দু’চাকায় ভেসে নিরুদ্দেশ যাত্রা

আমাদের ভ্রমণ দলের নাম ওয়ার্ল্ড অন টু হুইল, মানে দু’চাকার উপর বিশ্ব। আমাদের প্রথম দূরপাল্লার ভ্রমণ ছিলো ঢাকা টু নারায়ণগঞ্জ। সে এক দারুণ ভ্রমণ, সাত সাতজন তরুণ, হল্লা করে চলছে, আহা কি মজা। কিন্তু সে সফরের কথা বলছি না, বলবো আরো বড় সফরের কথা কথা, ঢাকা টু চট্টগ্রাম।

একটা প্রবাদ আছে, আপনি যতো চূড়ায় উঠবেন ততো একা হতে থাকবেন, এটা শিক্ষা সম্পর্কিত কথা হলেও এখানেও চলনসই। যতো কম দূরত্বে যাবেন ততো মানুষ বেশি থাকবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম হয়ে আমাদের এবারের সফর বান্দরবানের ধানচি পর্যন্ত, বাংলাদেশের অর্ধেক পথ প্রায়।

তো ঢাকা টু চট্টগ্রাম কে কে যাবে জানতে চাওয়ায় একে একে সরে দাঁড়াতে দেখলাম সবাইকে, যাবে মাত্র একজন, মুগ্ধ। মুগ্ধ ঢাকা কলেজে অনার্স ফোর্থ ইয়ারে পড়ছে, ক্লাবের ফাউন্ডারদের একজন। এই ছেলেটার সাহস আছে বটে, পাক্কা আড়াই থেকে পাঁচশো কিলোমিটার তো কম না!, সময় বেছে নিলাম করোনা প্রাদুর্ভাবের একদম শুরুর দিকটা। লোকজন ঢাকা ছাড়ছে, কখন লকডাউনে আটকা পড়ে যায় এই আশঙ্কা আছে। আমরা তো দু’চাকায় ভেসে ভেসে যাবো আমাদের আবার ভয় কী!
এপ্রিলের এক কনকনে শীতের রাতে আমরা বের হলাম, গাড়ি-ঘোড়া কম কম চলছে, আমরা দুজন ঝিগাতলা থেকে রওয়ানা দিলাম, পথে হাওয়া দিয়ে নিলাম চাকায়। মুগ্ধ’র মাথায় টমি জিন্স এর একটা ক্যাপ, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় এক অন্য মানুষ লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে আমরা ঢাকা ছেড়ে কোনো এক রূপকথার রাজ্যে যাচ্ছি।
জাদুর শহর পার হলাম মাত্র, যাত্রাবাড়ী শনিরআখড়া চিটাগাংরোড পার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে কখন এসে পড়লাম কে জানে, সময়ের হিসেবে কতক্ষণ জানি না, আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলাম স্রষ্টার অপরূপ কীর্তি, নিচে বয়ে চলছে জলস্রোত। আকাশে অগণন তারা। তারাদের আলো ঠিকরে পড়ছে জলে, আহারে কি সুন্দর।

রাত ৩.৩০
আমরা অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি ঢাকাকে, ভ্রমণে প্রথম ধাক্কা খেলাম নারায়ণগঞ্জের কোনো একটা জায়গায় এসে, এখানে একটা ফিলিং স্টেশন আছে, এই স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছে ফুস করে লিক হয়ে গেল মুগ্ধ’র চাকা। নির্জন রাত, কোথায় কি পাই? অবশ্য ভ্রমণপথ এমন ঝামেলা হবে তা আমরা ভেবেই রেখেছিলাম। হন্যে হয়ে আশপাশের সারাইয়ের দোকান খুঁজলাম। কপাল মন্দ, যা আছে তা ট্রাকের চাকা সারাইয়ের দোকান, কোথায় ট্রাকের চাকা কোথায় সাইকেলের!
তাহলে কি করতে হবে? সকাল পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিশ্রাম। ফিলিং স্টেশনের এবাদতখানায় শুয়ে গেলাম।

