুটে আসতে থাকে ইলম পিপাসু শিক্ষার্থীগণ। সেখানে তিনি অনেক মেধাবী ছাত্রের দেখা পেয়েছিলেন। তার সেখানকার ছাত্রদের মধ্যে যারা প্রসিদ্ধি লাভ করে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবদুল হাফিজ কুরদি (মদিনার হাইকমান্ডের সদস্য), আহমাদ বেসাতী (মদিনার ডেপুটি কাজি), মাহমুদ আবদুল জাওয়াদ (মদিনা পৌরসভার চেয়ারম্যান), আলজেরিয়ার বিখ্যাত সংস্কারক আলেম বশির আল-ইবরাহিমি (তিনি অনেক গ্রন্থের লেখক। তার একটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কাফাহুশ শা’বিল জাযায়েরী দিদ্দাল ইহতিলালিল ফ্রান্সিয়্যি [ফরাসি উপনিবেসের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ান জনগণের স্বাধীনতা-আন্দোলন])।[৬]

ব্রিটিশ বিতাড়নে ভূমিকা
ইংরেজরা যখন থেকেই এই উপমহাদেশে জেঁকে বসতে থাকে তখন থেকেই হিন্দু্স্তানের সচেতন আলেম ও মুসলিম শাসকগণ তাদেরকে এই দেশের মাটি থেকে বিতাড়নের প্রয়াস চালিয়ে আসছিলেন। টিপু সুলতান, হায়দার আলি থেকে নিয়ে ওলিউল্লাহ দেহলবীর তাত্ত্বিক আন্দোলন, তার থেকে নিয়ে ইসমাইল শহিদ, সৈয়দ আহমাদ বেরেলভি, ফজলে হক খাইরাবাদী, মাওলানা আবদুর রহিম সাদেকপুরী, মাওলানা জাফর থানেশ্বরী, মাওলানা কাসেম নানুতুবী—সবাই ইংরেজদের ধর্মহীন শাসন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করতে প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন।
মুসলমান হিন্দু সম্মিলিতভাবে এই প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৪ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বিশিষ্ট কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ অংশগ্রহণ করেছিলেন। কংগ্রেস গঠিত রূপ পায় ১৮৮৫ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মুসলমানগণও ছিলেন; বদরুদ্দিন তৈয়ব জী ও রহমতুল্লাহ সিয়ানী। কংগ্রেসের চতুর্থ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালে একটা মাদ্রাসায়; যার সভাপতিত্ব করেন বদরুদ্দিন তৈয়ব।
১৯১৯ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী, মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারী, মানাযেরে ইসলাম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী, মুফতি কেয়ায়েতুল্লাহ দেহলবী, মাওলানা মুহাম্মদ আলি, শওকত আলি, আবুল মাহাসিন সাজ্জাদ, আহমাদ আলি লাহোরী, আবুল কালাম আজাদ, হিফজুর রহমান সিহরাভী, আহমাদ সাইদ দেহলবী, সৈয়দ মুহাম্মদ মিয়াঁ দেওবন্দি রহিমাহুমুল্লাহ।[৭] ১৯২০ সালের অক্টোবর ১৯, ২০, ২১ তারিখে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে আবুল কালাম আজাদও ছিলেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি। এখানে তিনি একটা ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেছিলেন; যাতে ভারতে ভবিষ্যতের ইসলামপন্থীদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নির্দেশনা তুলে ধরছি,

১. জাতি ও খিলাফাত রক্ষা সুস্পষ্ট একটা ইসলামী দাবি। যদি জাতীয় ভাইয়েরা এক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও সাহায্যে এগিয়ে আসে, তো এটা বৈধ ও প্রশংসনীয় কাজ।
২. ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ইংরেজ, যাদের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করা ফরজ।
৩. দেশ রক্ষার খাতিরে জাতীয় ভাইদের সাথে মিলেমিশে কাজ করা বৈধ। তবে দেখতে হবে, কারো ধর্মীয় অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়।
৪. আধুনিক যুগে তো বহির্শত্রুর মোকাবিলার জন্য আইনত রাইফেল, কামান ও যুদ্ধ বিমানের ব্যবহার বৈধ; যদিও ইসলামের প্রথম যুগে এসবের অস্তিত্ব ছিল না। বহির্শত্রুকে প্রতিরোধের জন্য যদি এসবের বৈধতা থাকে, তাহলে আমাদের অধিকার ও সাধারণ দাবিগুলো নিয়ে বিক্ষোভ, জাতীয় জোট কেন ন্যায়সঙ্গত হবে না।
৫. মুসলমানদেরকে শরীয়ার আহকাম পালনের ক্ষেত্রে আগ্রহী করা।
৬. ইংরেজ সরকারী যত পদ, সদস্যতা, অধ্যাপনা, কাউন্সিল, চাকুরি.. সব ছেড়ে দিতে হবে সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্যে।
৭. ব্রিটিশদেরকে বাণিজ্যিকভাবে বয়কট করা উচিত।
৮. ইংরেজ আদালতে কোনো মামলা দায়ের করা যাবে না।
