করোনাকাল

রাস্তায় আর্মি নেমেছে। গলির মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে তারা। লকডাউন অগ্রাহ্য করা মানুষদের লাঠিপেটা করে বাড়ি ফেরাচ্ছে। এই খবর এলাকায় ছড়াতেই ঘরের মানুষ রাস্তায় জড় হওয়া শুরু করেছে। আক্কাস আলীও গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় দেখেন পাশের বাড়ির আবুল তার দিকেই দৌড়ে আসছে।

‘কি ভাই এমনভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন?’ পানে খেয়ে লাল দাগ ফালানো বত্রিশটা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল আক্কাস আলী।
কপালে বেশ ঘাম জমেছে আবুলের। কপালের দিকের চুলগুলোর গোড়া ভিজে ঘাম বেয়ে মুখে নামছে। বেশ বিরক্তি নিয়ে সে-ও আক্কাস আলীকে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘আপনি এখানে কেন?’

আক্কাস আলী এবারও লাল দাঁতগুলো বের করে ফেলল। বলল, ‘শুনেছি আর্মি এসেছে এলাকায়। তাই সবার সঙ্গে আমিও আর্মি দেখতে এসেছি।’

আবুল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাদের। খুব খাতির করলো। আপনি এখানটায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা এদিকেই আসছে।’

আবুল দ্রুতপায়ে বাড়ি ফিরল। সারা দুপুর আর আক্কাস আলীর সঙ্গে তার দেখা হয়নি। বিকেলে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনটাতে ময়লা ফেলতে গিয়ে আক্কাস আলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার। সেও এসেছে ময়লা ফেলতে। আবুলকে দেখতেই বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সে। ‘মিয়া আপনারে আমি একজন ভালো মানুষ মনে করতাম আর আপনি কিনা আমারে আর্মির লাঠির বাড়ি খাওয়ালেন?’

হাসি চেপে আবুল বলল, ‘আর্মি দেখতে যাবেন আর তারা খাতির করবে না, এমনটা হতে পারে বলেন?’

‘আপনার সঙ্গে আসলেই আমার নামের প্রথম অক্ষর ছাড়া আর কোনোই মিল নেই।’ বলেই হনহন করে বাড়ির দিকে পা বাড়াল আক্কাস আলী।

আবুল হেসে উঠে বলল, ‘দিনশেষে আপনি কথাটা ঠিকই বুঝতে পারেন। এই জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।’

* * *

পরদিন সকাল হতেই খবর কানে পৌঁছালো সবার। পাশের গলির শাহজাহান মিয়ার গোলাপি রঙের চারতলা মমতাজ বেগম মঞ্জিলটা লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির তিনতলার এক ভাড়াটিয়ার শরীরে করোনা পজিটিভ এসেছে। এলাকার লোকজন খবর পাওয়ামাত্র হুমড়ি খেয়ে জড় হয়েছে বাড়িটার সামনে। আক্কাস আলীও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। লকডাউন বাড়ি দেখতে দ্রুত বের হয়ে গেল সেখানেই।

পুলিশের বাড়ি পিঠে পড়ামাত্রই বাড়ি ফিরে এলো আক্কাস আলী। মন খারাপ করে কয়েকদিন বাড়ির ভেতরেই কাটিয়ে দিলো সে। কিন্তু যখনই শুনল পাশের বাড়ির মফিজ মিয়ার শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছে, সে তার স্ত্রীকে নিয়ে মফিজ মিয়াকে দেখার উদ্দেশ্যে রাতেই হাজির হয় মফিজ মিয়ার বাড়ি। মফিজ মিয়ার পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি ফিরল। সকালে প্রশাসনের লোক এসে আক্কাস আলীর বাড়িও লকডাউন করে দিলো। এবার সে পড়েছে বেশ বিপদে।

বেশ কয়েকদিন পর লকডাউন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিললো আক্কাস আলীর। ভুলেই গেল বাহিরের করোনা পরিস্থিতি। সুযোগ পেলেই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে বের হয় রাস্তায়।

