দক্ষিণবঙ্গের দিনগুলো

প্রস্তুতি
অনুভূতিজুড়ে পাহাড়ের কাল্পনিক ঘ্রাণ। সাধারণত যা বাতাসে ছড়ায়। ঘাণেন্দ্রিয়ে সেটার বাস্তব স্পর্শ নিতে আমরা বের হই। সঙ্গীরা একপ্রকার মশকরা করে গন্তব্য সিলেট বলে বলে আমাকে ক্ষান্ত রেখেছে। আমি বুঝতে পারি—তাদের রহস্যময় আলাপসালাপ, হাসিতে ছলনার স্পষ্ট আভাস। তবুও পথচলার সাথী হই।

তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। শেষরাতের প্রথম প্রহরে আমরা। অবশ্য প্রস্তুতিপর্বটাই যা দেরি। তারপর নীরবতা ভেদ করে বাসার সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসি আমরা চারজন। একরকম চাপা হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে আমাদের মাঝে। রাতে সবাই যখন কাঁথামুড়ে আরাম করছে, আমরা সেসব উপেক্ষা করে পথের ব্যগ্রতা দেখতে বেরিয়েছি। কী শীত আর কি-ই-বা ভয়—আমাদের তারুণ্য সবকিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে যেন।

এখন আমরা ‘ধোলাইপাড়’। আমাদের বাসা থেকে এ জায়গাটা খুব কাছাকাছি ছিল। কিন্তু অকারণে আমরা চৌরাস্তা হয়ে সেখানে পৌঁছালাম। চৌরাস্তা থেকে ধোলাইপাড় যাওয়ার সময় প্রথমবারের মতো জানতে পারি আমাদের গন্তব্য খুলনা। খুলনা কীভাবে যেতে হয় সে পথঘাট আমি জানি না, মাহমুদ ভাই বললেন মাওয়াঘাট মারফত গোপালগঞ্জের উপর দিয়ে যেতে হবে। এতক্ষণে ধোলাইপাড় যাওয়ার রহস্য বুঝে আসল, কিন্তু আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মুমতাজীর দিকে—‘এই মেয়া, আপনে না কইলেন আমরা সিলেট যাইতাসি।’

এ লোক বড় বিদঘুটে, সবকিছুতে চমক রাখতে চায়। জানতে চাইলেই—‘আরে মেয়া, আগে আসেন তো, গেলেই দেখতে পারবেন।’ এটাইপ কিছু একটা বলে বিষয়টাকে আরও রহস্যময় করে তোলে। আমার যদিওবা রহস্য পছন্দ তবে বিশেষ কিছু জায়গায় ঢের বিরক্তি লাগে। সেসময়ের জন্য মুমতাজী আমার সবচে বড় বিরক্তিভাজন। এরইমাঝে তার চাতুরালি জবাব— ‘খুলনা হয়েই সিলেটে যাব আমরা।’ পরবর্তী জিজ্ঞাসার আগেই মাহমুদ ভাই ‘স্বঘোষিত বিশ্বকবি’ রোদ্দুর রায়ের ভাইরাল গানের লাইন ভাজতে শুরু করলেন। সুরের ছন্দ কাজ করছিল নাকি হঠাৎ সফরের আনন্দ; ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে ফাহাদের মতো লোককে গলা মিশাতে দেখে সফরের আনন্দটাই প্রধান মনে হলো। হঠাৎ একটা গাড়ির শাঁ শাঁ আওয়াজ আর আমাদের সবার কণ্ঠ একাকার হয়ে গেল।

যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে/দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কী মহা লগনে/সালা চাঁদ উঠেছিল গগনে…

যেতে যেতে পথে
কোনো বাসই আসছে না। অযথা দাঁড়িয়ে আছি। পরামর্শ হলো সায়েদাবাদ পৌঁছে বাস ধরব। আবার হাঁটতে শুরু করলাম আমরা…

মালবাহী ট্রাক ছাড়া কিছুই চলছে না। ধোলাইপাড়ে প্রচণ্ড ধুলো আমরা দেখে এসেছি। এদিকে চৌরাস্তা থেকে সায়েদাবাদের রোড পুরোটাই ফ্লাইওভারের নীচে। তাই ধুলো ময়লার ছড়াছড়ি বেশ। একটা সিএনজি গেলেও নাক চাপা দিতে হয়। নানা আলাপসালাপের অবতারণা হচ্ছে আমাদের মাঝে; যেগুলোর শুরু শেষ কোনোটাই নেই। চারজন চাররকমের বিষয় সামনে আনে। প্রতিটি বিষয়ই আমাদের চলার মতোই অস্থায়ী ও গতিশীল। হঠাৎ কেউ ধরতে চাইলেও তার নিজস্ব অনুভূতিগুলো সেটাকে তাড়িয়ে দেয়। আর রাতের আকাশ, রাতের ঢাকা—এক অন্যরকম অনুভূতির মিশ্র সৃষ্টি।

ল্যাম্পপোস্টের আলোতে নৈশ-ঢাকা যেন নববধূর সোনালী সাজের মোহিনী রূপ আবার কখনও গ্রাম্য বিধবার শাদা কাপড়ের থানের মতো। কিন্তু সবকিছু অস্পষ্ট। মানুষের তৈরি কৃত্রিম আলো স্রষ্টার তৈরি সূর্যকে টপকাবার সাহস করে না। এ যে বিদ্যুতালো, রাতের আঁধার দূর করতে মানুষ তার এ আবিষ্কারকে সহায়ক হিশেবে নেয়। অথচ মহান আল্লাহও রাতের জন্য চাঁদ তৈরি করেছেন। কিন্তু চান্নিপসর কী অপূর্ব! নবীন কুমারী প্রেয়সীর আলতু স্পর্শের মতো তুলতুলে আর কী মোলায়েম! অন্যদিকে বৈদ্যুতিক আলো নিষ্ঠুর খরখরে, যেন জোরপূর্বক কেউ তাকে বর্ষণ করছে!

