খৈয়াছড়া ঝরনা: জল হয়ে ঝরছে পাহাড়ের বুকফাটা কান্না

বালক বয়সে ছবির বইতে পাহাড়ের বুকে ঝরনার উচ্ছ্বাস দেখে মাকে জিগ্যেস করেছিলাম, মা, পাহাড়ের চূড়ায় পানি এল কোত্থেকে? মা বলেছিলেন, ওটা পাহাড়ের কান্না। আকাশ সবচাইতে বড়, তাই তার কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরে, পাহাড় অনেক বিস্তৃত, সে কেঁদে তার বুকে ঝরনার স্রোত বইয়ে দেয়।

মায়ের বলা সূত্রমতে, আকাশ কাঁদে, পাহাড় কাঁদে, গাছ কাঁদে, পাথর কাঁদে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছেন, গাছেদেরও প্রাণ আছে। তা হলে অবশ্যই গাছেরা কাঁদে! ছেলেবেলায় গাছে কোপ দিলে কষ দেখে ভাবতাম, ব্যথা পেয়ে গাছ কাঁদছে। চোখের পানি মুছে দেবার মতো করে সে কষ মুছে দিতাম অতি যত্নে। মানুষের কান্না মোছা যায়, গাছের কান্না মোছা যায়; কিন্তু পাহাড়ের কান্না কি মোছা যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি আমি বাংলাদেশের রূপসী ঝরনাগুলোতে। মাধবকুণ্ড, নাপিত্তাছড়া, খৈয়াছড়া, জাফলং, বিছনাকান্দি, বান্দরবন-রাঙ্গামাটির পাহাড়ে পাহাড়ে ছোটবড় ঝরনার উৎসমুখে আমি পাহাড়কে জিগ্যেস করেছি, এই যে অফুরন্ত কাঁদছ, কীসে তোমার এত দুঃখ? কীভাবে মুছে দেব তোমার চোখের জল?

প্রকৃতির বিচিত্র রূপ দেখতে আমরা সপ্তাহব্যাপী টানা ভ্রমণের শিডিউলে চট্টগ্রামের মিরসরাইতে অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝরনাও অন্তর্ভুক্ত করলাম। এর অবস্থান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ৪.২ কি.মি. পূর্ব দিকে।

আকাশের পিঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়া বড় এক পাহাড়। তার বুক ফেটে কলকল সুরের মূর্ছনা তুলে নেমে আসছে অফুরন্ত জলের ধারা। প্রকৃতিতে বইছে বুনো গন্ধ। পুচ্ছ নাচিয়ে এক গাছের ডাল থেকে উড়ে গিয়ে আরেক গাছের মগ ডালে বসে সুর তুলছে পাখিরা। আরেকটি পাখি গাছের ডাল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রজাপতির হৃৎপিণ্ডে।

এই পাহাড়ে ঝরনা তার সমস্ত জল নিয়ে একবারে নেমে যায়নি। ছোটবড় অনেক ধাপে নেমেছে। বড় ক্যাসকেডই নয়টি। এই ঝর্নালি পাহাড়ের চূড়া জয়ের লক্ষ্যে আমরা ছয়জনের কাফেলা এগিয়ে চললাম ঝিরিপথ ধরে। পাহাড়ের বুক ফেঁড়ে নেমে আসা ঝরনার শীতল জলের কোমল স্রোত পায়ে তুলছে শিরশির অনুভূতি। পাথুরে পথ। কখনো পিচ্ছিল, কোথাও ভাঙ্গা। পাথরের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে পানি পতনের কলকল ছন্দ সফরের সমস্ত ক্লান্তির অবসান ঘটিয়ে দিলো। মূল মাটি থেকে ঝরনা পর্যন্ত এই ঝিরিপথ প্রায় কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ, কিন্তু অতি রূপসী।

প্রচুর পর্যটকের কোলাহলে মুখরিত পাহাড়ের কোল। ঝরনার সুর কল্লোলে, পাখিদের কলরবে, মানুষের কোলাহলে অপূর্ব খৈয়াছড়া সারাক্ষণ উৎসবমুখর হয়ে আছে।

ঝরনাটা নয়টি বড় ধাপের বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মেছে বলতে হয়। (কারও হিসাবে সাতটা।) প্রথম ধাপ সমতলের কাছাকাছি। পর্যটকদের কোলাহল এখানেই বেশি। প্রথম তিনটি ক্যাসকেড জয় করা মোটামুটি সহজ, কিন্তু আসল সৌন্দর্য রোমাঞ্চ এডভেঞ্চার এর পরেই; পাহাড়ের চূড়ায়। আমরা পাহাড়ের শরীর বেয়ে ঘাড় বেয়ে উঠে চললাম তার মাথার দিকে। শাঙনের সাঁঝে যেখানে মেঘেরা খেলা করে বুনো ঘাসের ডগায়।

