বিষাদ

সফিপুর থেকে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। একা বাসায় ফিরতে ভয় ভয় লাগছে। একটা ভ্যান দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি তো আর ভ্যানে চড়ব না। কী আর করার! হেঁটেই বাসায় ফিরছি। মেইন রোড থেকে আমাদের এলাকার ভেতরে বেশ জমজমাট পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি। যেন সন্ধ্যা সাতটা বাজে! দোকানে বসে লোকজন আড্ডা দিচ্ছে।

বাসায় ফিরে দেখি মামনি-বাবা সবাই ঘুমোচ্ছে। তুলি পেট ব্যথায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। জলদি হাত-মুখ ধুয়ে তুলির মাথার কাছে এসে বসলাম। কপালে হাত রেখে মনে হলো হালকা জ্বরও এসেছে।

আমার এবার রাগ হচ্ছে। কোথায় ভেবেছিলাম বাসায় ফিরে তুলিকে সফিপুর আনসার একাডেমির গল্প বলব। না, সেটা আর হবে না এখন।

তুলিকে বললাম, পেট ব্যথা কি সকাল থেকেই ছিল?

হ্যাঁ, আপু।

আমি যখন ফোন করলাম তখন বলিসনি কেন?
তখন বললে তুমি চিন্তা করতে না বলো?

তাতে কি হতো তুলি? কেন এমন ছেলেমানুষী করিস? আমি তো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ রেখে গিয়েছিলাম। ওষুধ খাওয়ার পরও কি ব্যথা কমেনি?

না, আপু। সকালে তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পর মামনি বলল- রান্না করে, বাসন মেজে, কাপড় ধুয়ে শুকাতে দিয়ে স্কুলে যেতে। তুমি যে বিস্কুটের প্যাকেটটা দিয়ে গেলে ওটা খেতে গিয়ে দেখি লাকী খেয়ে নিয়েছে। মামনির দেওয়া সব কাজ সেরে খাওয়ার আর সময় ছিল না। জলদি টিফিন নিয়ে স্কুলে গেলাম। টিফিন পিরিয়ডের আগে হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হলো। হেডস্যারের অনুমতি নিয়ে বান্ধবীরা বাসায় পৌঁছে দিল। মামনির কাছে ট্যাবলেট চাইলে মামনি বলল- ট্যাবলেট নেই। লাকীর চটপটি খেয়ে পেটে ব্যথা হচ্ছিল, লাকী খেয়েছে। বিশ্বাস করো আপু, ট্যাবলেট নেই শুনে ব্যথা আরও চেপে ধরল। মনে হচ্ছিল আমার গর্ভে আট মাসের শিশু, হঠাৎ পেইন উঠেছে। পরে মামনি বলল, তার কাছে টাকা নেই, বাবা অফিস থেকে ফিরলে ওষুধের ব্যবস্থা করবে।

বিছানা থেকে উঠতে পারছিলাম না বলে মামনিকে বললাম, কটা ভাত মেখে দিতে। খেয়ে শুয়ে থাকব। লাকী ভাত মেখে আনল। ভাত খেতে গিয়ে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথাটা যেন আরও চেপে ধরল আামকে। বমি হলে ভালো লাগত, কিন্তু পেট খালি বলে বমি হলো না কিছুতেই। কোনোরকমে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকলাম, ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

আমার কাছে ওষুধ আছে তুলি। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।
না আপু। তোমাকে দেখে ব্যথা কেমন পালিয়ে যাচ্ছে। সফিপুর আনসার একাডেমিতে পিকনিক কেমন হলো তোমাদের?