৯. খেলাফত আন্দোলনে যুবকদেরকে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করা ও তাদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা।
১০. জাতীয় বাইতুল মাল (কোষাগার) ও প্রচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১১. শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আবশ্যকভাবে সরকারী অনুদান ও সহায়তা গ্রহণ বন্ধ করা।

এই অধিবেশনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া হারাম ঘোষণা করা হয়। ফতোয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে ৫০০ জন আলেমের সাক্ষর নেওয়া হয়। ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে এই ফতোয়া বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ফতোয়ার দরুণ হুসাইন আহমাদ মাদানী, মুহাম্মদ আলি জাওহার সহ অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়।[৮] এছাড়া হুসাইন আহমাদ মাদানী ১৯১৭ সালের রেশমি রুমাল আন্দোলনেরও অগ্রগামী পুরুষ ছিলেন। এজন্য তাকে মাল্টায় শাইখুল হিন্দের সাথে বন্দি জীবনযাপন করতে হয়। পরবর্তীতে ‘তারকে মুআলাত’ তথা অসহযোগ আন্দোলনে (Non-cooperation movement) তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।[৯] হুসাইন আহমাদ মাদানীর দৃষ্টিতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ নিঃসন্দেহে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। এমনকি হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীর শত্রু। ইংরেজ ভারতীয়দের অনিষ্টকারী এবং ভারতীয়দের সর্বাপেক্ষা বড় দুশমন। এহেন দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের কর্তব্য। তাই এক বক্তব্যে তিনি বলেন, মুসলমানরা প্রায় এক হাজার বছর যাবত ভারত শাসন করেছে। এ দেশ ছিল ‘দারুল ইসলাম’। এখানে ইসলামের পতাকা উড্ডীন ছিল। কুফর ও শিরকের ঝাণ্ডা ছিল অবনমিত। ইংরেজ নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এবং ভারতীয়দেরকে পারস্পরিক সংঘাত ও সংঘর্ষে লিপ্ত করে মুসলিম সম্রাট ও নবাবদের হত্যা করে। তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে সর্বশ্রান্ত করে দেয়। গোটা ভারতবর্ষকে দারুল কুফুরের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলামের পতাকা অবনমিত করে এখানে কুফুরের পতাকা উড্ডীন করে।[১০] ১৯৪০ সালে জুন মাসে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বারোতম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। হুসাইন আহমাদ মাদানী সভাপতিত্ব করেছিলেন তখন। সেখানে তিনি সভাপতির ভাষণে বলেন, ‘ইদানিং পাকিস্তান আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে মুখে মুখে। পাকিস্তানে যদি নবীর পদ্ধতিতে রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনা প্রবর্তিত করা হয়, যেখানে সকল ইসলামী হদ ও কিসাসের বিধান বাস্তবায়ন করা হবে, তাহলে তো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে মাশাল্লাহ অনেক ভালো হবে। কোনো মুসলমান এতে সন্দেহ করতে পারে না। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না, তেমনটা হবে। উদ্দেশ্য যদি হয়, ইংরেজ পদ্ধতিতে মুসলিম রাষ্ট্র নামে নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে আমার মতে সিদ্ধান্তটি বোকামি ও কাপুরুষোচিত।’
১৯৪২ সালের মার্চ মাসে হুসাইন আহমাদ মাদানীর সভাপতিত্বে লাহোরে একটা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে উপমহাদেশের সকল মুসলমানকে দল-মত নির্বিশেষে ইংরেজদের বিরোধিতায় একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান হুসাইন আহমাদ মাদানী। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে, আমাদের লক্ষ্য, ইংরেজদের কবল থেকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ। এটা তো হিন্দুস্তানের সকল মুসলমানই স্বীকার করে। শুধু তাই নয়, একে নিজেদের মুক্তির একমাত্র উপায় মনে করে। জমিয়ত এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাষ্ট্র স্বাধীন হলেই মুসলমানগণ স্বাধীন হতে পারবে। তাদের ধর্ম মুক্তি পাবে। স্বাধীন হবে মুসলমানদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কালচার। মুসলমান কখনোই এমন কোনো আইন মেনে নিতে পারে না, যেখানে তার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মুক্তি নেই। