দ্য গ্রেট কুইন অব মোঘল অ্যাম্পায়ার

সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার নেমেছে মরুর বুকে। দমকা ঝড়ো হাওয়ায় কেঁপে উঠছে মরুপ্রান্তর। মনে হচ্ছে ছোট তাঁবুটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। বিপন্ন পথযাত্রীদের তাঁবুর ভেতর জ্বলতে থাকা ছোট আগুনটা ঝড়ো হাওয়ায় প্রায় নিভু নিভু। পাতলা পশমি কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা মহিলার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। সন্তানসম্ভবা আসমত বেগমের চোখে যেন খেলা করছে মৃত্যুর বিভীষিকা! তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কাফেলার সাথে থাকা বর্ষীয়ান এক নারী ধাত্রী। সময় বেশি নেই বুঝতে পেরে তার চেহারায় ফুটে উঠল নির্ভরতার ছাপ। আসমত বেগমের শরীরটা কুঁচকে গেছে ব্যথায়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঠোঁট কামড়ে খিঁচুনি সামলাতে চাইল নিঃশব্দে। কান্দাহার সীমান্তের এই মরুভূমির মাঝে তাঁবু ফেলা কাফেলার এখন চরম দুঃসময়। অসহায়, দেশ ফেরারি, সন্তানসম্ভবা এক নারী নিয়ে এমনিতেই তারা খারাপ সময় পার করছিল। তার উপর আসন্ন ঝড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস!

পারস্যের শাহ তামাম্প সাফাভির একজন সম্মানিত সভাসদ মুহাম্মদ শরীফের ভাগ্যবিড়ম্বিত পুত্র মির্জা গিয়াস বেগ এই কাফেলার প্রধান। গিয়াস আর তার ভাই মুহাম্মদ তাহির দুজনে খুব বিলাসিতার মধ্যে বড় হয়েছে। বেশ সম্পদশালী ছিলেন তাদের পিতা। গতবছর মারা গেছেন তিনি। ১৫৭৬ সালে ইস্পাহানের উজির থাকাকালীন সময়ে মারা গেছেন। যদি পরিস্থিতি ঠিকঠাক থাকত বাবার মতোই অভিজাত, বিলাসী জীবনযাপন করতে পারত তারা। কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনা তাদের তখনই দেখতে হলো, যখন মারা গেলেন শাহ তামাম্প। পারস্যের সিংহাসনে বসলেন শাহ দ্বিতীয় ইসমাইল। বাবার মৃত্যুর সাথে সাথে উজিরপুত্র তকমাটাও মুছে গেল। মুহাম্মদ শরীফের পাওনাদাররা এসে ভীড় জমাতে লাগলো তাদের বাড়ির আঙিনায়। পাওনাদারদের পাওনা মিটিয়ে দেবার পর বাকি সম্পত্তির উপর পড়ল নতুন বাদশাহের শ্যেনদৃষ্টি। বসতবাড়ি পর্যন্ত চলে গেল রাষ্ট্রীয় সম্পদের আওতায়। তারা চোখে দেখতে লাগল অন্তহীন আঁধার।

এসময় শাহ দরবারের সভাসদ ছিলেন তাদের বাবার পুরনো বন্ধু। তিনি জানালেন, হয় মৃত্যু না হয় কারাদণ্ড অপেক্ষা করছে গিয়াসের জন্য। রাজার কোপদৃষ্টি পড়েছে তাদের ওপর। পারস্যে সুখের দিন ফুরিয়ে গেছে তার। বুঝতে পারল গিয়াস। সে রাতেই ঘর ছাড়ল তারা। সাথে নিতে পারল স্ত্রী আসমত বেগমের কিছু গয়না আর বহনযোগ্য মূল্যবান কিছু জিনিস। ভাগ্যের বিড়ম্বনা হয়তো তখন শুরু হয়েছিল মাত্র। কান্দাহারে আসার পথে কাফেলা পাড়ি দিয়েছে পারস্যের বিশাল মরুভূমি দাশত-ই-লুতকে।
বিরান মরু। দিগন্তবিস্তৃত ধু ধু বালি। আর মাইলের পর মাইল বিশাল উপত্যকা। নির্জনতায় ছাওয়া মরুপ্রান্তরেরও আলাদা সৌন্দর্য আছে। মাঝে মাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানো গম্ভীর পর্বতমালা সে সৌন্দর্যের প্রমাণ দেয়। সেই সৌন্দর্যের মাঝে লুকিয়ে থাকে মরুভূমির একপ্রকার ভয়াবহতা। মরুদস্যু যার নাম। পাহাড়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা দস্যুবাহিনী গিয়াস বেগের কাফেলার ওপর আক্রমণ করে বসল। মূল্যবান যা কিছু গহনা আর জিনিস ছিল সব কেড়ে নিল। আসন্নপ্রসবা হওয়ায় ধর্ষণের হাত