শীত তেমন লাগছে না, আবার শীত যে নেই তাও না। বরং আমাদের অবিরাম হাঁটা ক্রমশই শরীরে একরকম উঞ্চতা সৃষ্টি করছে। এদিকে শীতবস্ত্রের বাইরে থাকা আমার হাত-পা শীতল, যেন একটুকরো বরফ। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে একজায়গায় আগুন জ্বালানো দেখলাম। কড়ি ও কুড়ানো কাগজগুলোতে এখনও টিপটিপ জ্বলছে আগুন। আর কিছু উত্তপ্ত কয়লা। হয়তো আগুন পোহানো শেষে এইমাত্র কেউ উঠে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে হাতগুলো মেলে ধরলাম। সম্ভবত মাহমুদ ভাইও যোগ দিয়েছিল আমার সাথে। বাকিদের দূরে চলে যেতে দেখে আমরাও হাঁটা দিই।

সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড। ইঞ্জিনের কোনো সারাশব্দ নেই। তারমানে এখন কোনো বাস চলবে না। কিছু কাউন্টার খোলা দেখা যায়। রাত এখন সাড়ে তিনটার উপরে। খবর নিয়ে জানা গেল এমুহূর্তে খুলনার কোনো বাস নেই। ফজরের আগে পাওয়া যাবে। এবার গুলিস্তানের পথে। ওখান থেকে নাকি সরাসরি গাড়ি খুলনায় পৌঁছে দেবে।

হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তি এসে গেছে। কেমন বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। আরে কখন পৌঁছাব কখন পৌঁছাব করছি। হঠাৎ চা বিরতির জন্য দাঁড়ালাম। রাস্তার পাশে টং দোকান। উনুনে রাখা কেতলি থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। খালি বেঞ্চিগুলো এখন আমাদের দখলে। পানি খাওয়ার পর মামা চা দিলেন। চায়ের প্রতিটা চুমুকে যেন ক্লান্তিগুলো ঝরে যাচ্ছিল। হঠাৎ শরীরটা পাতলা লাগছে। হারিয়ে যাওয়া উদ্যমতা ফিরে এসেছে আবার। চা-পানের পাঠ চুকিয়ে আবারও নেমে এলাম রাস্তায়।

* * *

যাত্রীদের বিশ্রামাগারে বসে আছি। ভাগ্যিস প্রথমেই যে বাস যাবে সেটার টিকিট পেয়ে যাই। সবাই বসে আছে। আমাদের মতো আরও কিছু যাত্রী ছিল, খুব বেশি না। সর্বসাকুল্যে আমরা সহ ১০-১২ জন। বসে বসে ঝিমুচ্ছে, গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে, কেউ মোবাইল টিপছে। ওপাশের চেয়ারে এক দম্পতির দেখা পেলাম—স্বামী স্ত্রী দুজনেই একজন আরেকজনের উপর হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। কী রোমান্টিক সুদৃশ্য। এসবই হালকা আলোয় আমার দেখা। হঠাৎ কোথাও কোনো মসজিদের মাইকের আওয়াজ শুনতে পেলাম, কিন্তু ঘড়িতে এখনও ফজরের ওয়াক্ত হবার বাকি। এসময় হেলপারের ডাক, একটা বাসের নম্বর বলে যাত্রীদের আসতে বলল। আমরা ছাড়া কক্ষের সবাই ওই বাসের যাত্রী। এমনকি ওই রোমান্টিক দম্পতির দরজা দিয়ে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এ বুঝি পৃথিবীর সব প্রেম রোমান্টিকতা এখান দিয়ে চলে গেল। পুরো রুমে আমরা চারজন। কী এক নীরবতা, সবাই কেন চুপ! এরমাঝে আমাদেরও ডাক পড়ল…

কীর্তনগুলো
ওরা তিনজন পিছনের সারির পাশাপাশি সীটে। আমি থেকে গেলাম সামনে। ড্রাইভারের পেছনে। চারটা সীটের মধ্যে এটা আলাদা হওয়ায় কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাইবে না বলে আমিই এগিয়ে এলাম। তা ছাড়া ভাবনার জন্য আমার আলাদা হওয়ারও প্রয়োজন। আমি একটু একাকিত্ব অনুভব করতে চাই। এবং সামনে বাসার দরুন দুপাশের প্রকৃতি স্পষ্ট দেখতে পারব। তাদের চেয়ে বরং আমার উপভোগটাই বেশি হবে ঢের।

যানজটহীন রোড পেয়ে খুব তাড়াতাড়িই ঢাকা টু মাওয়া সড়কে পৌঁছালাম। ধোলাইপাড় থেকে এই সড়ক শুরু। ঘন্টাদুয়েক আগে যেখানে আমরা বাসের অপেক্ষায় ছিলাম অনেক্ষণ, বাসের জানালা দিয়ে সে জায়গাটা দেখে আমার মনে হলো— জীবন কত পরিবর্তনশীল! সবকিছু দ্রুতই ঘটে যায়, হারিয়ে যায় সময় আর থেকে যায় কিছু স্মৃতি, কিছু আলাপ। লক্ষ্য করলাম বাইরে কোনো কুয়াশা নেই। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশা নামবে। শাদা চাদরে ঢেকে যাবে সবকিছু। শীত ঋতুতে শহরে বহু রাত কাটিয়েছি। মাঝেমধ্যে দেখি সারারাত চলে যায়, কোনো কুয়াশা নেই, হঠাৎ ভোরের আলোর নাম ধরে কুয়াশারা ছড়িয়ে যায়। উঁচু নিচু ভবন, রাস্তা, ফ্লাইওভার, ফুটপাত সব হারিয়ে যায় কুয়াশার মাঝে। পক্ষান্তরে গ্রামে প্রতিদিনই কুয়াশা নামে। বাঁশঝাড়ে, খড়পুঞ্জিতে, গাছের পাতায়, জঙ্গলের জমাট অন্ধকারে, মাঠে, ঘাটে, তৃণলতায়—শিশিরে শিশিরে রটিয়ে দেয় শীতঋতুর নাম।

ভোরের সফেদ আলো। নিষ্কলুষ পৃথিবীর বুক চিড়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বাস। নির্মাণাধীন সম্পূর্ণ নতুন পথ। মাওয়া পৌঁছাতে আরেকটু বাকি। দেখতে দেখতে আমরা নেমে গেলাম। যেহেতু আমরা সরাসরি খুলনার টিকেট কেটেছি তাই কোম্পানির কনটাক্ট করা লঞ্চে উঠতে হবে। হেলপার যাত্রীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তখনই শুনলাম ওপারে আরেক বাস খুলনা পর্যন্ত আমাদের কভার করবে। হঠাৎ কেন জানি মনে হলো—কোম্পানির ব্যবস্থাপনা চমৎকার। আসলেই চমৎকার। যাত্রীদের সাথে তাদের সৌজন্যমূলক আচরণ প্রশংসার দাবি রাখে।