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ভারতের সকল প্রদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের কঠোর সমর্থক। তবে হ্যাঁ.. আমরা কেন্দ্রীয় শক্তির হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কথা বলি না। বরং প্রাদেশিক শাসকগণ আপন প্রদেশের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। আর সকল প্রদেশের সর্বসম্মতিক্রমে কেন্দ্রের হাতে যেই ক্ষমতা দেওয়া হবে, সেটাই কেবল পাবে কেন্দ্র। জমিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ভারতের সকল প্রদেশের রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি। তবে ঐক্য ও কেন্দ্রিকতা এমন হতে হবে, যেখানে ৯ কোটি মুসলমান আপন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যের ছায়ায় জীবনযাপন করতে পারে। যদি তারা কোনো জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠতার করুণায় থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে এক মুহূর্তও আগাবে না এ পথে। অর্থাৎ এমন নীতিমালার উপর কেন্দ্রিকতা গঠন করা উচিত, যেখানে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট থাকতে পারে।’
১৯৪৫ সালের মে মাসে জমিয়তের চৌদ্দতম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখানে হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. পূর্বের পরিকল্পনাগুলোই আরেকটু ব্যাখ্যা সহকারে পেশ করেন।[১১]

জাতীয়তাবাদ ও দ্বিজাতিতত্ত্ব
১৯৩৮ জানুয়ারী ৮ তারিখে দিল্লির সদর বাজারে একটি সভায় মাওলানা মাদানী রহ. একটা ভাষণ প্রদান করেন। ৯ জানুয়ারী ভাষণটির বিশেষাংশ প্রকাশিত হয় দৈনিক তেজ ও দৈনিক আনসারীতে। ওই মজলিসে দৈনিক আল-আমানের একজন রিপোর্টারও উপস্থিত ছিলেন; আর আল-আমানের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মাজহারুদ্দিন শেরকোঠি দেওবন্দি, যিনি একজন পাক্কা মুসলিমলীগপন্থী। সেই রিপোর্টার আবার নিজের মতো করে এই ভাষণ নিয়ে একটা রিপোর্ট করেন। পরে আল-আমান থেকে কপি করে লাহোরের ‘যামিনদার’ ও ‘ইনকেলাব’ পত্রিকা। সেই রিপোর্টে বলা হয়, মাওলানা বলেছেন, বর্তমান যুগে জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়; ধর্মের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং মুসলমানদের উচিত আপন জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করা।
অন্যদিকে ছিলেন আল্লামা ইকবাল, যিনি আপন যুগের অনবদ্য ইসলামী কবি ও চিন্তাবিদ। একটা সময় পর্যন্ত তিনিও জাতীয়তাবাদের ঘোর সমর্থক ছিলেন। এ সম্পর্কে তার অনেক লেখাজোকা আছে। বিখ্যাত কবিতা ‘হিমালয়’ ও ‘তারানায়ে হিন্দি’ এর অনন্য উদাহরণ। কিন্তু যখন তিনি ইউরোপে গিয়ে সেখানকার সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দর্শন, জীবনধারা অবলোকন করলেন, তখন ইসলামের প্রতি গভীরভাগে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেল।
ফিরে আসার পর তিনি জাতীয় নেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় স্বরচিত লেখা প্রকাশ করে আপন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে থাকেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলমানদেরকে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন। আর মুসলিম লীগের দৃষ্টিভঙ্গি তখন এটাই ছিল। ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের বার্ষিক সভায় প্রথমেই বক্তৃতা প্রদান করেন তিনি। সেই বক্তৃতায় তিনি উত্তর পশ্চিম ভারতের বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব দেন। উপমহাদেশের সামাজিক জীবনের সংকট ও হিন্দু মুসলিম বৈরাগ্যের সমাধান তুলে ধরেন। পরবর্তী জীবনে তিনি তার চিন্তা বাস্তবায়নে চেষ্টা করে যান।
আল্লামা ইকবাল যখন আপন চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে প্রচার করে যাচ্ছেন, তখনই দৈনিক আল-আমানের মাধ্যমে হুসাইন আহমাদ মাদানীর বক্তব্য পৌঁছে তার কাছে। মাদানীর কথা শুনে ইকবাল তীব্র আক্রমণ করেন তাকে। ফারসিতে কবিতা লিখেন,

‘তা না হলে দেওবন্দের হুসাইন আহমদের মুখে এমন বিস্ময়কর কথা কেন প্রকাশ পাবে?