থেকে বেঁচে গেছে আসমত। কাফেলার বাকি মহিলারা বাঁচেনি। লুটপাটের পর বিধ্বস্ত কাফেলার মাঝ থেকে দুটো বুড়ো খচ্চর পেল কাফেলার লোকেরা। সেগুলোই এখন তাদের পথচলার বাহন। তারপর পথে পথে ভিক্ষে করে এগিয়েছে তারা। এমন কপর্দকহীন অবস্থায় নতুন আরেকটা মুখের চিৎকার শুনল গিয়াস বেগের কান। তার এখন উঠে যাওয়া দরকার। কিন্তু মন উঠতে চাইছে না। তবু উঠে দাঁড়াল। বলতে হয় দাঁড়াতে হলো। মনের ভেতর চলছে দুঃখ-বেদনা আর দুশ্চিন্তার ঝড়। বাইরের ঝড়ের চেয়েও বড় ঝড়। তাঁবুগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। পাথরে মাথা ঠুকে চোখ বুজল। হায়! এমন দিনও আসবে তার জীবনে? কে ভেবেছিল ইস্পাহানের উজিরের পুত্রবধূ এই বিরান মরুর মাঝে জন্ম দেবে তার চতুর্থ সন্তানের! অথবা তার ছেলেকে জন্মভূমি ছেড়ে চোরের মতো পালিয়ে আসতে হবে? পারিবারিক সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে তাকে পথ ধরতে হবে অন্য দেশের! আশা করতে হবে অন্য দেশের সম্রাটের করুণার!
পশ্চিমে হাঁটু গেড়ে বসে আল্লাহর কাছে সন্তান ও তার মায়ের সুস্থতার জন্য দোয়া করল। তারপর এগিয়ে গেল আসমতের তাঁবুর দিকে। ফ্যাকাশে চামড়া আর শুকিয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে শুয়ে আছে আসমত। ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। তার কোলে পুরনো কাপড় জড়িয়ে শুয়ে আছে নবজাতক। আমাদের কন্যা, বলে তার কোলে তুলে দিল আসমত। সুন্দরী, সুগঠিত হাত-পা, দুপুরের উজ্জ্বল রঙা রোদ্দুরের মতো গায়ের রং, মাথাভর্তি কালো কুচকুচে ঘন চুল, আর সরু কালো ভ্রূর নিচের নীল দুটি চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। অমন কন্যা দেখে খুশি হওয়ার কথা। আনন্দে আপ্লুত হওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই করল না গিয়াস বেগ। কিছুই হলো না। এমন ধু ধু মরুভূমিতে নিজেদের বাঁচার আশাই নেই, আর কন্যাকে কী করে বাঁচাবেন? আসমত বেগমের পান্ডুর দৃষ্টিতেও যেন উজ্জ্বলতা। গিয়াস বেগের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি তার নাম রাখলাম মেহেরুন্নিসা। নারীদের সূর্য! গিয়াস বেগ ধীরে ধীরে গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল যেন। অমন রূপবতী কন্যার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত নাম আর নেই। হাতের মুঠোয় নিলেন কন্যার রেশম কোমল হাতটি। গোলাপের মতো গাল দুটিতে আলতো করে চুমু খেলেন। চোখ দুটো ভিজে উঠল তার। আর তখনই নিলেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। এই কন্যার মায়া তার ছাড়তে হবে। দুঃখে বুক ভেঙে যায়। মনে হয় এখনই যদি তার মৃত্যু হতো। খোদা! তোমার কী মর্জি! এমন দিনও আমার দেখতে হলো! পথের পাশে কলিজার টুকরোকে ফেলে রেখে এগিয়ে চললেন তারা। এই আশায় হয়তো কোনো ধনী ব্যক্তি মেহেরুন্নিসাকে কুড়িয়ে পাবে আর তাকে আদর-যত্নে বড় করে তুলবে। চোখের পানিতে বুক ভেসে যাচ্ছে সবার! তবু উপায় কী?
কিন্তু আল্লাহ যাকে সৃষ্টি করেছেন ভারতবর্ষের ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞী করে তাকে কি আর ধূসর মরুর বালিতে ফেলে রাখতে পারেন? কিছুক্ষণ পর সেই পথ ধরে এলেন একদল বণিক। বিরান মরুতে শিশুর কান্না শুনে থমকে দাঁড়ালেন তারা। অসহায় শিশুটিকে দেখতে পেয়ে কোলে তুলে নিলেন দলনেতা মালিক মাসুদ। এ শিশুকে বাঁচাবেন কী করে? এর জন্য তো একজন ধাত্রী দরকার। কোথায় পাওয়া যায়?