সাতসকালের উদ্ভাসিত নীরবতা ভেঙে নদীজলে সাঁতার কাটছে এক জমাট কোলাহল। আমরা সোজাসুজি ছাদে গিয়ে লঞ্চের পেছনে গিয়েছিলাম। অবশ্য নির্দিষ্ট একজনকে অনুসরণ করলে যা হয় আরকি। যাকে অনুসরণ করছিলাম, তার হাজতের প্রয়োজন পরে, আর তাই লঞ্চের পেছন দিকে থাকা বাথরুমের কাছে গিয়ে সে ক্ষান্ত হয়। হঠাৎ সেখানেই থেমে যেতে হয় আমাদের। দেখি ইঞ্জিনরুম ভেদ করে বেরিয়ে আসা একটা লম্বা লোহার পাইপ দিয়ে ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। ঘনকালো, যেন পুড়ে যাওয়া ছাই উড়ে যাচ্ছে পূর্বদিকে। নিচের দিকে নেমে গেছে তক্তার সিঁড়ি। ঝুঁকে দেখলাম রহস্যময় ইঞ্জিনের পাতালঘর। ভটভট ভড়ভড় আওয়াজ তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পরেছে চারদিক।

চারদিকের সমানতালের পানিতে ছোট ছোট ঢেউ, একটা আরেকটার সাথে ধাক্কা লেগে অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করছে। যেন নদীর স্তন জেগে উঠে আবার মিলিয়ে যায়।
আমাদের ডাক পড়ল। ফাহাদ, মুমতাজী ও আমি একটা পাতালঘরে নেমে এলাম। ভাজা তেল, ইলিশভাজা ও পেঁয়াজ-রসুনের কাঁচাপাকা গন্ধ, রান্নার গরম বাষ্পের সাথে মিলেমিশে একাকার। মাহমুদ ভাই কড়াইয়ের উপর মশলামাখা ইলিশ দেখিয়ে বলল—’কোনটা খাবে?’ আমি কোনটা রেখে কোনটা খাব, মন চাচ্ছে সবগুলোই খেয়ে ফেলি—একটা লেজের টুকরা দেখালাম। সাথেসাথেই তেলে ছেড়ে মচমচে করে ভাজা হলো। এভাবে খাওয়াটা আমার কাছে নতুন। ব্যাপারটা খুবই উপভোগ্য ছিল। এক প্লেট শাদা ভাতে এক চামচ তরতরে ডাল, দুটো কচকচে শুকনো মরিচ আর ইলিশের লেজের টুকরা ভাজা। ওরা ভাত কম দেয় অথচ খাবারে আমার তৎক্ষণাৎ আগ্রহ আরও বেশি দাবি করছিল। চুপচাপ খেয়ে গেলাম, পরে দ্বিতীয়বারে ভাত নিয়ে উদরপূর্তি করি।

ভাগ্যিস কেউ দেখেনি আমি ছাড়া। এক হাস্যকর কাণ্ড ঘটে গেল ইতোমধ্যে। হাস্যকর এজন্য—যত না দ্রুত পিচ্ছিল খেয়ে পড়েছিল তারচেও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যেন এখানে কিছুই হয়নি, কেউ দেখেনি। আমি এটা উল্লেখ করতেই ঝটপট জবাব—এটাও একটা অ্যাডভাঞ্চার। হাসতে হাসতে লুটোপুটি হবার উপক্রম। দুষ্টুমি করে ব্যাপারটা ফেসবুকে প্রকাশ করে দিলাম—‘ঘুরতে এসে লঞ্চে পা পিছলে পড়ে বলে—এটাও একটা অ্যাডভাঞ্চার।’ এটা সেই রহস্যপ্রেমী মুমতাজীর কাণ্ড।

আবারও লঞ্চের ছাদে। প্রচুর বাতাস বইছে। শালটা ভালোকরে শরীরে জড়ালাম। পূবাকাশে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। নদীজল রৌপ্যবাদামি। লঞ্চের মৃদু দুলুনি ও জলের একধরনের আওয়াজ; আমি যেকোনো শব্দের সাথে সেটাকে মিলাতে পারছি। মনে হচ্ছে কুয়াশা কেটে গেছে । দূরে নদীর মাঝখানে একটা দৈত্যাকার ক্যারেঙ। দেখতে দেখতে নদীর বড়সড় একটা বাঁক পেরিয়ে এলাম, অথচ কেউই বুঝতে পারল না। দুপাশে ভাঙা পাড়। এ নদীর নাম পদ্মা। পদ্মার তীরদেশের বহু দূরে মানুষের বসবাস। জোয়ারভাটা হলে পদ্মাপাড়ে কেউ থাকতে পারে না। প্রতিবছরই নাকি পদ্মা এরকম আগ্রাসন চালায়। কী নিষ্ঠুর নিয়তি তীরে বসবাসকারীদের। হঠাৎ দিলের গভীরটা তাদের জন্য চিনচিন করে উঠে। ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন সুদীর্ঘ পদ্মাসেতুর নিচ দিয়ে ভেসে গেলাম। দুদিকেই তাকিয়ে দেখি এ উড়ালসেতু যেন দিগন্ত ভেঙে মিশে গিয়েছে সদূর…

কাঠালবাড়ি ঘাট
এর আগে আবিদ ভাইয়ের সাথে প্রথম সফর করেছিলাম গোপালগঞ্জ। তখন এ ঘাটে মাওয়া থেকে এভাবেই লঞ্চ দিয়ে এসেছিলাম। দূর থেকে অনেকগুলো লঞ্চ, নৌকা, স্পীডবোট বাঁধা দেখতে পাই। আর এক ধরনের বিশেষ সাইরেনের আওয়াজ—এখনি লঞ্চ ছেড়ে যাবে—এমনই সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি দৌড়ঝাঁপ তো আছেই। আমাদের লঞ্চ যতই সামনে যাচ্ছে আমরা কাঠালবাড়ির সবকিছু ততই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।