ভোর ০৫ টা
ঢাকায় যে মশা দেখি নাই তার চেয়ে পঞ্চাশগুণ বেশি মশা এখানে, ঘুমের মধ্যে একবার এ-কাত হয়েছি তো এক দঙ্গল খুন হয়েছে আরেক দঙ্গল খুন হয়েছে অন্য কাত হতে।
… গুনিয়া দেখিলাম মশক তিরিশো হাজার।
মশাগুলো শহরের মশার মতো চালাক না, কেমন বোকা বোকা। হাত বুলাতেই মরে যায়। বহুদিন পর খাদ্য খেয়েছে ওরা। সকাল হতেই দেখি এলাহি কাণ্ড, রক্তারক্তি হয়ে গেছে যেন। আমার সাদা স্যান্ডো গেঞ্জিতে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে।

সকাল ০৮ টা
সাইকেল ঠিক করে পেটের ভেতরে ছুঁচো’র দাপাদাপি থামিয়ে আমরা পড়িমরি করে ছুটলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে, অনেকগুলো ঘন্টা নষ্ট হয়ে গেল। এতক্ষণে আমরা কুমিল্লায় থাকতাম। দ্রুত চালাতে থাকলাম।
সাইকেল চালাতে চালাতে যখন ক্লান্ত তখন শান্তির পরশ বয়ে আনলো পানাম নগর। সভ্যতার বুকে হারিয়ে যাওয়া শহর, অনেকটা গ্রীসের শহরগুলোর মতো গ্রীবা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় এখানে রাজা-মন্ত্রীর মজমা বসতো, এখন সেসব নেই, জৌলুসহীন, পানসে। ভিখিরির শরীরের মতো এখানে ওখানে খসে গেছে, কুঁকড়ে গেছে, তবুও কি সুন্দর!
সৈয়দ মুজতবা আলী কি এ শহর নিয়ে কোনো ভ্রমণ কাহিনী লিখেছিলেন? হয়তো লেখেননি, লিখলে কি সুন্দর হতো। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে আমরা ফিরতে লাগলাম পিচঢালা রাজপথে, আবার দু’চাকার পঙ্খিরাজ ছুটলো।

রাত আটটা
আমরা এখন কুমিল্লা, মাহাথির ভাই টাউন হল দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, আমি সেদিকে যাব। কিন্তু মুগ্ধ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। চুড়ায় আমাকে একা পৌঁছোতে হবে। সে বাড়ি যাবে। একটা বাসের ছাদে সাইকেল তুলে দিলাম। মুগ্ধ অনেকগুলো ছবি তুলেছিলো ভ্রমণপথে, এবার কে ছবি তুলবে?
সারা গায়ে জঞ্জাল, কেমন গুমোট গন্ধ হয়ে আছে, নিজেকে ব্রেয়ার গ্রিলস মনে হচ্ছে। মাহাথির ভাইয়ের ওখানে গিয়েই একটা গোসল দেবো আর একঘুমে দুপুর।