ভাগ্য সহায় হলো তার। সামনেই পেলেন গিয়াস বেগের কাফেলাকে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর সবাই। মালিক মাসুদের মায়া হলো। আসমতকে ধাত্রীর দায়িত্ব দিলেন। আপন মেয়েকে কোলে পেয়ে মায়ের কষ্ট দূর হয়ে গেল। পরে মালিক মাসুদ সব জানতে পারলেন। পরিবারটির জন্য মায়া হলো তার। তিনি তাদেরকে নিয়ে চললেন বাদশাহ আকবরের দরবারে। আর মেহেরুন্নিসার জন্য আরেকজন দাই ঠিক করে দিলেন। মহিলার নাম ছিল দিলারাম। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ১৫৭৮ সালের কোনো একদিনে কাফেলা ফতেপুর সিক্রিতে পৌঁছাল। গিয়াস বেগকে সম্রাট আকবরের দরবারে নিয়ে গেলেন মালিক মাসুদ। ফতেপুর সিক্রির সাধারণ দরবার, দিওয়ান-ই-আমে। সম্রাট জানতে চাইলেন গিয়াস বেগের পরিচয়। পরিচয় বলল গিয়াস বেগ। আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে দেখার পর তাকে সম্রাটের পছন্দ হয়ে গেল। তাকে নিযুক্ত করলেন রাজকর্মচারী হিসেবে। নিজের যোগ্যতাবলেই উচ্চপদ পেয়ে গেল সে। গিয়াস বেগকে আলাদা বাড়ি করে দেওয়া হলো। শাহীমহলে কদর হলো মেহেরুন্নিসা ও তার মায়ের। দিনে দিনে বড় হতে লাগল মেহের।
দিন যত যায় সম্রাটের দরবারে গিয়াস বেগের গুরুত্ব বাড়তে লাগল। সম্রাটের সাথে গিয়াস বেগ শিকারে যায়। পারস্যের বিভিন্ন গল্প বলে। উদার হাতে তাকে সাহায্য করতে শুরু করলেন সম্রাট। দুহাত ভরে তাকে সম্পদ দিতে লাগলেন। বাড়তে লাগল তার পদোন্নতি। দুটো বাড়ি করার জন্য যথেষ্ট জমিজমা ও টাকা-পয়সা তাকে দেওয়া হলো। একটা আগ্রায়, আরেকটা ফতেপুর সিক্রিতে। মেহেরুন্নিসা ও তার ভাইবোনরা বড় হতে লাগল বিলাসিতার ও প্রাচুর্যের মধ্য দিয়ে। গিয়াস বেগ তাদের জন্য শিক্ষক নিযুক্ত করলেন। তারা পড়াশোনা করতে থাকল। তুখোড় মেধাবী মেহেরুন্নিসা অল্পকদিনেই ওস্তাদের দেওয়া পাঠ রপ্ত করতে পারল। দিনে দিনে মেহেরুন্নিসার রূপ, সৌন্দর্য প্রকাশ পেতে লাগল ভোরের মিষ্টি সূর্যের মতো।
* * *
লাহোরের একটা ভাড়া করা বাড়িতে খেতে বসেছিল গিয়াস বেগ। পারস্য গালিচার উপর লাল মখমলের কাপড় বিছিয়ে খাবার পরিবেশন করেছে চাকররা। জাফরান রাঙানো গরম ধোঁয়াওঠা পোলাও আর গরুর গোশত। গাঢ় বাদামি রঙের ঝোলে ঢাকা ছাগলের রান, লেবুর রসে মাখানো সুস্বাদু সালাদ। মাখা মাখা মশলায় গোলাপজল দিয়ে রান্না করা আস্ত মোরগ। চীনামাটির থালা আর কাঁচের গ্লাস। রাজকীয় খাবারের রাজকীয় পরিবেশন যেন! খাওয়া শেষে আরামদায়ক সিল্কের কোমল বালিশে হেলান দিল সে। জানালার ওপারে মেহেরুন্নিসা বসেছিলো ফুল বাগানের ধারে। জানালা দিয়ে মির্জা গিয়াস বেগের চোখ গেল মেহেরুন্নিসার দিকে। গোপন স্নেহের একটা হাসি ফুটল তার ঠোঁটের কোণে। এমনিতে সে কুসংস্কারচ্ছন্ন না হলেও মেহেরুন্নিসা তার জীবনে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে এসেছে এই কথাটা গিয়াস বেগ অস্বীকার করতে পারে না। অথচ এই মেয়েকেই কী না সে! লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে তার। পারস্য থেকে পালিয়ে আসার পর কতগুলো বছর কেটে গেছে! এই বছরগুলোতে তার ভাগ্য দুয়ার দিনেদিনে আরও প্রশস্ত হয়েছে।