পথের দ্বিতীয় পরিবেশনা
‘টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস’ নড়ে উঠেছে। আমরা ইতোমধ্যে ঘাটের স্ট্যান্ড ছেড়ে সড়কে উঠে এসেছি। সুবিশাল সড়ক। ঢাকার ভেতরও এত বড় ও সুন্দর সড়ক নেই। সামনে একটা টানেল। টানেলের ভিতরে বাস ঢুকতেই কিছু কল্পনা আমায় খুবলে ধরল। অনুপম রয়ের সেই গানটা—ফিরে গেছে কত/বোবা টানেলের গলা ছিড়ে আলো/ইচ্ছেরা ছুটে চলে…

খুব মনে পড়ছে। হঠাৎ মুখে ভাঁজতে শুরু করলাম। এসব গানের সুরে একরকম মাদকীয় ভাব আছে। গাইলে কিম্বা শুনলে বুকের ভেতর কোথাও চিনচিনে ব্যথা অনুভব করি। প্রথমে কারণ খুঁজে পাই না কেন এমনটা হয়! কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয় একাকিত্বের চাহিদা এটা। আসলে আমাদের এ বয়সটাই চাহিদার। যদি এটা হতো কিম্বা হলে আরেকটু হওয়ার দরকার ছিল ইত্যাদি নানা চাহিদা। ইচ্ছে হলো দেখি ওরা কী করছে! ওদেরও কী এ গানটা মনে পড়েছে? না হলে জোরে ডেকে বলে দিই—ওরাও একটু অনুভব করুক। সুর তুলে তুলে আমার মতো কলি ভাঁজুক।

বাসে প্রায় সবাই ঘুমোচ্ছে। চালক বয়সে জোয়ান। পিঠানো শরীর, দেখতে মনে হয় নিয়মিত শরীরচর্চা করে। জিমে যায়। হরিণের মতো হুঁশিয়ার। খুব যত্নের সাথে গাড়ি চালাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম, এই কোম্পানির অন্যকোনো বাস আসতে দেখলেই একরকম বিশেষ কায়দায় সালাম জানায়। জিনিসটা আমাকে চমৎকৃত করল। আমার পেছনের সারিতে এক দম্পতির আসন। ওরা শুরু থেকেই ঘুমোচ্ছে। আশপাশে সবার ঘুম দেখে আমারও ঘুমানোর ইচ্ছে হলো। কিন্তু চেয়ারে বসে আরামসে ঘুমানো যায় না। তা ছাড়া এতক্ষণে রাস্তার ক্লান্তি ধরে বসেছে। হঠাৎ ইচ্ছে করেই চোখ বুজলাম…

খুলনায় আমরা ও আমাদের গল্পগুলো
সকাল আটটার দিকে কাঠালবাড়ি থেকে বাসে উঠি। এখন বেলা এগারোটা প্রায়। গাড়ির গতি কমে এসেছে। ঝাঁকুনির কারণে চোখ খোলে যায়। আমরা শহরে ঢুকছি, ঢোকার পথটা খানাখন্দে ভরা। আরও কয়েকটা বাস আমাদের সামনে-পেছনে। ধুলো উড়িয়ে সিএনজি, অটোরিকশা সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। পেছন থেকে ফাহাদ, মুমতাজী ও মাহমুদ ভাই নামার প্রস্তুতি নিয়ে আমার কাছাকাছি হলেন। আমরা বাস ছেড়ে নামলাম। একটা অন্যরকম অনুভূতি খেলা করছিল আমার মাঝে। যখনই নতুন কোনো জায়গায় যাই এ মনোভাব কাজ করে আমার মাঝে।

আমরা খুলনা শহরের মাঝে হাঁটছি। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। আজ জুমাবার বলে হয়তো। দোকানপাটও কেমন দূরে দূরে। অনেক সামনে এগিয়ে গেছি। একটা অটোকে কোনো সুপার শপের সামনে নামিয়ে দিতে বললে সে একজায়গায় আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল। একরকম তর্ক জুড়ে আমাদের থেকে ডাবল ভাড়া নিয়েছে। তারপর সুপার শপের কথা বললে সে একটা রোডের দিকে ইশারা করল। হাঁটতে হাঁটতে এমন এক জায়গায় নিজেদের আবিষ্কার করলাম, যেখান থেকে আমরা ইতোপূর্বে গিয়েছি। বনি ইসরাইলের ‘ময়দানে তিহ’ -এর ঘটনার মতো চক্রাকারে ঘুরছি বলে সবাই হাসতে লাগলাম। কিন্তু অটোঅলার উপর সবাই রেগে আছে। আসলে পৃথিবীর সব জায়গায়ই এরকম অসাধু লোক থাকে। সেদিনের ঘটনা এর একটি প্রমাণ।

খুলনা বিভাগীয় শহর। কিন্তু আমরা বোধহয় মূল শহরে প্রবেশ করিনি। এখন আছি হাদিস পার্ক। এ নামে নাকরণের কারণ জানতে আমার খুব আগ্রহ। মুমতাজী আগেও একবার এখানে এসেছিল। ওর কাছে জানতে চাইলে ও কিছুই বলেনি। হাদিস পার্কের পাশ ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়ে আরেক রাস্তায় ওঠলাম। আমরা যাচ্ছি কথাসাহিত্যিক সোহেল নওরোজ ভাইয়ের বাসায়। ওই যে বললাম না, মুমতাজী সবখানে চমক দিতে চায়, এখানেও এর বিপরীত নয়। প্ল্যানিং হচ্ছে ঠিক কীভাবে সারপ্রাইজ দেওয়া যায় উনাকে। এরজন্য আমাকে সামনে ঠেলে দিলো ওরা। সবকিছু নাকি আমাকেই করতে হবে।