সকালে বলব। তোর শরীর দুর্বল। এখন ঘুমিয়ে পড়।

না আপু প্লিজ… সকালে তো গল্পটা বাসি হয়ে যাবে। এখন অর্ধেক বলো। বাকিটা সকালে শুনব।
আচ্ছা, শোন- আমাদের পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল। বাস থেকে নেমেই সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আামর তো আর স্মার্টফোন, ক্যামেরা কোনোটাই নেই তাই ওখানে জঙ্গলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। অসাধারণ মনোরম একটা জায়গা। জঙ্গল বললেও ভুল হবে। অনেক গাছপালায় ঘেরা। শুকনো পাতায় রাস্তাটা পুরু হয়ে গিয়েছে। হাঁটলে কেমন মড়মড় শব্দ হয়। একা হাঁটছিলাম বলে বান্ধবীরা পিছু ডাকল। ওদের সাথে কয়েকটা ছবি তুললাম। আনসার একাডেমির পেছনের দিকে গেলাম। সেখানে বসার জায়গা, দোলনা আর বিশ্রামের একটা ঘর আছে। এর থেকে আরেকটু পেছনে গেলেই দিগন্তজোড়া গ্রামীণ এলাকা। এবার ঘুমিয়ে পড়। সকালে স্কুলে যেতে হবে।

ঘুমাব তো। আরেকটা কথা বলো। ওখানে শুনেছি একটা কুটিরশিল্প আছে!

হুম আছে। কুটিরশিল্পের আগে ছোট একটা লেক আছে। লেকের চারদিকে কী সুন্দর গাছ! লেকের ধারে সবাই কতরকম ছবি তুলল! আমাদের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের হেড ম্যাডাম আমার সাথে একটা ছবি তুললেন এ্যাঙ্গেলে।

কুটিরশিল্পে তাঁতে কাপড় বোনা হয়। কী সুন্দর রঙিন কাপড়! আমারও মন চাইছিল কাপড় বুনতে।
ব্যাস… অনেক গল্প হয়েছে… এবার না ঘুমোলে বকুনি খাবি।

একি আপু! তোামর চোখে পানি! কী হলো আপু, কাঁদছ কেন?

এমনি। মায়ের কথা মনে পড়ল। কতদিন কেউ আদর করে তিশা বলে ডাকে না। কেউ বলে না, তিশা রাত জেগে পড়িস না, ভোরে উঠে পড়বি…ভোরের পড়া জলদি মুখস্থ হয়।

তুমি কাঁদলে আমারও কান্না পায়। প্লিজ কেঁদো না। আমরা কাঁদলে মা কষ্ট পায়।

কিন্তু বাবা কি আমাদের কষ্ট একটুও দেখে না? কি হতো বাবা আবার বিয়ে না করলে। যাদের মা মারা যায় তারা কি শুধু বাবার আদরে বড় হতে পারে না? মা মারা যাওয়ার ছয় মাস পরে বাবা বিয়ে করল। আত্মীয়রা বলল, আমাদের এবার মায়ের আদরের অভাব হবে না। কিন্তু কেউ বুঝল না সৎ মা কখনো আদর করে না। শুধু অনাচার করে। আমি ভেবেছিলাম মা তো মা-ই হয়। পেটে না ধরলে কি কেউ মা হতে পারে না?

থাক না আপু এসব কথা। তুমিও এবার শুয়ে পড়। এসব ভাবলে তো আর কিছুই আগের মতো হবে না।

ভাবছি না তো। জীবনে কিছু ভাবনা আপনাআপনিই চলে আসে। মামনি আমাদের সৎ মা। সে কোনোদিন মা হতে পারবে না বলে বোনের মেয়ে লাকীকে নিজের কাছে এনে রাখে। বাবাকে বলে আমরা তাকে মায়ের চোখে দেখি না বলে সে লাকীকে সন্তানের আদর দিতে চায়।

আপু অনেক কথা হয়েছে। এসো এবার ঘুমাই। তুমি পড়াশোনা শেষ করে একটা বড় চাকরি করবে। তখন আমরা একটা বাসা ভাড়া করে থাকব। এসব আর সহ্য করতে হবে না।

দুলাইন কবিতা লিখেছিলাম। শুনবে?

বল তো শুনি-—

“ঘুচবে বিষাদ সারা,
দূর দিগন্তে হাঁটবে তিশা দেখতে তোরা দাঁড়া।”

হি হি হি। অনেক দুষ্টু হয়েছিস। চল বারান্দায় গিয়ে জোছনা দেখি। জোছনার আলো গায়ে মেখে পরে ঘুমাব।

Facebook Comments