শাহীমহলে আজ আনন্দের উৎসব। আলোকসজ্জায় সজ্জিত শাহীমহল। প্রাসাদের চূড়া থেকে মহলের কাছের বাগান পর্যন্ত আলোয় ঝলমল করছে। উৎসবের আমেজ যেন প্রাসাদের আনাচে-কানাচে। শাহজাদা সেলিমের বিয়ে উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন। রাজকুমারী মান বাইয়ের সাথে। মেহেরুন্নিসার পুরো পরিবার এই বিয়ের দাওয়াত পেয়েছে। পরিবারের সবাই বিয়েতে এসেছে। মায়ের সাথে সেজেগুজে মেহেরুন্নিসাও এলো জেনানা মহলে। রাজপরিবারের বিয়ে এর আগে কখনো দেখেনি সে। অবাক চোখে আলোকসজ্জা আর জাঁকজমক দেখতে লাগল। বিয়ের আসরে উঁকি দিল পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে। যতটা না বিয়ের আসর দেখার ইচ্ছে তার তারচেয়েও বেশি ইচ্ছে শাহজাদাকে দেখার। মা আর বাবার মুখে কত গল্প শুনেছে শাহজাদার! মনের ভেতর কোথাও যেন শাহজাদাকে পাবার আকাঙ্ক্ষা জন্মে গেছে। ইশ! আমি যদি রাজকুমারী হতাম! হয়তো শাহজাদা আমাকে বিয়ে করত! ভুলে গেল স্থান-কাল। রাজপ্রাসাদে না কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তার মনে নেই। তার ভাবনার পুরোটা জুড়ে শাহজাদা। সে যখন এসব ভাবনায় মত্ত তার কাঁধে টোকা পড়ল। বিরক্তির সাথে ফিরে তাকাল। দেখল হেরেমের এক রক্ষিতা। কত বড় সাহস মেয়ের! জেনানা মহলে দাঁড়িয়ে সম্রাটের বিয়ের আসরে উঁকি দেওয়া হচ্ছে! গর্জে উঠল মহিলা। মেহেরুন্নিসা কিছু বলার আগেই তার গালে জোরে চড় বসিয়ে দিল। মহিলার হাতের আংটির দাগ বসে গেল মেহেরুন্নিসার চেহারায়। কম্পিত হাতে গালে আঙুল ছোঁয়াল সে। আজতক মা-বাবাও তার গায়ে হাত তোলেনি। বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা যখন তার গাল বেয়ে পড়তে শুরু করল তখন আসমত এগিয়ে এলো- ক্ষমা করবেন। ও হয়তো বুঝতে পারেনি। মিনতির ভঙ্গিতে বলার সাথে সাথে আরেকটা ভারি, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে নির্দেশ এলো— ছেড়ে দাও ওকে। সকলের দৃষ্টি এবার এদিকে। স্বয়ং বাদশাহ আকবরের স্ত্রী রুকাইয়া বেগম মেয়েটার জন্য কথা বলছেন! নিশ্চয়ই মেয়েটা গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে। রুকাইয়া বেগম আদর করে মেহেরুন্নিসাকে কাছে টেনে নিলেন। নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করে বললেন— এখন থেকে তুমি প্রতিদিন আমার কাছে আসবে। আমার সাথে গল্প করার জন্য। তোমাকে আমার বড় ভালো লেগেছে।
জি মহামান্য বেগম। আমি নিশ্চয়ই আসবো বলে সেদিনের মতো বাড়ি ফিরে এলো মেহেরুন্নিসা। তারপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে সে রুকাইয়া বেগমের কাছে যেত।
* * *
একদিন বিকেলে শাহজাদা সেলিম বসে আছেন বাগানের পুকুরের সিঁড়িতে। বেখেয়ালি মনে পাথরের কুচি ছুঁড়ে মারেন পুকুরে ভাসা পদ্মফুলের পাপড়িতে। পদ্মপাপড়ি ছিঁড়ে লুটোয় পানিতে। এসময় নেশা চেপে বসে তার মনে। বারবার পাথরের কুচি ছুঁড়ে মেরে ছিঁড়তে থাকেন পদ্মফুলের পাপড়ি।
মেহেরুন্নিসা এদিকেই আসছিল শাহজাদা খুররমকে খুঁজতে। এসে দেখে শাহজাদা সেলিম এই বেখেয়ালী কাণ্ড করছেন। সব ভুলে সে চেঁচিয়ে উঠল—‘বন্ধ করুন এইসব।’ চমকে উঠেন শাহজাদা। পেছনে ফিরে দেখেন বাগানের প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো ছিপছিপে গড়নের এক মেয়ে। মেয়েটা কাছে আসে। অনুরোধ করে ফুল না ছিঁড়তে। শাহজাদা অবাক হয়ে যান। পরিচয় জিজ্ঞেস করেন তার। পরিচয় দেয় মেহেরুন্নিসা। শাহজাদা তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। তার সাথে গল্প করতে করতে ভাবেন মেয়েটি দেখতে কী মিষ্টি! শাহজাদা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন এই মেয়েকে আমার চাই। মা রুকাইয়া বেগমের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললে রুকাইয়া বেগম বাদশাহ আকবরকে জানান। বাদশাহ আকবর এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কারণ মেহেরুন্নিসা