একটু খুলে বলি—ওরা তিনজন আড়ালে অপেক্ষা করবে। আমি ডোরবেল চেপে নিজেকে উনার একজন পাঠক বলে উপস্থাপন করব। না না এটা সুন্দর হয় না, ব্যাপারটা আরও চমকপ্রদ হতে পারে—ইত্যাদি নানা প্ল্যানিং আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি কোনোটাই। ততক্ষণে সোহেল ভাইকে কল দিলো মুমতাজী, রসেরঙের নানা আলাপ চালিয়ে আমরা এখন উনার বাসার নিচে। এবার বুঝতে পারলাম ও আরেকভাবে উনাকে চমক দিতে চায়। সম্ভবত ফোনকল কেটে গিয়েছিল, আমরা ডোরবেল চাপতেই সোহেল ভাই তো সারপ্রাইজড। সালাম দিয়ে মুসাফা সারলাম সবাই। আমি ছাড়া বাকি সবাই ওনার পূর্ব পূর্বপরিচিত। ফাহাদের ‘ইতিহাসের সোনালী আভা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের দিন অতিথি ছিলেন। মুমতাজী ও মাহমুদ ভাইর সাথে উনার ভালো সম্পর্ক।

ড্রয়িংরুমে আমাদের বসালেন। আমার কাছে না জানিয়ে আসাটা কেমন কেমন লাগছিল। কিন্তু উনার খাতির-আপ্যায়ন আলাপসালাপে সেটা ভুলেই গেলাম। কী অমায়িক আর মিষ্টিভাষী। মানুষ এত সুন্দর যত্ন নেয়! হালপুরসি জিগায়! আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দিন!
ফ্রেশ হওয়ার পর উনার ব্যক্তিগত পড়ার রুমে নিয়ে গেলেন সবাইকে। অনেক কথাবার্তা হচ্ছিল, এদিকে নামাজের সময় খুব কাছে। আমরা মুসাফির বলে উনার সাথে আর মসজিদে গেলাম না, বাসায়ই জোহর নামাজ আদায় করে নিলাম।

ইচ্ছে ছিল, দিনের বাকি সময় ঘুরাঘুরি করে রাতের গাড়িতে ঢাকায় ফিরব। আমাদের এই এরাদার কথা শুনে সোহেল ভাই নারাজ। আজ ফিরতেই দেবেন না, বললেন থেকে যেতে। কাল আমাদের নিয়ে কয়েক জায়গায় ঘুরতে যাবেন। আবার বিকেলের দিকে শহরের এদিকসেদিক ঘুরিয়ে আনবেন। এসময় দুপুরের খাবার খেলাম সবাই। ভাবির ব্যস্ততা সত্ত্বেও খাবার টেবিল প্রাচুর্য—আমাদের কৃতজ্ঞতাকে বাড়িয়ে দিলো শতগুণ। আল্লাহ উনাকে জাযা দিন!

উনার বাসার পাশ ঘেঁষে একটা নদী বয়ে গেছে অনেকদূর—ভৈরব নদী। ছাদে উঠে আমরা দেখলাম বিস্তৃত শহরের বাসভূমি, মসজিদের মিনারের চূড়া, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন ভবনের চিলেকোঠার ছাদ। নদীপথের দিগন্তজুড়ে অম্বর মিশে একাকার, হয়তো এ নদী-জল মিশেছে এরচেও বড় কোনো নদীর জলে, আর ওটার জল সাগরে সমুদ্রে অপরাজিতার মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। একটা ঘাট দেখতে পেলাম, নদীও পারাপারে ছোট ছোট নৌকা যাত্রী নিয়ে চলছে। সোহেল ভাই ওদিকে ইশারা করে বললেন চলেন আমরা ওপার থেকে ঘুরে আসি।

নদী পারাপার
টলটলে জলরাশি। ভটভট ভড়ভড় আওয়াজ ক্রমশই ভারি হয়ে উঠল। গেঁয়ো মানুষদের আলাপচারিতা ইঞ্জিনের শব্দের নিচে চাপা পড়ে গেছে। আসরের নামাজের পরে নদী এলাকার দৃশ্য দেখতে অপরূপ। খোদা তাআলা আপন সৃষ্টির মোহনীয় পরিবেশনা পেশ করেন। কজনেই বা চিন্তা করে—যে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া সূর্য শহুরে ল্যাম্পের মতোই পোস্টে ঝুলে ঝুলে আলো ছড়াচ্ছে তার আলো খুব ক্ষীণ। সারাদিন দাপিয়ে বেড়ানো আলোরাজ কীভাবে দূর্বল হয়ে গেল? কীভাবে তার রাজত্বের শেষে আঁধার নেমে সন্ধা আসে, চারদিকে ছেয়ে যায় ঘনকালো, স্তব্ধ পৃথিবীর রাতজাগা পাখিদের ভূতুড়ে ডাক, নির্মল বাতাস সবশেষে আবারও সকালের স্নিগ্ধ প্রহর, খুব কম মানুষই এগুলো নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে থাকে।

নৌকার দুপাশে যাত্রীদের বসতে হয়। এগুলোকে বলে খেয়া। অর্থাৎ যে ছোট ছোট নৌকা দিয়ে মানুষ নদী পারাপার করে থাকে। আমরা ঠিক নদীর মাঝখানে। ছোট ছোট তরঙ্গ ঢেউয়ের মিছেমিছি লুকোচুরি। আমাদের ছোট নাও সেগুলো কেটে কেটে ভেসে চলছে ওপারে। ইচ্ছে হলো আলতো ছুঁয়ে দেখি পশ্চিমে ভেসে যাওয়া মিহিজল।

নদীর পাড় হয়ে আমরা একটা হাটে উঠলাম। মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে জীবনযাপনের ভিন্নচিত্র চোখে পড়ল। কী সাদামাটা দৃশ্যপট। নদীর ওপারে শহর এপারে গ্রাম। সোহেল ভাই কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জানি না। একটা ভ্যানে চড়লাম; ওদিকের এটা এক সুন্দর পরিবহন। আমাদের অঞ্চলে যে ভ্যান মাল বহন করে ওই অঞ্চলে সে ভ্যানগুলো যাত্রী বহন করে। অবশ্য যাত্রীবাহী ভ্যান আমাদের এদিকের মালবাহী ভ্যানের তুলনায় হালকা ছোট। আগেরবার গোপালগঞ্জের ঝটিকাসফরে এটায় উঠেছিলাম।