মাওলানা মিম্বরে উঠে বলে ফেলল যে দেশের ভিত্তিতে জাতীয়তা (কওমিয়াত) হয়
হায় সে (মাদানী) রাসূল সা. এর মর্যাদা সম্বন্ধে কোনো ধারণাই রাখে না
তুমি নিজেকে রাসূলের সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করো কেননা তিনিই এনেছেন পূর্ণ ধর্ম
যদি তুমি জাতীয়তার প্রশ্নে রাসূলের মতে মত না দাও
তাহলে তোমার সব কর্ম আবু লাহাবের মত কুফরী-শিরকী হয়ে যাবে’

আল্লামা ইকবালের এই কবিতাটি দৈনিক এহসান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পুরো উপমাহদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দুদলের অশান্তি, অস্থিতি ও হুলুস্থুল অবস্থা। আল্লামা ইকবাল, বিশেষত মুসলিম লীগের সমর্থকরা হুসাইন আহমাদ মাদানীর বিরুদ্ধে জবান ও কলম-জেহাদে যোগ দিয়ে বিষাক্ত তির ছুড়তে লাগল। মাওলানার সমর্থকগণও দীর্ঘ দীর্ঘ রচনা বা বিবৃতি দিতে থাকে। কোনো পক্ষেরই থামার নাম-গন্ধ নেই। আজমগড়ের এক কবি সুহাইল আল্লামা ইকবালের কবিতার অন্ত্যমিল, ধ্বনিসুষমা ও অনুপ্রাস অবলম্বন করে তার খণ্ডনে আরেকটি জবাবী কবিতা লিখে।
এই ভুল বোঝাবুঝির দরুণ, একজন সহানুভূতিশীল ও বিবেকবান সাহিত্যিক আলেম মাওলানা আবদুর রশিদ নাসিম (ছদ্মনাম তালুত) মাদানীর খেদমতে একটা চিঠি লিখেন; তার বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে।[১২] এর জবাবে প্রাথমিকভাবে হুসাইন আহমাদ মাদানী সাত পৃষ্ঠার একটা চিঠি লিখে পাঠান তালুত সাহেবের কাছে ৭ ই জিলহজ ১৩৫৬ হি. সালে। সেখানে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বোঝাবুঝির গলদ দিকটা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি সেখানে ‘কওম’ ও ‘মিল্লাত’ ধারণার মাঝে পার্থক্যের রেখা টেনে দেন।[১৩] সেই সাত পৃষ্ঠার চিঠিটার মৌলিক কিছু অংশ তালুত সাহেব ইকবালের কাছে পেশ করেন। সেটা পড়ে ইকবাল তার অভিযোগ ফিরিয়ে নেন। বলেন, ‘আমি এই কথার ঘোষণা দেওয়াটা জরুরী মনে করছি, মাওলানার এই ব্যাখ্যার পর তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। মাওলানার ধর্মীয় চিন্তাকে মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে আমি তার কোন ভক্তের চেয়ে পিছিয়ে নেই।’[১৪] আল্লামা ইকবালের এই স্বীকারোক্তিটা ছাপা হয় দৈনিক ইহসান, দৈনিক মদিনাসহ কয়েকটা পত্রিকায়। কিন্তু সমস্যা হলো, ইকবালের লেখা ‘আরমোগানে হিজায’ বইটা প্রকাশের সময় হুসাইন আহমাদ মাদানী সম্পর্কে লেখা কবিতাগুলোও অন্তর্ভূক্ত করা হয়; ফলে এর ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই অন্তর্ভূক্তির সময় অবশ্য ইকবাল জীবিত ছিলেন না। প্রখ্যাত ইকবাল-গবেষক প্রফেসর ইউসুফ সালিম চিশতি এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘অভিযোগ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন ইকবাল। কিন্তু এর মাত্র তিন সপ্তাহ পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে বোধ হয়, সেগুলো অন্তর্ভূক্ত করতে নিষেধ করতেন। তবে যারা সংকলন করেছেন, তারা যদি কবিতার পাশাপাশি তার স্বীকারোক্তিটাও অন্তত যুক্ত করে দিত, তবুও চলত। কিন্তু এই স্বীকারোক্তিটা না থাকার দরুণ মাওলানা সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের মন্দ ধারণা তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।’[১৫] এজন্যই মাওলানা মাদানী তার রাজনৈতিক ভাবনা ও যুক্তিগুলো চিঠিপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে কিতাবের পাতায় নিয়ে আসতে চাইলেন। এ উদ্দেশ্যেই তিনি রচনা করেন ‘মুত্তাহেদায়ে কওমিয়াত আওর ইসলাম’; এখানে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে ইত্তেহাদে কওমিয়াত বা জাতীগত ঐক্যের ধারণা পেশ করেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি বিরোধিতা করেন ভারত বিভক্তির।