যখন শাহজাদার সাথে পুকুরের সিঁড়িতে বসে গল্পে মত্ত ছিল, তখনই মির্জা গিয়াস বেগের সাথে বাদশাহ আকবর মেহেরুন্নিসার বিয়ের পাত্র ঠিক করছিলেন। সে এক ইরানি সৈন্য। আলিকুলি খান যার নাম। কদিন বাদে রাজরাণী হবার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে আলিকুলির সাথে বিয়ে হয়ে যায় মেহেরুন্নিসার। যে কিনা তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। অশ্রু ছলছল চোখ, আশাহত, ভঙ্গুর মন নিয়ে বিয়ের পর স্বামীর সাথে বর্ধমানে চলে যায় মেহেরুন্নিসা। শাহজাদা সেলিমের মনে মেহেরুন্নিসা আধোছায়াতে দেখা এক সুন্দরম স্বপ্নের মতো রয়ে গেল। শতশত মাইলের দূরত্বের এপারে দাঁড়িয়ে তাকে অনেকবার খুঁজেছেন শাহজাদা। কিন্তু পাননি।
বর্ধমানে গিয়ে মনের অনিচ্ছাতেই স্বামীর সংসার করতে থাকে মেহেরুন্নিসা। আলিকুলির ঔরসে মেহেরুন্নিসার একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। মেহের তার নাম রাখে লাডলি। যার অর্থ প্রিয়।
লাডলি মায়ের মতোই দেখতে মিষ্টি। তার প্রতিটি অঙ্গের নাড়াচাড়া মেহেরুন্নিসার হৃদয় ভরিয়ে দেয়। পুরনো শোক ভুলে আদরের কন্যার হাসির ছন্দে সে তার জীবনের গতি বাঁধে।
এদিকে যমুনার পানির সাথেই বয়ে চলে শাহীমহলের ভেতরকার সময়ের স্রোত। মেহেরুন্নিসা বর্ধমানে থাকাকালীন সময়ে ১৬০৫ সালের ২৭ অক্টোবর বাদশাহ আকবর মারা যান। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর শাহজাদা সেলিম মাথায় মুকুট পরে, নামের সাথে নতুন উপাধি ‘জাহাঙ্গীর’ নিয়ে সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসে মেহেরুন্নিসার পিতা গিয়াস বেগকে পুরো সাম্রাজ্যের দেওয়ান বানিয়ে দেন।
বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শিকারে একবার সাথী হয় আলিকুলি খান। জাহাঙ্গীরকে সে একটি বাঘের কবল থেকে রক্ষা করে বাঘটা মেরে ফেলে। বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাকে উপাধি দেন ‘শের খান’। শের খান একসময় শাহজাদা খসরুর সাথে মিলিত হয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। বিদ্রোহ দমনের জন্য পাঠানো হয় কুতুবউদ্দীনকে। শের খান কুতুবউদ্দীনকে হত্যা করে। কুতুবউদ্দীনের সৈন্যরা শের খানকে হত্যা করে।
মেহেরুন্নিসা ফিরে আসে মোগল মহলে। আশ্রয় পায় রুকাইয়া বেগমের কাছে। তার দিন কাটে নানানকাজে।
* * *
১৬১১ সাল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের বয়স তখন ছয় বছর। ২১ মের এক আনন্দঘন সন্ধ্যা। শাহীমহলে নওরোজ উৎসব। আলোয় সেজেছে সারা বাগান। হেরেমের মহিলারা আয়োজন করেছে এই উৎসবের। থরে থরে বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছে মেয়েরা। কারুকাজ করা পোশাক, নিপুণ হাতে বানানো বিভিন্ন জিনিসপত্র। সবাই উদগ্রীব কখন সম্রাট আসবেন মেলায়। আর তার পদধূলি দেবেন। বখশিশ দেবেন। দোকানিরা ধন্য হবে। প্রতীক্ষা একসময় শেষ হলো। সম্রাট আসলেন। ঘুরে ঘুরে দেখছেন সবকিছু। পরখ করছেন। হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের সামনে থমকে দাঁড়ালেন। রকমারি পোশাকের দোকান। পোশাকগুলোও খুব সুন্দর। চমৎকার ফুলতোলা, কারুকাজ করা। হীরে পান্না মতি বসানো। ফটকের কাছেই দোকানি সাদা পোশাক পরে—অপার্থিব স্নিগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেনা মনে হচ্ছে তাকে। স্মৃতির মনিটরে একটা নাম ঘুরছে বারবার। আনমনে এসে দাঁড়ালেন দোকানের ভেতরে। এগিয়ে এলো দোকানি। পোশাকগুলো দেখিয়ে বলল, জাহাঁপনার কি পছন্দ হয়েছে?