এটাতে পা ঝুলিয়ে বসতে হয়। আমি বসলাম পেছনে। একটা চিপাগলির মতো রাস্তা দিয়ে ভ্যান ওদিকে নিয়ে চলল। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে। যাবার পথেই আজান শুনতে পেলাম। ভেবেছিলাম অনেকদূর যেতে হবে কিন্তু হঠাৎ ভ্যান থামিয়ে দেওয়া হয়। সম্ভবত সেটা কোনো কলেজ ছিল এখন ঠিক মনে পড়ছে না, তবে নদীর পাশে পাতা ইটের সাজানো বেঞ্চি, গাছের ছায়া, ধাপে ধাপ হয়ে নেমে যাওয়া জলসিঁড়ি দেখলাম। পাশেই সুন্দর একটা মসজিদ। একাংশ পানির উপরে। মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। ইমাম সাহেবের তেলাওয়াত মাশাল্লাহ। এরকম অজপাড়াগাঁয়ে সচরাচর তাজবিদ তারতিল ঠিক রেখে তেলাওয়াত আনোখা। খুব তৃপ্তির সাথে নামাজ আদায় করে বেরিয়ে আসি।

রাতের খুলনা
আসলে পৃথিবীর সবজায়গা যেমন সুন্দর, এরকম প্রতিটি রাত প্রতিটি দিনও সুন্দর। তাহলে আমরা কেন বলি আজকের রাতটা অনেক সুন্দর কিম্বা অমুক জায়গাটা সেইরকম?

এ যে প্রশ্ন ও ভাবাবেগ এগুলো সৃষ্টির কারণ, মানুষের মাঝের নতুনত্ব ও জায়গাবদল। যিনি আজকের রাতকে সুন্দর বলেছেন হয়তো তার যাপিত রাতগুলো নিয়ে আজকের মতো ভাবেননি। তা না হলে জীবনের প্রতিটি রাতই সুন্দর ও কুসুমাস্তীর্ণ পেতেন। জায়গার ব্যাপারটা একটু আলাদা। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে—প্রত্যেক নতুনই সুস্বাদু। কিন্তু সেটা পুরান হয়ে গেলে প্রথম দেখার মতো সেই উচ্ছ্বাস আর থাকে না, কিন্তু নবাগত যে কারও কাছেই সেটা অসাধারণ।

আসার পথে দুপুর বেলা যে হাদিস পার্ক দেখে এসেছিলাম, এখন সেখানে অনুষ্ঠান চলছে। ‘মুজিব শতবর্ষ উদযাপন’ উপলক্ষ্যে সরকারি ভবনগুলো আলোকবাতি দ্বারা সাজানো হয়েছে। আমরা ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছি। কখনও একসাথে কখনও জোড় বেজোড় হয়ে। সোহেল ভাই সবার সামনে। একটা টং দোকানে বসে চা খেলাম সবাই। তখনকার ফ্লেভারটা ঢাকার মতো। শীতের রাতে রাস্তার ঝিরঝিরে বাতাস, যখনই কোনো একটা গাড়ি আমাদের পেরিয়ে যাচ্ছে, নদীর ঢেউয়ের মতো বাতাসের মসলিন স্পর্শ আমাদের শরীর ছুঁয়ে যায়।

আমরা সেদিন রাতে প্রায় নয়টা তক ঘুরেছি। আরও একটা লেকপাড়ে সোহেল ভাই নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে বসেও উপভোগ করেছি জলজ হাওয়া। দূরে নদীর মাঝখানে পাঞ্জেরীর আলো, কার্গোর কর্কশ সাইরেনও শুনতে পাচ্ছিলাম। আসার পথে একজায়গায় ব্যাটমিন্টন খেলতে দেখলাম, ঢাকার মতোই রাস্তা ব্লক করে গলিতে খেলছে তারা।

রাতে গল্পের আসর বসেছে। প্রায় ঘন্টাখানেক আমি সাথে ছিলাম। কখন যে দুচোখ বুজে যায়, যখন টের পাই তখন রাত শেষ…

আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন
খুলনায় দ্বিতীয় দিন আজ। রাতে সোহেল ভাই বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ ঘুরিয়ে আনবেন বলে জানিয়েছিলেন। আমি ঠিক জানতাম না যে বাগেরহাট খুলনার কাছাকাছি অবস্থিত। আমাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুপুর তিনটের বাসে ঢাকা ফেরার কথা। হঠাৎ সফরের সময় কমিয়ে নিতে চাচ্ছিলাম। অবশ্য এর একটা কারণও ছিল। আবার—‘কতদিন হয়ে গেল ঢাকার বাইরে আমরা’ এরকম একটা ভাবনাও ভেতর ভেতরে কাজ করছিল, সেটা বলাও বলা উচিত।

তখন সকাল আটটা প্রায়, শুনলাম কুয়াশা পড়েছে বেশ। কখনও কখনও কুয়াশার মাধ্যমে আমরা শীতকে মেপে থাকি, সোহেল ভাই বলছিলেন আরেকটু অপেক্ষা করে বের হওয়া যাক। এদিকে সফরসঙ্গী মাহমুদ ভাই বাড়ি যাবেন বলে চুপচাপ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জানালেন ফেরার পথে তিনি গোপালগঞ্জ থেকে আমাদের সাথী হবেন। খুব সম্ভব উনার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ।

সকালের খাবার প্রস্তুত। সোহেল ভাই টেবিলে ডাকলেন। ভাবি হাতপাকা রাঁধুনির মতো। সুস্বাদু সব রান্নাবান্না করেন। গতকাল দুপুর ও রাতের খাবারের স্বাদ আমরা ভুলতে পারব না। সকালে খিচুড়ি রেঁধেছিলেন বোধহয়, আরও অনেক খাবারে টেবিল সাজানো ছিল। আমরা কেমন যেন নীরবতার মধ্য দিয়ে খেয়ে চলে এলাম।

শহরের অলিগলি পেরিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে একটা প্রাইভেট কার। সোহেল ভাই ভাড়ায় নিয়েছেন। ড্রাইভার উনার পূর্ব পরিচিত। বয়স্ক লোক। দেখতে সাধাসিধে মানুষ মনে হলো। ক্রমাগত আমরা সবকিছু পেছনে রেখে চলে যাচ্ছি। আশপাশে তাকিয়ে একটু চেনা চেনা লাগছে। এ রোডেই তো গতকাল খুলনা এসেছিলাম।