সে কী এডভেঞ্চার! প্রথমে পাথুরে পথ, তারপর কখনো খাড়া ঢাল, কখনো খাঁজকাঁটা, এবড়ো-খেবড়ো ও ক্ষতবিক্ষত পথ। একেবারে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইনের ‘দুর্গম গিরি’। উঠতে হয় দড়ি বেয়ে, লাঠিতে ভর ঠেকে, গাছের শেকড়ে ঝুলে ঝুলে। পা ফেলতে হয় খুব সাবধানে; সরু এবং সঙ্কীর্ণ পথ। পা হড়কে গেলেই জীবন নাশ।

পাহাড়ের উপর পাহাড়। ঝরনার পর ঝরনা। প্রতিটি ক্যাস্টেডকে একেকটি স্বতন্ত্র ঝরনা বলা যায়। যত উপরে যাই, সৌন্দর্য পিয়াসুদের সংখ্যা কমে আসে। এদিকে উঠার পথ নেই। বলতে গেলে একদম খাড়া পাহাড়। গাছের শিকড়-বাকড় লতা ডাল ধরে বেয়ে রিস্ক নিয়ে উঠতে হয়। সবাই অত দূর যাবার শ্রম করতে পারে না। এই পর্বত জয় করতে শ্রম দুঃসাহস আত্মবিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতার কিংবা অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গ প্রয়োজন। সবার ভেতর এসব গুণের সমন্বয় নেই। কেউ পঞ্চম কেউ ষষ্ঠ ক্যাসকেড পর্যন্ত উঠতে পারছে। দুঃসাহসী এবং নিজের সম্বন্ধে যাদের কনফিডেন্স আছে, তারা উঠছে। অনেকে সেখান থেকে গোসল করে ভেজা শরীরে নামছে। তাদের পরনের কাপড় চুইয়ে পানি পড়ে পাহাড়ি মাটি পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে। এতে তাদেরও নামতে গিয়ে পড়ে যাবার ঝুঁকি বাড়ছে, যারা নিচ থেকে উঠে আসছে, তাদেরও ঝুঁকি নিয়ে উঠতে হচ্ছে। পাহাড়ের খাড়া ঢাল থেকে পিচ্ছিল পথে পা হড়কে গেলেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। আমরা উঠতে লাগলাম। যেখানে গিয়ে দেখি আর পথ নেই, সেখানে গিয়েই তবে আমরা যাত্রায় ক্ষ্যান্ত দিই। সে কী এডভেঞ্চার, দুর্গম গিরিতে নতুন সঙ্গী নিয়ে ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা!

এখান থেকে চারপাশ গভীর অরণ্য দেখা যায়। হাজার জাতের গাছগাছালিতে ঘন অটবির সেকি মোহনীয় রূপ। পাহাড়েরা ঢেউ খেলতে খেলতে মিশে গেছে দিগন্তে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রথমেই মনে পড়ল পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পর্বতকে বলেছেন ভূমির পেরেক। এই খৈয়াছড়া পাহাড়ের চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২০০ ফুট উপরে। পেরেকের মূল অংশ থাকে গভীরে, উপরে দৃশ্যমান হয় সামান্য একটু। যে পর্বতের দৃশ্যমান ১২০০ ফুট, তার শেকড় যে ভূমির কত গভীরে প্রোথিত, কল্পনা করেই হাঁপিয়ে উঠলাম। সুরা আম্বিয়ার একত্রিশ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তাআলার ইরশাদ: ‘আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যাতে পৃথিবী তাদের নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায় এবং আমি তাতে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ, যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।’ সুরা নাবার ৬-৭ নাম্বার আয়াত: ‘আমি কি করিনি ভূমিকে শয্যা আর পর্বতকে কীলক?’

ধারনা করা হয়, দুর্গম পাহাড়ের গভীর অরণ্যে এই ঝরনা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর ধরে প্রবাহিত হয়ে আসছে। জনমানবহীন ঘন জঙ্গলের কারণে আবিষ্কার হতে সময় লেগেছে। ২০১০ সালে সরকার বারৈয়াঢালা ব্লক থেকে কুণ্ডের হাট (বড়তাকিয়া) ব্লকের ২৯৩৩.৬১ হেক্টরর পাহাড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এতে খৈয়াছড়া ঝরনা জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত হয়। এরপর (ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যমতে) ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ ‘রামগড়-সীতাকুন্ড রিজার্ভ ফরেস্টের’ খৈয়াছড়া ঝরনাকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এর লক্ষ্য হলো খৈয়াছড়া ঝরনা সংরক্ষণ করা।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী ছুটে আসছে খৈয়াছড়া পাহাড়ের কোলে। সমস্ত জড়তা অবসাদ ধুয়ে ফেলছে ঝরনার স্ফটিক স্বচ্ছ জলে।

Facebook Comments