বইয়ের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ‘দিল্লির সেই মজলিসে আমি ‘কওমিয়্যাতে মুত্তাহেদা’ বা জাতীগত ঐক্যের যে পরামর্শ দিয়েছিলাম, সেটাকে জনাব ডক্টর সাহেব ধর্মের বিপরীত মনে করে বসেছেন। তার ধারণাটা আসলে সঠিক ছিল না। সেটাই এই গ্রন্থে স্পষ্ট করব। সাথে সাথে কিছু প্রাসঙ্গিক জরুরী বিষয় তুলে ধরব।’[১৬] ‘নবী রাসূলদেরকে আল্লাহ কোনো নতুন ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেননি। বরং সংবিধান ও জীবনব্যবস্থা সংস্কারের জন্য প্রেরণ করেছেন। আর ভাষা ছিল তার জাতি (কওম)-এরই ভাষা। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি’- (সুরা ইব্রাহিম-৪)।’[১৭] ‘কোরান ও হাদিসের পরিভাষাগুলো প্রাথমিকভাবে আমাদেরকে দেখতে হবে আরবের বিখ্যাত শব্দকোষ ও অভিধানগুলোতে। আধুনিক যুগে ‘কওম’-এর যে অর্থ বের করা হয়েছে, তা ধরে নিয়ে ইসলামকে বোঝার চেষ্টা করলে কঠিন ভুল হবে। শরীয়ার কোনো শব্দে শর্ত বা তেমন কিছু বৃদ্ধি করাও এর অন্তর্ভূক্ত। এজন্য প্রথমে কওম ও মিল্লাতের অর্থ আমাদের বুঝতে হবে আরবি অভিধান থেকে। যাতে কোরআন হাদিসে উদ্ধৃত শব্দ বুঝতে সুবিধা হয়।
মুখতারুস সিহাহ গ্রন্থে আছে, ‘কওম বলতে স্বাভাবিকভাবে পুরুষদের বোঝানো হয়। সাধারণত নারীদের বোঝানো হয় না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, কোনো কওম যেন অন্য কওমকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা না করে, কোনো নারী যেন অন্য নারীদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা না করে। তবে হ্যা, নারীদেরকে কওমের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করা হবে পুরুষের অনুগামী হিসেবে। কারণ প্রত্যেক নবীর কওমের মাঝে পুরুষ ও নারী উভয়ই আছে।’
যুবাইদির তাজুল আরুস গ্রন্থে মিল্লাতের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘মিল্লাত মানে শরীয়ত বা দীন। যেমন বলা হয়, মিল্লাতে ইসলাম, মিল্লাতে নাসরানিয়্যাত, ইয়াহুদিয়্যাহ ইত্যাদি।’[১৮] ‘আভিধানিক দিক থেকে বোঝা যাচ্ছে, কওম ও মিল্লাতের মাঝে বেশ ফারাক রয়েছে। কওম বললে সাধারণত ভাষাগত সম্প্রদায় বা এরকম সীমাবদ্ধ অর্থ বোঝানো হয়। আর মিল্লাতের মাধ্যমে প্রত্যেক ধর্মকে আলাদাভাবে বোঝানো হয়।’[১৯] ‘কোরান শরিফে যদি আমরা কওম ও মিল্লাতের ব্যবহার লক্ষ্য করি, তাহলে দেখি, কওম শব্দটি প্রায় দু’শর অধিক স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করতে গেলে একটা বিশাল বড় গ্রন্থ হয়ে যাবে।’[২০] তিনি বেশ কিছু আয়াত উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ছিল সুরা হুদের ৭৮ নং আয়াত, ‘আর তার কওম তার কাছে ছুটে আসল এবং ইতঃপূর্বে তারা মন্দ কাজ করত। সে বলল, ‘হে আমার কওম, এরা আমার মেয়ে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের ব্যাপারে তোমরা আমাকে অপমানিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন সুবোধ ব্যক্তি নেই’?