মহাসড়কের ব্যস্ততা বেশ। আমরা এখন রূপসাব্রিজে। ব্রিজটা অনেক বড়। গতকাল এখানেও আসার কথা বলেছিলেন সোহেলভাই। কিন্তু সময়ে কুলায়নি। গাড়ি যখন ব্রিজের উপর চলছিল মনে হল আমরা একটা পাখির উপর, ব্রিজের দুপাশে ডানার মতোই বয়ে গেছে নদী।
আমরা বেশ দূর চলে এসেছি। সামনে চৌরাস্তা, ফকিরহাট। মাহমুদ ভাই এখন আমাদের থেকে বিদায় নেবেন। ততক্ষণে কুয়াশা কেটে গেছে। আকাশে সূর্যের আলো তেজ সবখানেই। ড্রাইভার রাস্তার একপাশে গাড়ি পার্ক করলেন। মাহমুদের যাত্রা উপলক্ষ্যে চা-পর্ব চলল। সে স্মৃতিটা ক্যামেরাবন্দি করে ফেসবুকে পোস্ট করি—‘মুজিব শতবর্ষের প্রথম চা’ ক্যাপশন লাগিয়ে।

মাহমুদ ভাই চলে গেলেন, পেছনে রয়ে গেলাম আমি ফাহাদ আর মুমতাজী। সোহেল ভাইসহ আমরাও উনাকে থাকতে বলি—কী জানি কী হলো…!

গাড়ি এখন খুব গতিতে চলছে। রাস্তাও ভালো। একরকম মুখিয়ে আছি ষাটগম্বুজ মসজিদ কখন দেখব! ছোটবেলায় টাকার নোটে দেখতাম। বিএনপির আমলে পঞ্চাশ টাকার পিঠে ষাটগম্বুজ মসজিদের একটা ছবি থাকত। বর্তমান সরকার এসে সেটা পাল্টে দেয়। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম, এ যে খরচাপাতি হচ্ছে—এসবের কোনোটায় সোহেল ভাই আমাদের শরিক হতে দিচ্ছেন না। আমরা কয়েকবার চেষ্টা করেছি, উনার সে একই কথা—আপনারা আমার মেহমান।

ষাটগম্বুজের আঙিনায়
চেকিংয়ের পর ভেতরে প্রবেশ করতে দিলো আমাদের। বড়সড় গেইট হলেও একজন ঢোকার মতো ব্যবস্থা। এ সবই সিকিউরিটির জন্য। ভেতরে কোনো ব্যাগট্যাগ নেওয়া যায় না। আমরা গাড়িতেই সব রেখে এসেছি। লাল পাথুরে রাস্তা। দুপাশে বাগান। কী বিরাট মসজিদ, লাল ইট দিয়ে নির্মিত। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী—ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে খান জাহান আলী নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না। ধারণা করা হয় তিনি ১৫শ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটির মধ্যে অবস্থিত; বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে।

মসজিদের পেছনে বিরাট একটা পুষ্করিণী। পদ্মফুল ফুটে ছিল। পাড়ে পুরোনো গাছ, তার ছায়ায় পাতা বেঞ্চি। দেখলাম দর্শনার্থীদের পাশাপাশি কাপলদেরও ভিড় থাকে। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮•৫ ফুট পুরু। ষাটগম্বুজ মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা মোট ৮১টি, সাত লাইনে ১১টি করে ৭৭টি এবং চার কোণায় ৪টি মোট ৮১টি। কালের বিবর্তনে লোকমুখে ৬০ গম্বুজ বলতে বলতে ষাটগম্বুজ নামকরণ হয়ে যায়, সেই থেকে ষাটগম্বুজ নামে পরিচিত।

আমরা কিছু সময় বসলাম। হাঁটলাম, ঘুরলাম। ফটোগ্রাফি করলাম। সেদিন গ্রুপ ছবি ছাড়া আমার আলাদা কোনো ছবি তোলা হয়নি। সবাইকেই ছবি তুলে দিয়েছি, সেখানে দারুণ দারুণ কিছু ছবিও ছিল। মসজিদের প্রধান গেইটটা খুব সুন্দর। প্রাচীন স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন এটি। মসজিদের সামনে একটু দূরে একটা প্রদর্শশালা। সেখানেও গেলাম। দর্শনার্থীদের ভালোই ভিড়। প্রাচীনকালের পোড়া ইট, একটা কুমিরের কঙ্কালও ছিল, কিছু পানপাত্র, আরও নাম না জানা অনেক জিনিসপাতি।

খান জাহান আলীর মাজার
ষাটগম্বুজ মসজিদের পাশে রাস্তার এপাশে আরেকটা মসজিদ, এটা একগম্বুজ বিশিষ্ট। এ মসজিদটা আলাদা কেন ঠিক বুঝলাম না। এটা দেখে আবার গাড়িতে উঠি। পথিমধ্যে বাগেরহাট মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে যাওয়া হয়। এখানের দায়িত্বশীল একজন আমাদের প্রিয় মেজবান সোহেল নওরোজ ভাইয়ের পরিচিত। উনার মাধ্যমে এটার বিভিন্ন ল্যাবরেটরি দেখার তাওফিক হয়। কীভাবে চিংড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করে তিনি আমাদের বললেন। খুব অল্প সময়ই এখানে ছিলাম। আবার যাত্রা শুরু করি খান জাহান আলীর মাজারের উদ্দেশে।

১৩শ শতকের নামজাদা একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন খান জাহান আলী রহ.। উনার আরেক নাম উলুঘ খান। ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ধরণা করা হয় তার পুর্বপুরুষরা তুর্কিস্তান থেকে এদেশে এসেছিলেন। দিল্লির বিখ্যাত পীর শাহ নেয়ামতুল্লাহর কাছে কুরআন হাদিসের উপর বিশেষ জ্ঞান হাসেল করেছিলেন।

সৈনিক হিশেবে তার কর্মজীবনের শুরু। ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি হন। অতি অল্প সময়ে প্রধান সেনাপতি পদে উন্নিত হন। ১৩৯৪ জৈনপুর প্রদেশের জাবেতান (গভর্নর) পদ অলঙ্কৃত করেন। এভাবে পরবর্তীতে বাংলায় আক্রমণ করে বাংলা দখল করেন। আর এখানেই তার স্থায়ী নিবাস গড়ে ওঠে।