মিষ্টি কণ্ঠের শব্দে ঘোর ভাঙল তার। হ্যাঁ, ঠিক চিনেছেন তিনি। উনিশ বছর আগের বিকেলের কথা মনে পড়ল। মেহেরুন্নিসাকে চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি। এইবার তার দিকে ভালো করে তাকালেন। মেহের! একটুও বদলায়নি! অথচ মাঝে কেটে গেছে কতগুলো বছর! খুব ভালো লাগল তার। সংক্ষিপ্ত আলাপ শেষে বেরিয়ে এলেন তিনি। পূর্বের মতো আবারও মায়ের সাথে আলাপ করলেন। মেহেরুন্নিসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানলেন। তারপর বিয়ের প্রস্তাব দিলেন তাকে। ১৬১১ সালের ২৫ মে তেত্রিশ বছর বয়েসে মেহেরুন্নিসার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন সত্যি হলো। বিয়ে হলো সম্রাটের সাথে। তিনি হলেন সম্রাজ্ঞী। সম্রাজ্ঞী হবার পর প্রকাশ হতে লাগল তার সুপ্ত প্রতিভা। নিজ গুণ, যোগ্যতা বলে সবাইকে অবাক করে দিলেন। নিজ বুদ্ধির গুণে বিরাট ক্ষমতার অধিকারী হলেন। তার রূপের সাথে প্রতিভার বিষয়টাও সম্রাটের নজর কাড়ল। সম্রাট বুঝতে পারলেন, তার এই স্ত্রী সাধারণ কেউ নন। সে তার মহল, রাজ্য আলোকিত করবে। তাই বিয়ের পর সম্রাট তার উপাধি দিলেন নূরজাহান। জগতের আলো। সম্রাজ্ঞী হয়েও নূরজাহান বিলাসিতায় ডুবে যাননি। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল বুদ্ধিমত্তা। অসাধারণ বুদ্ধিমতী ছিলেন তিনি। সাথে যোগ হয়েছিল শিল্পী আর কবির মন। নারী হয়েও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ। ফারসিতে কবিতা লেখা, আবৃত্তি করা ছিলো তার অন্যতম শখ। সম্রাটকে প্রায়ই নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতেন।
একবার তিনি সম্রাটকে নিজ হাতে সুগন্ধি বানিয়ে উপহার দিয়েছিলেন। গোলাপের পাপড়ি জ্বাল দিয়ে এ সুগন্ধি তৈরি করেছিলেন। সেই থেকে গোলাপের আতরের প্রচলন শুরু হয়। সম্রাট এ আতর দেখে খুব খুশি হন। খুশি হয়ে এ আতরের নাম দিলেন আতর-ই-জাহাঙ্গীরী।
বিচিত্র গুণের অধিকারী ছিলেন নূরজাহান। অন্দরে যেমন নিপুণ শিল্পী, বাইরে তেমন দক্ষ সেনাপতি। রাজকার্যে সমান অংশীদার। ঘোড়ায় চড়ে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতেন। খোলা তলোয়ার হাতে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও ছিল তার। তেমনি রাজ্য পরিচালনায় সম্রাটকে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতেন।
এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি সম্রাটের সবচেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে উঠেন। তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্রাটকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতেন। সে যুগে একজন মুসলিম মহিলার স্থান ছিল পর্দার আড়ালে। পর্দার আড়াল থেকে একজন মহিলার জন্য রাজকার্যে অংশগ্রহণ করা কতটা কঠিন ছিল তা বলে বুঝাবার মতো নয়। তবুও তিনি তার অসামান্য বিচক্ষণতা, চিন্তার তীক্ষ্ণতা দিয়ে রাজদরবারে তার আসন করে নিয়েছিলেন। ভারত সম্রাজ্ঞী হতে পেরেছিলেন।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে জাহাঙ্গীর ছিলেন এক মদমত্ত সম্রাট, যার সাম্রাজ্য পরিচালনায় কোনো মনোযোগ ছিল না। আর সে কারণেই নাকি তিনি এর ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন স্ত্রীর হাতে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়।
কারণ তিনি তার স্ত্রী নূরজাহানকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেটার কারণেই নূরজাহান মোঘল সাম্রাজ্য শাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন ব্যাপারটা তা নয়। কার্যত নূরজাহান এবং জাহাঙ্গীর ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। স্ত্রী যে সাম্রাজ্য শাসনে তার পাশে আসন নিয়েছিলেন, সেটি নিয়ে জাহাঙ্গীরের কোনো অস্বস্তি ছিল না।
