পাঠ অনুভূতি । পিতামহ

সময়টা ৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দ।

ইতিহাসে তখন বিরাজ করছে জাহেলি যুগ। ঘরে ঘরে চলত মূর্তিপূজা। কাবাঘরেই ছিলো ৩০০’র বেশি মূর্তি। কন্যা সন্তানকে দেওয়া হতো জীবন্ত কবর। লুটতরাজ, দাসপ্রথা, যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিলো সেই সময়ের সাধারণ ব্যাপার।

এমনই এক সময়ে ইয়াসরিবের সবুজ ভূ-খণ্ডে জন্ম নিলো বিস্ময়কর এক আরব শিশু। অস্বাভাবিকভাবে পুত্রের মাথার চুল সাদা হওয়ায় মা তার নাম রাখেন শাইবা, অর্থাৎ সাদা চুলের অধিকারী। একদিন এই শিশুটিই ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে উঠলেন আবদুল মোত্তালিব নামে।

চোদ্দ বছর বয়সে মাতৃভূমি ত্যাগ করে পিতৃভূমি আরবে এসেছিলেন তিনি। কুরাইশ বংশের গোত্র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাবাঘরের। জাহেলি যুগে জন্ম নেওয়া শিশুটি তার অসাধারণ গুণাবলী দ্বারা জয় করলেন আরববাসীর মন। পরবর্তীতে তারই হাত ধরে আল্লাহর কুদরতে নতুন করে আবিষ্কার হলো জমজম কুপ।

দশ ছেলের পিতা হয়ে কুরবানির মহান এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন পূর্বসূরি ইসমাইল আ. এর মতো। তারই উটের পায়ের আঘাতে মরুর বালিতে সৃষ্টি হলো পানির ফেয়ারা। পরবর্তীতে তারই জীবদ্দশায় মহান আল্লাহ বিশাল হস্তিবাহিনী সমৃদ্ধ আবরাহাকে ধ্বংস করেছিলেন।

মামাবাড়ি থেকে ফেরার পথে ডাকাত দলের আক্রমণের স্বীকার হয় কায়েসের পরিবার। তারপর দাস হিসাবে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে। ভাগ্যক্রমে মনিবররূপে পেয়ে যায় আবদুল মোত্তালিবকে। দাসত্বের জীবন হলেও ভালোই চলছিলো কায়েসের জীবন। দয়ালু আবদুল মোত্তালিব দাসদের প্রতি সবসময় সদয় ছিলেন।

হঠাৎই একদিন তার জীবনে আসে বন্ধু তালহার বোন, হুমাইরা। ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে জীবনের দিনগুলো। কিন্তু সব স্বপ্ন পূর্ণতা পায় না। তাদের নিয়তিতেও হয়তো লেখা আছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা!

জন্মের আগে থেকেই দেনার দায় নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলো তালহা। আবরবের সন্তান হয়েও ভাগ্যক্রমে তাকে করতে হয়েছে দাসত্ব। মনিবের মেয়ে সফিয়ার প্রতি অন্যরকম এক ভালোলাগা নিয়ে কষ্টের জীবন কেটে যায় একভাবে। অন্যদিকে সফিয়ারও এই দাসের প্রতি আছে আলাদা মমতা। অথচ তাদের এক সাথে ঘর বাঁধা যেন দূর আকাশের তারার মতো। সময়ের পরিক্রমায় তালহার জীবনে নেমে আসে নানা চরাই-উৎরাই। নিয়তি কখনো তাকে নিয়ে যায় মাআরিবের সবুজ শহরে,আবার কখনো অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, কখনো বা বেদুঈনের তাঁবুতে!

সময়ের প্রয়োজনে আবদুল মোত্তালিবের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ভাগ্যে কি ঘটেছিলো জানা যাবে বইয়ের পাতা মেললে!