দুপুর ২টা
একঘেয়ে বৃষ্টি আর ক্লান্তিকর জার্নির ধকল সইতে সইতে বিশাল সময় চলে গেল, আবার চাপলাম দু’চাকায়। আজ রাতে আর কোন বিশ্রাম নয়। একদম চট্টগ্রাম জেলায় ঢুকে গা এলিয়ে দিবো, যতো রাত হোক।
কুমিল্লা মূল শহর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে বেশ দূরে, আট দশ কিলোমিটারের বেশি কিছু হতে পারে, এটা এক্সট্রা, হিসাবে ছিলো না, যেমনটি ছিল না পানাম নগর।
কুমিল্লা অবধি নখের মতো চেনা আমার, আমি আর সৌরভ চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে রেললাইনে হেঁটে হেঁটে কুমিল্লা পর্যন্ত এসেছিলাম, কোনো একদিন কুমিল্লা থেকে ঢাকা পর্যন্তও যাবো। সে ভ্রমণের কথা আরেক দিন বলব।
চলতে চলতে সব চেনা চেনা লাগছে, সেই বাজারটা যেখানে চা খেয়েছি, সেই মসজিদটা যেখানে হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে রাত বারোটায় ঘুমিয়েছি, এইসব এলাকা পার হচ্ছি আর সেসব স্মৃতি মনে পড়ছে। কুমিল্লা চলছে তো চলছেই, শেষ হয় না।
অবশ্য প্রচুর জায়গায় বিরতি নিয়েছি, লোকজনের করোনা নিয়ে গসিপ শুনেছি, সরকার নাকি করোনা রোগীদের ধরে নিয়ে গুম করে ফেলছে, মজা পেয়েছি। গুজব বাতাসের আগে ধায়। আমি ঢাকা থেকে এসেছি শুনে তাদের চক্ষু চড়কগাছ, ভয় পাচ্ছিলাম করোনা রোগী মনে করে কিনা।
পথে বিজিবি চেকপোস্টে পেলাম, একদম সীমান্ত লাগোয়া। আনন্দিপুর নাম। আমরা যেবার হেঁটে এসেছিলাম সেবার এখানে বিজিবি সদস্যদের সাথে আড্ডা দিয়েছিলাম। ঠিক আড্ডা না, চা টা খাওয়া আর কি। এবার তো আমি একা, সন্দেহ করে কিনা। তাও আবার গভীর রাত, তবুও সাহস করে গেলাম, তাদের পরিচয় দিলাম, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। নাহ, এবার তেমন আদর আপ্যায়ন ছিল না, করোনার সময় বলে কি-না!
মহিপাল সাইনবোর্ড দেখে যখন স্বস্তির শ্বাস ফেলছি তখন রাত তিনটা।

ভোর পাঁচটা
চট্টগ্রাম জেলার প্রথম উপজেলা মিরসরাইয়ে ঢুকলাম, খৈয়াছড়া ঝর্ণা আর মহামায়া ইকোপার্ক দেখবো। এই এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূর যেতে হবে, আরো ৭০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম শহর। মিরসরাইয়ে বন্ধু বেলায়েতের বাসায় গিয়ে একটা হেভি গোসল দিয়ে ঘুমালাম, ঘুম থেকে উঠে ঝরঝরে হয়ে আবার ছুটলাম। তখন দুপুর তিনটা।
হালকা বৃষ্টি পড়ছে, ব্যাগ গাঁট হয়ে আটকে আছে পিঠের সাথে, সীতাকুণ্ড পার হতে হতে রাত দশটা বেজে গেল। সিটি গেইট দিয়ে যখন শহরে ঢুকলাম, রাত ১১টা। ভয় পাচ্ছিলাম করোনার সময় বলে শহরে ঢুকতে পুলিশের বাধা আছে কিনা। থাকলেও অতো রাতে কে বাঁধা দিতে আসে!
ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলো দেখতে দেখতে জিইসি মোড়ের দিকে যাচ্ছি, ওখানে অভিবাদন জানানোর জন্য বন্ধু রাকিব অপেক্ষা করছে।
২৫০ কিলোমিটার জার্নির ঝক্কি তো কম না, রাতে রাকিবের বাসায় থেকে কাল সন্ধ্যা নাগাদ দু’জনে রওয়ানা হবো সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বান্দরবানের থানচির দিকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ২৫০ কিলোমিটার একটানা চলেছি, ভাবা যায়? এরপর কাল আবার ২১৭ কিলোমিটার দূরে থানচি যাওয়ার কথা দু’চাকায় চেপে। থানচি আদৌ যেতে পেরেছি কি-না, নাকি করোনায় ঘরবন্দী হয়ে গেছি সেসব গল্প আরেকদিন।
এখন সাইকেল বাবার যে অবস্থা তার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে, সার্ভিসিংয়ের দোকানে দিতে হবে। গায়ের জামাগুলো ভিজে একসা, ধুয়ে দিতে হবে। অনেক কাজ। অথচ এখন আমার কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করছে না, চোখে ঘুম নেবে আসছে, রাজ্যির ঘুম।
মা যেন মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গাইছে—

খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে,
পান ফুরালো নুন ফুরালো খাজনার উপায় কী,
আর ক’টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।

মা, তুমি গান গাইতে থাকো, তোমার ছেলে ঘুমাক, একটানা তিন দিন প্যাডেল চাপতে চাপতে ক্লান্ত মা।

Facebook Comments