তাদের বিয়ের পরপরই নূরজাহান প্রথম যে রাজকীয় ফরমান জারি করেছিলেন তা ছিল এক রাজকর্মচারীর জমির অধিকার রক্ষায়। সেখানে তিনি স্বাক্ষর করেন নূরজাহান পাদশাহ বেগম নামে, যার অর্থ নুর জাহান, সাম্রাজ্ঞী। তিনি যে সার্বভৌম এবং তার ক্ষমতা যে বাড়ছে, এটি ছিল তারই ইঙ্গিত।
নূরজাহানের এই প্রভাব মহলের ভেতরের ও বাইরের কারোর সহ্য হচ্ছিল না। তার শত্রুতায় লেগে গেল অনেকেই। বাদশাহ আকবরের স্ত্রী ছিলেন জেনানা মহলের প্রধান। তার মৃত্যুর পর মহলের প্রধান হিসেবে সম্রাট ঘোষণা করলেন নূরজাহানের নাম। এই ঘোষণার পর তার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র করা হলো। বুদ্ধিমতী নূরজাহান ঠাণ্ডা মাথায় ষড়যন্ত্রের ঝড় সামলে নিলেন আপন দক্ষতায়।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের চার পুত্র, খসরু, খুররম, শাহরিয়ার, পারভেজের প্রতি নূরজাহান কখনোই সৎমায়ের মতো আচরণ করেননি। সবসময় তাদেরকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেছেন। শাহজাদা খুররমের সাথে তিনি তার আপন ভাইয়ের মেয়ে আরজুমান্দের বিয়ে দেন। আর শাহরিয়ারের সাথে বিয়ে দেন নিজের মেয়ে লাডলির। ভাই আসফ খাঁকে দেন উচ্চ রাজপদ।
সম্রাট জাহাঙ্গীর জ্ঞানীর কদর বুঝতেন। তাই তিনি নূরজাহানকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছিলেন। নূরজাহানের রাজকার্যে অংশগ্রহণ তিনি ভালো মনেই গ্রহণ করেন। কিন্তু শাহজাদা, উচ্চপদস্থ সভাসদদের এটা পছন্দ হয়নি। তবে সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসেছিল। ঝরোকায় প্রতিদিন জনসাধারণ থেকে রাজ সভাসদ সবার অভাব অভিযোগ শুনতেন সম্রাট। নূরজাহানও সম্রাটের সাথে ঝরোকায় যেতেন। কখনও সম্রাট অসুস্থ থাকলে তিনি একা যেতেন। সাধারণ প্রজাদের অভিযোগ শুনে ন্যায়বিচার করতেন। ফলে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যময়। গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার আগে নূরজাহানের মতামত জানতে চাইতেন।
আদেশনামাগুলোতে সম্রাটের স্বাক্ষরের পাশাপাশি সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের স্বাক্ষরও ব্যবহার করা হতো। এমনি করে ১৬১৭ সালে দেশের প্রচলিত মুদ্রায় তার নাম অঙ্কিত করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন অনেকে। শঙ্কিত হয়ে উঠেন শাহজাদারা। নূরজাহানের বিরুদ্ধে দানা বাঁধে ষড়যন্ত্রের। সম্রাজ্ঞী ভয় পান না কিছুতেই। বুদ্ধির বলে সব সহজভাবে মিটিয়ে নেন। ষড়যন্ত্রকারীরা তবুও থেমে নেই। তারা অপপ্রচার করতে থাকে যে, নূরজাহান সম্রাটের পরে তার জামাতা শাহজাদা শাহরিয়ারকে সিংহাসনে বসাবেন। শাহজাদা খুররমের সাথে সম্রাজ্ঞীর সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে তার কান ভারি করে তোলেন। শাহজাদা এসব বিশ্বাস করে নেন। আরো অনেকেই এ অপপ্রচারে কান দেন। স্বার্থের প্রশ্নে আসফ খান এবার বোনের বিরুদ্ধে যান। কারণ তিনি খুররমের শ্বশুর। তার ইচ্ছা খুররম হোক পরবর্তী সম্রাট। তিনি বোনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামেন। অথচ নূরজাহান জানতেন শাহরিয়ার দুর্বল। সিংহাসনে বসার যোগ্যতা তার নেই। সিংহাসনে বসার ক্ষেত্রে খুররম সবার চেয়ে বেশি উপযুক্ত। তাই তাকে পরবর্তী সম্রাট হিসেবে মেনে নিতে তার কোনো আপত্তি ছিল না।
* * *
এসময় ঘটল আরেক অঘটন। শাহজাদা খসরু মারা গেলেন। দাক্ষিণাত্যে ছিলেন খুররম। হঠাৎ একদিন তিনি বিদ্রোহ করে বসলেন। জাহাঙ্গীরের স্বাস্থ তখন খারাপ। জটিল কোনোকিছুর ভার বইবার ক্ষমতা নেই তার। এই দুঃসময়ে সাম্রাজ্যের হাল ধরলেন সম্রাজ্ঞী। প্রধান সেনাপতি মহবত খানের কাছে সংবাদ পাঠালেন। তিনি প্রথমে তার সাথে মিলতে না চাইলেও সম্রাজ্ঞীর বুদ্ধির কাছে হার মানেন। এগিয়ে আসেন তার সাহায্যে। বিদ্রোহী খুররম পরাজিত হন।
