বাকের ভাই

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি যেদিন হবে, সেদিন বিকেল থেকেই আমরা ছিলাম ভীষণ অপেক্ষায়। এতটা উত্তেজনা বিরাজ করছিল পাড়ায় পাড়ায় যে এই সপ্তাহের দেখা ম্যাকগাইভারের এপিসোডটাও ভুলতে বসেছিলাম আমি। দফায় দফায় মিটিং-মিছিল হচ্ছিল পুরো সপ্তাহ জুড়েই। কেউ বলছিল, ফাঁসিটা হয়েই যাবে, কেউ বলছিল হবে না। ফাঁসি হলেও আমার কিছু যায় আসে না, না হলেও কিছু আসবে যাবে না। মিছিলে হই হই করে অংশ নিচ্ছি আর মিছিল শেষে সায়েম কাকার কিনে দেওয়া জ্বলজ্বলে সবুজ মার্বেল দিয়ে টিটু-মিঠুর সাথে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতে পারছি, এটাই ছিল আমার যাবতীয় আগ্রহের মূল কারণ।

কিছুই ভালো লাগছিল না, তাই টিটু-মিঠুর মারামারি দেখতে গেলাম পাশের বাসায়। টিটু-মিঠুর কোনো ছোট বোন নেই, মলি আপু নামে বড় বোন আছে কেবল। থাকলেই বা কী, ওরা মলি আপুকে থোড়াই কেয়ার করে। আট বছরের মিঠু আর দশ বছরের টিটুর কাছে চার বছর বয়সের আমি ছিলাম অনেকটা খেলনা পুতুলের মতো৷

ওরা ঘুড়ি ওড়াবে, দোকান থেকে কিনেই হই হই করে আমাদের বাসার দরজায় উঁকি দিত, ‘আন্টি, রুমি কই?’ এরকম দিনগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই ওদের আর ছাদে গিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো হতো না, সেই ঘুড়ি আমার দখলে চলে আসত কিংবা আমার ছোট্ট হাতে ঘুড়ির ঝকঝকে পাতলা কাগজ দুমড়ে মুচড়ে যেত। তাতে টিটু-মিঠু কাঁদো কাঁদো মুখ করে রোজকার মতো বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেও পরদিন আবারও নতুন কিছু নিয়ে ঠিকই হাজির হয়ে যেত, ‘আন্টি, রুমি আছে বাসায়?’

তখন প্রতি মঙ্গলবার ধারাবাহিক নাটক দেখাত—‘বারো রকমের মানুষ’। বৃহস্পতিবারও নাটক হতো, সোমবারে হতো ম্যাকগাইভার! আর শুক্রবার হয় ‘ইত্যাদি’ নয় ‘অন্তরা’ নামের কোনো না কোনো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান! শুক্র সোম মঙ্গল আর বৃহস্পতিবার তাই ছিল আমার জন্য বেশ আনন্দের চারটি রাত! এই চার দিন রাতে ভাত খেয়ে নিতে কোনোই ঝামেলা করতাম না আম্মুর সাথে। মাঝে মাঝে শনিবার রাতে হতো ‘বিশ্ব নাটক’। সেটাও মোটামুটি উপভোগ্য ছিল আমার কাছে।

কেন যেন বিটিভিতে যেদিন কোনো নাটক দেখাত না, যেদিন ‘মাটি ও মানুষ’ নামের আমার মতো ছোট শিশুর জন্য অত্যন্ত বিরক্তিকর অনুষ্ঠানটা প্রচার হতো, সেদিনই কেন যেন বেছে বেছে আম্মু রান্না করত কলিজার তরকারী! ভীষণ অপছন্দ ছিল আমার এই তরকারী। ঠিক কী কারণে ওই দিনগুলোতে আমার পড়তে বসতেও ইচ্ছে হতো না, অঙ্ক কষতেও ছিল ভারী আপত্তি। বাড়ির কাজ জমিয়ে রাখতাম কিংবা রাত নয়টার মাঝে শেষ করার তাড়া মন থেকে আসত না বিধায় উদাস নয়নে বাড়িময় ঘুরে বেড়াতাম আর দাদুর আঁচল-তলে মুখ লুকিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করতাম।

খেতে চাইতাম না বলে আম্মুর দেওয়া কাঠের স্কেলের সাঁই সাঁই বাড়িও পড়ত হাত-পিঠে! চার বছর বয়সের আমার জন্য বিটিভিতে ‘মাটি ও মানুষ’ প্রচার হওয়ার রাতটা ছিল তাই অনেকটা বিভীষিকার মতো!