সুরা নূহের প্রথম আয়াতে আছে, ‘নিশ্চয় আমি নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার কওমের কাছে (এ কথা বলে), ‘তোমার কওমকে সতর্ক কর, তাদের নিকট যন্ত্রণাদায়ক আযাব আসার পূর্বে’।
কওম সংক্রান্ত বেশ কিছু আয়াত উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘মোটকথা, এরকম আরো অনেক আয়াত আছে কওম সংক্রান্ত, যেখানে অমুসলিম ও নবীদেরকে একসাথে কওমের আওতায় আনা হয়েছে। কাফেরদেরকে নবীদের কওমের দিকে সম্বন্ধিত করা হয়েছে বংশ বা দেশের ইত্তেহাদ ও ঐক্যের কারণে। তেমনিভাবে কোন কোন আয়াতে মুসলমান ও কাফেরদেরকে বংশ বা দেশ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায় এক কওম হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।[২১] যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘আর ফিরআউন বংশের এক মুমিন ব্যক্তি যে তার ঈমান গোপন রাখছিল সে বলল, ‘তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ’ অথচ সে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে? সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার উপরই বর্তাবে তার মিথ্যা; আর সে যদি সত্যবাদী হয় তবে যে বিষয়ে সে তোমাদেরকে ওয়াদা দিচ্ছে তার কিছু তোমাদের উপর আপতিত হবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না, যে সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদী। হে আমার কওম, আজ তোমাদের রাজত্ব; যমীনে তোমরাই কর্তৃত্বশীল; কিন্তু আল্লাহর আযাব আসলে কে আমাদের সাহায্য করবে’? ফিরআউন বলল, ‘যা আমি সঠিক মনে করি তা-ই আমি তোমাদেরকে দেখাই আর আমি তোমাদেরকে কেবল সঠিক পথই দেখাই। আর যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিল সে আরো বলল, ‘হে আমার কওম, নিশ্চয় আমি তোমাদের ব্যাপারে পূর্ববর্তী দলসমূহের দিনের অনুরূপ আশঙ্কা করি।’—(সুরা গাফির: ২৮-৩০)[২২] অন্যান্য নবীদের মতো আমাদের নবীও কাফেরদেরকে কওম বলে সম্বোধন করেছেন। সুরা আনআমের ১৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলো, ‘হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের অবস্থানে থেকে কাজ কর, নিশ্চয় আমিও কাজ করছি। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার জন্য হবে আখিরাতের পরিণতি। নিশ্চয় যালিমরা সফল হয় না’।
এসব আয়াত উল্লেখ করার পর মাদানী সাহেব লিখেছেন, ‘মোটকথা এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক) কোরানের ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গি হল, কওম শব্দটি অর্থগত দিক থেকে মুসলমানদের সাথে শুধু মাত্র বিশেষায়িত নয়। বরং বরং কওম বলতে এমন সমষ্টিগত দলকে বোঝায়, যেখানে কোন বংশ, রাষ্ট্র, ভাষা বা পেশার সম্পর্ক থাকে। খ) কওমিয়াত বা জাতীয়তার ক্ষেত্রে মুসলিম ও কাফের, উভয়ই থাকতে পারে; যেমনটা কোরানের ব্যবহার থেকে বোঝা যায়। গ) নবী রাসূলও জাতীয়তার ঐক্যে কাফের, মুশরিক ও ফাসেককে পার্থিব দিক থেকে একত্র করতেন।’[২৩] হুসাইন আহমাদ মাদানী পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদ চাননি। বরং পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদকে তিনি খণ্ডন করতে চেয়েছেন। আর তার মতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবে পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদের উপর। ভারতের সকল মুসলিম কখনোই পাকিস্তানে চলে যেতে পারবে না। যারা থাকবে তারা নির্যাতনের শিকার হবে। আর পাকিস্তানেও ইসলামী খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়ত কায়েম হবে না। বরং সেখানে মুসলমানদের আরেকটি বিভক্তি ঘটবে। আরেকটি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এজন্যই তিনি সচেতনতার সাথে বলেছেন,
‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছেন। যা মুসলমানদের মাঝে স্পিট, শক্তি, ঐক্য, সহযোগিতা ও সাহায্যের অনুভূতি তৈরি করেছে। মুসলমানদের এই সফলতা দেখে পাশ্চাত্য আশংকিত হয়ে উঠলো। তারা চাইছিল, যেভাবেই হোক প্যান ইসলামিজমের স্পিট ও শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে হবে। মুসলমানরা যেন বিভক্ত হয়ে পড়ে।’[২৪] ইসলামের নামে ইউরোপীয় কাঠামোয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যে সেরেফ ইংরেজদের আরেকটা ‘ডিভাইন এন্ড রুল পলিসি’ সেটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন,
‘মুসলমানরা বর্তমানে আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য উপমহাদেশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আওয়াজ তোলা হচ্ছে, ইসলাম কেবল ধর্মীয় ঐক্যের শিক্ষা দেয়। ইসলাম কখনো অমুসলিম জামাতের সাথে একসাথে থাকতে পারে না। কোন অমুসলিম জামাতের সাথে জাতীয় ঐক্য গড়তে পারে না। বলা হচ্ছে, মুসলমান যদি দেশ, বংশ বা পেশার ঐক্য তৈরি করে, তাহলে সে ইসলামের দুশমন, ইসলামী শিক্ষার দুশমন। অথচ তারা জানেও না, এটা ইউরোপের ব্যবসা-দর্শনের একটা সুযোগ। এই জযবা দুর্বল থেকে দুর্বলতর। যখন ইসলামী খেলাফত ছিল, তখনও তো সকল ধর্মের ইত্তেহাদে মানুষ খেলাফতের ছায়ায় বসবাস করতো। তখন তো এটা নিন্দিত ছিল না। কিন্তু আজ ইসলামী খেলাফতের ধ্বংসের পর এই জাতীয়তা কিভাবে মন্দ বিষয় হয়ে গেল.. আজিব!’[২৫] হুসাইন আহমাদ মাদানী সাহেব অবিভক্ত ভারত থাকার পক্ষে মিছাকে মদিনা বা মদিনা সনদের ভিত্তিতে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর নবী সা. মদিনার ইহুদি ও মুসলিমদেরকে ইত্তেহাদে কওমের বন্ধনে বেঁধে দিয়েছিলেন।’ তাছাড়া ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মদিনা সনদের বাস্তবায়ন কিভাবে হবে, সেটা তুলে ধরতে গিয়ে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধিবেশনে মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা তুলে ধরেছেন।’[২৬] এছাড়াও এ বইয়ে তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন, ইউরোপীয় ন্যাশনালিজমের ভয়ের কারণ, এটার সাথে ইসলামী কওমিয়াত ধারণার ফারাক, সংখ্যালঘুদের অধিকার ইত্যাদি। এসব আলোচনা তার ইসলামী রাজনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও পরিবর্তিত পরিস্থিতে ইজতিহাদ-যোগ্যতা প্রমাণ করে। এই বইটি ঘিরে অনেক তর্ক বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। পক্ষে বিপক্ষে মত উঠেছে। ভারতের অনেক মার্কসবাদী চিন্তক মনে করেন, মাওলানা মাদানী যেটা বলেছেন, সেটা অবাস্তব ছিল। বিভক্তি ছিল একটা অনিবার্য প্রয়োজন। মুসলমান ও হিন্দুর মাঝে যে বিরাগ চলছিল, সেখানে পাকিস্তানের স্বপ্ন মুসলমানদের আবেগের তন্ত্রিতে নাড়া দিয়ে উঠে। ভেসে যায় মাদানীর ঐক্যের সকল যুক্তি। অন্যদিকে অনেকে আবার মনে করেন, কাশ্মির সমস্যা ও ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু সমস্যা বর্তমানে যে চলছে, এর একমাত্র কারণ, মাওলানা মাদানী যে বাস্তবতার দিকে আহ্বান করেছেন, সেদিকে না গিয়ে মুসলমানগণ আবেগের পাল্লা ভারি করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের নামে তারা স্বার্থবাদি রাজনীতির ভিক্টিম হয়ে উঠেছে। তারই জের ধরে ভাগ হয়ে গিয়েছে পাকিস্তান দুই ভাগে। ধর্মীয় ঐক্যের কোন নাম গন্ধও আর বাকি থাকেনি।
