নদীর কাছাকাছি—নদী থেকে দূরে

রোদ্রোজ্জ্বল দিন। ওপরে সূর্যটা ভালোই জ্বলছে আজ। আমার মাথায় হেলমেট তাই প্রখর রোদেও সারাটা পথ ছায়া ছায়া। পেছনে বসে আবিদ একটু পর পর কমপ্লেইন করছে—আগুন ধরে গেলো, আগুন ধরে গেলো। রোদে ওর মাথার ওপরটা তেপে উঠছে। আমি ওকে জরীদার টুপিটা বের করে পরতে বলি। ওটা হিট প্রেভেন্ট করবে ভালো। আবিদ টুপি দেয় না মাথায়। কিন্তু খানিক বাদে বাদে রোদের প্রখরতার কথা উল্লেখ করে মাথার চুলে আগুন ধরে যাবার কথা বলতেও ছাড়ে না।

সকাল এগারোটা থেকে ঘুরছি আমরা। উদ্দেশ্যহীন, বোহেমিয়ান। শহর থেকে বেড়িয়ে নদীর পাশটা দিয়ে প্রায় বিশ কিলোমিটার চলে এসেছি। বড় রাস্তা থেকে একটু পরপরই ছোট রাস্তা নেমে গিয়েছে নদীর দিকে। সেদিকে মোড় নিলেই পৌঁছে যাওয়া যায় নদীর একদম কিনারে। নদীতে এখন স্রোত—বিপরীতে ছোট-বড় নৌকা চলছে, অনুকূলেও। পাড়ে সারি বেধে বেড়ে উঠেছে বট, পাকুড় ও অন্যান্য বিভিন্ন জল-প্রতীম গাছ-গাছালি—পাড় বেয়ে মাইলের পর মেইল বহুবার হেঁটে গেলেও যাদের লক্ষ্য করে না কেউ। কেউ মনোযোগ দিয়ে দেখলে হয়তো তাদের ভেতর জন্ম-শখে বেড়ে ওঠা দুয়েকটা ঝাউগাছ দেখতে পাবে। আমরা নদীর কাছাকাছি আসলেও তীরে যাচ্ছি না, দূরেও সরে যাচ্ছি না। নদীর সমান্তরালে আমরাও যেন বয়ে চলছি—কিছুটা দূরত্ব রেখে চলতে চলতে এমনটা ভাবতে ভালো লাগছে। অনেক আগে কক্সবাজার মেরিনড্রাইভ দিয়ে চলতে আমার এরকম ফীল হয়েছিলো। আমরা জানি, নদীর আরো কাছাকাছি গেলেই সেটেল হয়ে যাবো আজ সারাবেলার জন্যে। নদীকে ছেড়ে আসতে না পারার দুর্বলতা আমাদের নদীর কাছে যেতে দিচ্ছে না। মানুশের ভেতর কেউ কেউ এই দুরত্ব পছন্দ করে, প্রাক্টিক্যালি। নদী ও মানুশের সম্পর্কে যেমন, মানুশে মানুশেও। কাছে যেতে ভয় পায়, অস্বস্তি বোধ করে বা এমনিতেই সম্পর্কের দায় এড়াতে। আমি যেমন নদীর পাড়ে গেলে, পা ভেজালে, জলের কিনারা ছুঁয়ে লিখলে কারো নাম—নদীকে ছেড়ে আসতে পারি না। নদীর প্রতি এক ধরনের মোহ জন্মে যায়। তৈরী হয় মায়া। দায়বদ্ধতা। মনে হয় যেন নদী আমাকে ভালোবাসে, আমিও নদীকে। অথচ খাঁ খাঁ মরুর শহরে আমার বসবাস, পাতানো সংসার।

আবিদ হঠাত রোদ ও ‘চান্দি’ পুড়ে যাবার প্রসঙ্গ ভুলে গিয়ে বললো—চলো সদরপুর যাই। আমি ফিরে দেখি তার মাথায় রঙিন জরীদার টুপি চড়ানো। ওহ, দিস ইজ দি ম্যাটার, দেন। নইলে সদরপুর এখান থেকে সোজা না হলেও পনেরো-ষোল কিলোমিটার। আর মাথার ওপর এই রোদ। ওর মাথায় টুপিটা দেখে স্বস্তি পেলাম। এত লম্বা সময়ে গরম লেগে যেতে পারতো। বললাম—চলো, যাই।

সদরপুর যেতে আমাদের নদী থেকে আরো সরে যেতে হলো ভিন্ন পথে। ক্রমশ বাড়তে থাকা দূরত্বে চলতে চলতে মনে হলো ঝিমিয়ে এসেছে স্রোত, মনে হলো ক্ষুদ্র বিক্ষুদ্ধ ঢেউগুলো পাড়ে এসে উছলে পরার মতো কোনো কারণই পাচ্ছে না। এমন নদী নিজের ভেতরেও দেখেছি বলে মনে পরলো হঠাত। এমন নদী এঁকেছি খাতায়, কবিতায়, রুমের দেয়ালে। হে হে। নদী শুকিয়েছে অনেকদিনের খরায়—সেই নদী। সেইখানে জেগে উঠেছে মরুর জীবন। মেরুর জীবন। সদরপুর যেতে আমরা এভাবেই সরে যাই আমাদের নদীগুলো থেকে। অথচ সদরপুর মাত্রই একটা অকাব্যিক, অগাছালো গড়পরতার উপজেলা সদর। এইই। একটা শশ্রুহীন ভণ্ডপীরের আস্তানা ছাড়া আর কিছু নেই সেখানে। ও হ্যা, আস্তানার ভেতর একটা মসজিদ আছে। ভীষণ সুন্দর ও আশ্চর্য স্থাপত্যশৈলীর বিশাল আলিশান মসজিদ। সেখানে যারা সিজদা করে, তাদের অধিকাংশের আকিদা-বিশ্বাসে ভুল, প্রেমে গলত। অথচ এই সদরপুরের জন্যেই আমরা নদীগুলো ছেড়ে যাই কখনো। ভুল বিশ্বাস আর ভোলানো প্রেমের আরাধনায় জায়নামাজ বিছাই জীবনে।

এইটুকুই। আমি আর আবিদ ঘুরি। কখনো শহরের বিস্রস্ত ওয়েভে মিশে থানারোড, জনতার মোড় পার হই। হাঁপিয়ে উঠলে সরকারি রেকর্ডরুমের লাল দালানের সামনে দিয়ে রেস্টহাউজ ও ময়েজুদ্দিনের আশপাশটা ঘোরাফেরা করি পুরনোদিনের বিশাল বনেদি গাছগুলোর ছায়ায়। নদীর দিকে বের হই। পাড়ে বসে আনাগোনা দেখি নৌকাদের। তাদের কোনোটা আগেকার দিনের মতো পাল তুলে ভেসে যায়। আমরা বসে বসে ঢেউয়ের শব্দ আর কখনো সেই সাথে কাওয়ালি শুনি। সিগারেট খাই। আবিদ এদিক ওদিক বা ওর পায়ে শখের বুটজুতা ফোকাসে রেখে ছবি তোলে। নদীর আশেপাশে লোকাল বসতির মানুশেরা আমাদের দেখে বলে—শহরের মানুশ, দম ছাড়তে নদীর কিনারে আসে।

Facebook Comments