প্রায়ই আমি বেড়িয়ে পড়তাম সায়েম কাকার সাথে, পাড়ার দোকানগুলোতে বাজার-সদাই করতে। এটা ওটা থেকে যদি দুই পয়সা বাঁচিয়ে গোটাচারেক মার্বেল কিংবা লজেন্স বাগিয়ে নেওয়া যায় এই ভরসায় থাকতাম। সেদিন আইস্ক্রিমের বায়না ধরেছিলাম। কিন্তু সেদিন আর আইস্ক্রিমের টাকা বাঁচানো গেল না। মার্বেলও কেন যেন কেনা হলো না। মাঝখান থেকে মন খারাপ হওয়া আমাকে আচমকা ঝাঁকি দিয়ে কাকা বলে উঠলো, ‘রুমি, দেখ, দেখ, গ্রামের মাস্টার—জাহিদ হাসান!’ আসলেই দেখি, জিগাতলার এক চ্যাপ্টা গলির মুদির দোকানের সামনে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে লুঙ্গি পরিহিত, গামছা কাঁধে গ্রামের মাস্টার! জাহিদ হাসানের প্রথমদিকের নাটকটা সেসময় বিটিভিতে প্রচারিত জনপ্রিয় নাটকগুলোর অন্যতম। বলাই বাহুল্য, সেই নাটকে জাহিদ হাসান এর চরিত্র ছিল ‘গ্রামের মাস্টার’ নামে।

সেসময় হুটহাট চোর আসত আমাদের জিগাতলার লম্বাটে চিপা বিল্ডিংয়ে। প্রায়ই এসে টিটু-মিঠুদের বাসার তালা ধরে ঝাঁকাত! আচ্ছা, চোর কীভাবে জানত, সেদিনই টিটু-মিঠুদের বাসা-ভর্তি মানুষজন সব বাইরে! আমাদের কাঠের দরজার মাঝ বরাবর ছিল জানালা কাটা, তাতে আবার শিকও দেওয়া ছিল। লোডশেডিং হলে সেই শিক দেওয়া জানালা খুলে বসে বসে হাওয়া খেতাম আমি দাদু জমিনা ঋতু আর সায়েম কাকা। আম্মু মোমবাতি জ্বেলে রান্নাঘরে রান্না করত। দরজার মাঝখানের জানালাখানা দিয়ে জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকতাম আমি; কখন বাবা আসবে, সেই আশায়। সতর্ক থাকতাম, অন্ধকারে চোর এসে বাবাকে আবার চুরি করে নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য। ছোট হলে কী হবে, বাবাকে চোরের হাত থেকে রক্ষা করার মতো যথেষ্ঠ সাহস আমার ছিল!

মোমবাতির আলোয় দেয়ালে পড়া ছায়ার সাথে আনমনেই কথা বলছিল আড়াই বছর বয়সের ঋতু। মেয়েটা এখনো হাঁটা শেখেনি, কী অদ্ভুত না! অথচ বয়স কিনা তার আড়াই! এভাবেই পাখার বাতাস খেতে খেতে দেখি কে যেন খুট খুট করে টিটু-মিঠুদের বাসার তালা ধরে নাড়ছে! সায়েম কাকা চিৎকার করে উঠল, ‘কে? কে ওখানে?’ জমিনা ছুটে গিয়ে বাসার একমাত্র চার্জার লাইটটা নিয়ে এলো। জানালা গলে সেই লাইটের আলো পড়লো লম্বা করিডোরে। সেই করিডোরের একদম শেষ মাথায় বন্ধ তালা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিঠু! আমাকে দেখে বলল, ‘রুমি, বাসায় কেউ নেই নাকি? আজ তো বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে, জানো না?’

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে, আমরা সবাই প্রস্তুত ছিলাম। ক্ষীণ আশা ছিল বৈকি—হয়তো শেষ মুহূর্তে ফাঁসিটা আর হবে না। ফাঁসি হওয়ার পর্বটা কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের শেষ পর্বটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও লোডশেডিংয়ের জন্য পর্বটা আর সেই রাতে দেখা হলো না! কোনোদিন ভাবিনি, আট বছরের মিঠু, দশ বছরের টিটু কিংবা চার বছরের আমি একটা রাস্তার মাস্তান—বাকের ভাইয়ের জন্য ডুকরে ডুকরে কান্না করব, জিগাতলার এক লম্বাটে বিল্ডিংয়ে লোডশেডিংয়ের সময়কার অন্ধকার চিপা করিডোরে!

Facebook Comments