* * *

পাঠপ্রতিক্রিয়া: পিতামহ মূলত জীবনীমূলক উপন্যাস। লেখক এটাকে স্রেফ ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন না করে উপন্যাসের ঢংয়ে, কল্পনার রং মিশিয়ে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। এটা এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন তারই নাতি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে কারণে। কিন্তু আরবের এই অবিসংবাদীত নেতার ব্যক্তিজীবনও কম ঘটনাবহুল ছিলো না।

‘পিতামহ’ বইয়ে আলোকপাত করা হয়েছে আবদুল মোত্তালিবের সেই ঘটনাবহুল জীবনের কিছু অংশ। যেখানে লেখক ব্যক্তি আবদুল মোত্তালিবকে তুলে ধরেছেন।

বিশাল কলেবরের এই উপন্যাসের জন্য লেখক প্লট হিসেবে টেনে এনেছেন ইতিহাসবিখ্যাত জাহেলি যুগ, কুরাইশ বংশের নেতা আবদুল মোত্তালিব, সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, মূর্তিপূজা, দাসপ্রথা সহ আবরাহা ধ্বংসের কাহিনি। সেই সাথে দুই কিশোর দাসের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা। যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত চুম্বকের মতো টেনে ধরবে। এই দিক থেকে প্লট নির্বাচনে লেখক যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন বলা যায়।

যে কোনো উপন্যাসের জন্য কাহিনির সাথে পরিবেশ-পরিস্থিতির সঠিক চিত্রায়ণ খুবই গুরুত্ব রাখে। বিশেষ করে এমন এক পরিবেশ, যা সম্পর্কে সবাই ধারণা রাখে, সেটাকে বইয়ে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। লেখক একুশ শতকে বাস করেও সেই সময়ের চিত্র এঁকেছেন নিপুণ হাতে। কাহিনির পরতে পরতে তুলে ধরেছেন জাহিলি যুগে আরবের টালমাটাল চিত্র।

৫২৮ পেজের বইটিতে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য প্রাঞ্জল বর্ণনার কথা আলাদা করে বলতে হয়। কঠিন শব্দ পরিহার করে সহজ শব্দের ব্যবহার ছিলো পুরো বইয়ে। সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢংয়ে লেখক কাহিনি এগিয়ে নিয়েছেন। কিছু কিছু জায়গায় বিস্তারিত বর্ণনা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাহুল্য বর্জন করার বিষয়টাও লক্ষ্য করা গেছে এই রচনায়। অহেতুক কাহিনি টেনে লম্বা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু দরকার ততটুকুই সামনে এনেছেন।

ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে উপন্যাস লিখতে গেলে সবথেকে বড় ভয়টা থাকে, ইতিহাস বিকৃতি করার। লেখক অত্যন্ত কৌশলে এই বিষয়টা এড়িয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্য করা গেছে, লেখক আরবী শব্দ ঢুকিয়েছেন। যেগুলো পড়ার সময় যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও আরবের জাহেলি যুগের বর্বরতার চিত্র অনেকটাই এড়িয়ে গেছেন। আবদুল মোত্তালিবের চরিত্রের দিকে বেশি দৃষ্টিপাত করার জন্যই বোধহয়, সেই সময়ের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা বাহুল্য মনে করেছেন।

বইটি পড়তে পড়তে একটা সময় পাঠক আবদুল মোত্তালিবকে ভুলে গিয়ে তালহাকেও প্রধান চরিত্র হিসাবে ধরে নিতে পারেন। কেননা অনেক ক্ষেত্রে লেখক তালহাকে বেশি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন।

বিশাল সাইজের উপন্যাসটা যখন পড়া শুরু করেছিলাম, তখন ভাবিনি এটা শেষ না করে উঠতে পারবো না। কিন্তু লেখকের বর্ণনাভঙ্গি এবং কাহিনির বুননে ডুবে গিয়েছিলাম। একদিনে শেষ করে তবেই উঠেছিলাম। এটাকে আমি স্রেফ একটা উপন্যাস হিসেবে ধরে নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। এই জন্যই আমার কাছে সুখপাঠ্য মনে হয়েছে। এছাড়াও সবথেকে ভালো লাগার বিষয়টি ছিলো লেখক তার নিজস্ব ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, লেখক অনেক গবেষণা এবং পরিশ্রমের পরেই এত বিশাল উপন্যাস এত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন পাঠকের কাছে। সেই সাথে নিজের অবস্থান বাংলা সাহিত্যে আরও পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। পরবর্তীতে হয়তো তার হাত ধরেই আমাদের বাংলা সাহিত্য যুক্ত হবে নতুন নতুন পালক কিংবা কোনো মাস্টারপিস, যা পঞ্চাশ কিংবা একশ বছর পরও পাঠকের মনে সমান ভালো লাগার সৃষ্টি করবে।

Facebook Comments