ষড়যন্ত্রকারীরা ধীরে ধীরে আবার শক্তিশালী হয়ে উঠে। নূরজাহানের বিরুদ্ধে মহবত খানকে উত্তেজিত করে এই বলে যে নূরজাহান শাহরিয়ারকে সিংহাসনে বসাবেন। এদিকে মহবত খান সমর্থন করেন শাহজাদা পারভেজকে। তিনিও বিদ্রোহী হয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সম্রাটের আর বিদ্রোহ দমনের শক্তি নেই। তাই নূরজাহান নিজে অস্ত্রধারণ করেন। নারী হয়ে অস্ত্র হাতে ঝিলাম নদী পার হন। তবু শেষ রক্ষা হয় না। হেরে যাবার আশঙ্কা দেখতে পান সম্রাজ্ঞী। বুদ্ধিমতী নূরজাহান স্বেচ্ছায় ধরা দেন। মহবত খানকে সম্রাটের কাছাকাছি থাকার সুযোগ দেন। অপরদিকে তিনি গোপনে সৈন্য জোগাড় করতে থাকেন। এবারও তার বুদ্ধির কাছে হেরে যান মহবত খান।
১৬২৬ সালের শরৎকালে সম্রাটকে সাথে নিয়ে বিজয়ী নূরজাহান ফিরে আসেন আগ্রায়।
গ্রীষ্মের আবহাওয়ায় আগ্রা যেন জ্বলন্ত উনুন! গরম হাওয়ায় শরীর বিষিয়ে ওঠে। শরীরের সমস্ত আর্দ্রতা শুষে নেয় উত্তপ্ত হাওয়া। অসুস্থ সম্রাট শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। বৃদ্ধ-অসুস্থ সম্রাটকে নিয়ে নূরজাহান কাশ্মিরে চলে যান। এই সময় জাহাঙ্গীরের অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকে যাচ্ছিল। নূরজাহান শত চেষ্টা করেও ধরে রাখতে পারলেন না তার প্রিয়তম সম্রাটকে। হাকিমদের প্রাণপণ চেষ্টাও বিফল হলো। ১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর মারা গেলেন সম্রাট। চোখের সামনে চলে গেল তার কৈশোরের আরাধ্য পুরুষ। যৌবনের প্রেমিক। নূরজাহান তখন সত্যিকার অর্থে ভেঙে পড়লেন। আরও ভেঙে পড়লেন যখন সম্রাটের মৃত্যুর পর তার আপন ভাই তাকে নজরবন্দি করে রেখে জামাতা শাহজাদা খুররমকে সিংহাসনে বসানোর পায়তারা করলেন। অথচ তার এই ভাইয়ের সম্মানের পদ পাওয়ার পেছনেও নূরজাহানের পূর্ণ অবদান ছিল। শাহজাদা খুররম শাহজাহান উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসলেন।
* * *
সম্রাটের মৃত্যুর পর নূরজাহান আরও ১৮ বছর জীবিত ছিলেন। এই পুরোটা সময় তিনি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ধর্মচর্চা, কাব্যচর্চার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত করেছেন জীবনের শেষ সময়। মাঝেমধ্যে মন যখন বেশি অস্থির হতো তখন তিনি তার প্রিয়তমের কবরের কাছে যেতেন। হাত তুলে প্রিয়তমের জন্য দোয়া করতেন। ১৫৭৭ সালের ৩১শে মে কান্দাহারের মরুভূমিতে চরম দুঃসময়ে অসহায় অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন মেহেরুন্নিসা। রূপের আলোতে আলোকিত করেছিলেন নির্জন মরুভূমি। কালের পরিক্রমায় সে আলোয় আলোকিত হলো পুরো ভারতবর্ষ। ইতিহাসের পাতা। নারীদের সূর্য থেকে জাহানের আলোয় রূপান্তরিত হয়েছিলেন তিনি। তারপর ১৬৪৫ সালের ১৭ই ডিসেম্বর লাহোরের এক নির্জন বাগানবাড়িতে সে আলোর শিখা নিভে যায়। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়ে পরকালের পথে যাত্রা করেন সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। প্রদীপ নিভে গেলেও তার জ্যোতি রয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। সোনালি হরফে লেখা হয় প্রদীপ শিখার বণার্ঢ্য জীবনের আখ্যান। শাহদারাবাগের নির্জনতায় ছাওয়া বাগানে একখণ্ড ভূমিতে শুয়ে আছেন সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। সেখানে আজও বর্ষিত হয় ভক্তদের হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

তথ্যসূত্র:
১. তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী
২. দ্য হিস্টোরি অব হিন্দুস্তান, লেখক: আলেকজান্ডার ডো
৩. স্টোরিয়া দো মোগোর, লেখক: নিকোলাও মানুচ্চি, অনুবাদক: উইলিয়াম আরভিন
৪. মোঘল হারেম: ইতিহাস ও ঐতিহ্য, লেখক: মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহাব
৫. দ্য হিস্ট্রি অব রয়্যাল লেডিস ইন মোঘল এমপায়ার
৬. মোগল যুগে স্ত্রী শিক্ষা, শ্রীবজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়

Facebook Comments