আমাদের গাড়ি একটা বড় ফটকের সামনে থেমে গেল। ফটকে লেখা হজরত খান জাহান আলী রহ. এর মাজার। বাকিপথ হেঁটে যেতে হবে। তেমন ভিড়ভাট্টা নেই। পিচঢালা রোড। আমরা নেমে হাঁটতে লাগলাম। দুপাশে দোকানের সারি। তসবি টুপি আতর আগরবাতি মোমবাতি আর কিছু বাদ্যযন্ত্রও দেখলাম। বিভিন্নরকম মালা, কাঠের রকমারি তৈজসপত্র ইত্যাদি নানান সমাহার। তখন দুপুরের আজান পড়ছে। আমরা মাজারের মেইন গেইটে।

মসজিদের মতো একটা ভবন, লাগোয়া মাঠে সমান সবুজ ঘাস। কয়েকজন মহিলা ও অর্ধনগ্ন পাগল বসে আছে। মাজার মানেই পাগলের কারখানা। কী একটা অবস্থা!

আমরা সামনে যেতে লাগলাম, ভেতরে ছোট আয়তনের জায়গা মনে হলো। সুবিশাল পুকুর। এ মাথায় ঘাট পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম—অনেক বড়! লোকমুখে নানা কেচ্ছাকাহিনি ছড়িয়ে আছে এ পুকুর নিয়ে। এখানে দুটো কুমির থাকত, এগুলোর কী যেন নামও আছে, হাবিজাবি নানা কল্পকাহিনি। আমরা বেশি সময় অপেক্ষা করিনি। ফিরতি পথে নামলাম।

আবারও খুলনা শহরে। বাসায় যেতে রাজি না হওয়ায় রেস্টুরেন্টেই দুপুরের আহারপর্ব শেষ করালেন সোহেল নওরোজ ভাই। তিনটার বাস ফেইল করেছি। ফেরার পথে খুলনা ইউনিভার্সিটিও ঘুরিয়ে আনেন। এবং বিভাগীয় মার্কাজ মসজিদে জোহর আদায় করি।

ফেরা
এত রাতে নদীপথে ফেরির সিরিয়াল দেখে বিস্মিত হই। সবগুলো মাঝ নদীতে দাঁড়িয়ে আছে, যেমনই ঢাকার গুলিস্তানে বাস-ট্রাক যানযটের ধরুন দাঁড়িয়ে থাকে। বিস্ময় ঘোরে মুখ থেকে বেরিয়ে যায়—এরে, নদীপথেও বুঝি জ্যাম হয়! আমার কথা শুনে এক ভদ্রলোক জানালেন, হঠাৎ নাকি চর জেগে উঠায় একটা ফেরি আটকা পরেছে। এমনিতেই অনেক বিলম্ব হয়েছে, এতক্ষণে বাসায় পৌঁছে ঘুমোনোর কথা।

বাগেরহাট থেকে ফিরতে বিলম্ব হওয়াই সন্ধার গাড়িতে উঠি। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস আমাদের নিয়ে ছুটে চলে কাঠালবাড়ির উদ্দেশে। তখন রাত সাড়ে আটটা বাজে। আমরা ভালো জায়গায়ই সীট পেলাম। ইচ্ছে করেই ঘুমোনোর চেষ্টা করছি। অনেক সময় ঘুমোলুম। এর ভেতরে গাড়ি কত জায়গা ঘুরে এসেছে! বাইরে দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রচুর কুয়াশা পড়েছে। হঠাৎ গাড়ির গতি কমে এলো। ড্রাইভার কুয়াশার কারণে কিছুই দেখতে পারছে না। পাওয়ারফুল হেডলাইটের শক্তি আজ বুঝে এলো, বাসের সামনে সর্বোচ্চ বিশ হাত তক দেখা যায়। অথচ এ লাইট কুয়াশাহীন সময়ে কত দূর আলোকিত করে! আমার ঘুম ভেঙে যায়। আস্তে আস্তে এভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক এসে একজায়গায় থামল। হেলপার এসে জানালেন, কুয়াশার কারণে ফেরি পারাপার বন্ধ, তাই আপাতত বাসেই অবস্থান করতে হবে।

এটা কোন জায়গায় এসে থামল আল্লাই ভালো জানেন। ফাহাদ ছিল কি না মনে নেই, তবে মুমতাজী আর আমি হেঁটে হেঁটে একটু সামনে যাই। পরবর্তীতে ফাহাদও বোধহয় নামে। একজায়গায় বসি, আলাপ করি। খুব শীত। বাতাস তো বটেই। সে জাগায় কয়েকটা হোটেল ছিল, দেদারসে ভাঁপ-ওঠা বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে। আমাদের মতো আরও কয়েকটা বাস অপেক্ষা করছে।

সারে তিনটার দিকে হেলপারের ডাক শুনা যায়। তারপরই ফেরিতে উঠি।

এখনও আমাদের ফেরিটা দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড বাতাস, আমার গরম কাপড় বলতে একটা পাতলা চাদর। কিন্তু এটার ফাঁকফোকর খোঁজে বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি কাঁপছি। কিন্তু কেন যেন ভাল্লাগছে। আমাদের ফেরিটা বেশ বড়। অনেক যানবাহনের পাশাপাশি প্রচুর যাত্রীও নিয়েছে। ডাবল ইঞ্জিনের গগনবিদারী আওয়াজ। আমরা তিন তলায়। একটা ছোট্ট ফেরি আমাদের পেরিয়ে যেতে চাইলে চালকের বরাবর সাইরেন বাজানোতে আর সাহস করেনি। আলহামদুলিল্লাহ জট খোলে গেছে। যে ফেরিটা আটকা পরেছিল ওটা ধীরলয়ে এগুচ্ছে। আমারা ওটা পেরিয়ে এসেছি। এখন অনেকদূর!

ভোর সকাল। বাস চলছে ঝড়ের বেগে। ঘড়ির কাটা পৌনে সাতটায়। ঢাকা শহর ইতোমধ্যে জেগে উঠেছে। আমরা ধোলাইপাড় এসে নামলাম।

Facebook Comments