কোন পক্ষ সঠিক, বাস্তবতার নিরিখে, সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না হলফ করে। ভবিষ্যত যত সামনে পা বাড়াবে, ততই এটা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। আর ভাবার ক্ষেত্রে ক্লাসিক্যাল উপাদান হিসেবে চিন্তকদের সামনে থাকবে মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীর ‘মুত্তাহেদায়ে কওমিয়্যাত আওর ইসলাম’।
আল্লাহ মাওলানাকে কবরে শান্তিতে রাখুন.. ঠাঁই দিন জান্নাতের বাগিচায়…

তথ্যসূত্র
১ https://nation.com.pk/27-Jun-2015/the-rise-and-fall-of-the-deoband-movement
২ সোনিয়া সিককা, বিন্দু পুরী ও লোরি জি. বেয়াম্যান, লিভিং উইথ রিলিজিয়াস ডিভারসিটি, প্রকাশ: ২০১৫
৩ ডগলাস পিয়ার্স, নন্দিনি গুপ্ত, ইন্ডিয়া এন্ড দ্য ব্রিটিশ এমপায়ার, প্রকাশ: ২০১৭
৪ বারবারা ডি. মেটকাল্ফ, হুসাইন আহমাদ মাদানী: দ্যা জিহাদ ফর ইসলাম এন্ড ইন্ডিয়াস ফ্রীডম, প্রকাশ: ২০১২
৫ হুসাইন আহমাদ মাদানী, নকশে হায়াত থেকে সংক্ষেপিত, পৃ. ৫৪–৫৫
৬ ওলানা আবদুল কাইয়ুম হাক্কানী, শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী
৭ http://tahqeeqatexpress.com/2019/04/05/جنگ-آزادی-میں-مسلمانوں-کا-کردار/
৮ মাওলানা যাহেদ রাশেদী, তাহরিকে আযাদি আওর উলামায়ে হক,
http://zahidrashdi.org/1890
৯ ড. আবু সুলাইমান শাহজাহানপুরি, শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী: এক সিয়াসি মুতালা, পৃ. ২৯
১০ ড. মুশতাক আহমাদ, শাইখুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী, পৃ. ৩০৭
১১ মাওলানা যাহেদ রাশেদী, প্রাগুক্ত
১২ মওলবি নায়াব হাসান কাসেমী, হজরত শাইখুল ইসলাম কী তাসানিফ: তাজযিয়াহ ওয়া তাআরুফ
http://www.darululoom-deoband.com/urdu/magazine/new/tmp/06-Hadhrat Shaikhul
১৩ হুসাইন আহমাদ মাদানী, মুত্তাহিদায়ে কওমিয়াত আওর ইসলাম, পৃ. ৬
১৪ প্রফেসর ইউসুফ সালিম চিশতি, ইকবাল আওর মাওলানা সাইয়িদ হুসাইন আহমাদ মাদানী, পৃ. ৩৮৩
১৫ প্রফেসর ইউসুফ সালিম চিশতি, প্রাগুক্ত
১৬ মুত্তাহেদায়ে ইসলাম আওর কওমিয়াত, পৃ. ৩১
১৭ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১
১৮ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২–৩৩
১৯ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬
২০ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭
২১ প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১
২২ প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১
২৩ প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩
২৪ প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪
২৫ প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬–৫৭
২৬ বিস্তারিত দেখুন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১–৬৭

Facebook Comments