পাশের এলাকার লোকজন করোনাকালের ত্রাণ না পেয়ে আন্দোলন করতে মিছিল বের করেছে। আক্কাস আলী এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। আন্দোলন মানেই সাংবাদিকদের জড়ো হওয়া। সাংবাদিক আসা মানেই মিডিয়ার চোখে পড়ার সুযোগ। আক্কাস আলীও যোগ দেয় মিছিলে।

স্লোগান হলো, ‘আমাদের প্রাপ্য কেড়ে নিতে পারবে না
মনে রেখ, করোনা তোমাদের ছাড়বে না, ছাড়বে না।’

কাশেম টিভির এক সাংবাদিকের চোখে পড়ে গেল আক্কাস আলী। জনগণের পক্ষে বেশকিছু কথা বলে হাসিখুশি বিদায় নিল আক্কাস আলী। আজ তাকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যাবে ভাবতেই খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল সে।

বেশ কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় খবর এলো পাশের বাড়ির আবুলের শরীরে করোনা পজিটিভ। খবরটা শুনে বেশ ঘাবড়ে যান আক্কাস আলী। কেননা গতকালও তার বাসায় একসঙ্গে চা খেতে খেতে বেশ সময় কাটিয়েছে আক্কাস আলী। আতঙ্ক নিয়ে পরদিনই সে এক বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করতে চলে যায়। পরীক্ষাশেষে বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতে থাকে ফলাফল পাওয়ার। অল্প কয়েকদিন বাদেই জানা যায় আক্কাস আলীও করোনার রোগী।

ডাক্তারের পরামর্শেই ভর্তি হয়ে যায় হাসপাতালে। দুইদিন ভয়ে ভয়ে হাসপাতালে কাটিয়ে দিলো। হঠাৎ প্রশাসনের লোকজন এসে জমা হলো হাসপাতালে। আসল খবর বের হয়ে যায় মুহুর্তেই, এই হাসপাতালের ডাক্তাররা ভুয়া করোনা পজিটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে সুস্থ মানুষদের ভর্তি করে টাকা আদায়ের ফন্দি করেন। আক্কাস আলী তবু নিশ্চিন্ত হতে পারেন না।

আবুলের পরামর্শে এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় আক্কাস আলী। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানা যায় আক্কাস আলী সুস্থ মানুষ। তার শরীরে কোনোধরনের করোনার ভাইরাস পাওয়া যায়নি। বেশ খুশি হলো সে। বাজার ঘুরে একটা মিষ্টির দোকান খোলা পেল। বেশ দাম দিতে হলেও মিষ্টি নিয়েই বাড়ি ফিরল।

পরেরদিনই খবর আসে যে ডাক্তার তাকে নিশ্চিন্ত করেছেন, সেই ডাক্তারের নিজের শরীরেই করোনা পজিটিভ। শরীরে করোনা নিয়েই সে এভাবে লোকেদের ঠকিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ভুলভাল রিপোর্ট দিয়ে ব্যাবসা করে যাচ্ছে প্রতিদিন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে এবং পূর্বের হাসপাতালটার মতো তার চেম্বারটাও সিলগালা করে দিয়েছে।

খবরটা শোনামাত্র দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না আক্কাস আলী। আবুলের উপর বেশ রাগ জমলো তার। খোঁজখবর নিয়ে একটা সরকারি হাসপাতালে এবার গেল পরীক্ষা করতে। বাড়িতে এসে দিন গুনতে রইল রিপোর্ট পাওয়ার।

সাত দিন পর আক্কাস আলীকে ফোনকলে জানানো হয় তার করোনা পজিটিভ। প্রশাসনের লোক তাকে ফোন করে ঠিকানা জানতে চাইল। আক্কাস আলী ঠিকানা দিলে তারা জানাল তারা আসছে এখনই।

আক্কাস আলী প্রশাসনের লোক আসার খবর শুনে ভুলেই গেল নিজের শরীরে বহন করা ভাইরাসের কথা। অতিথি আপ্যায়ন করার মতো করেই বাড়িতে খাবার প্রস্তুত করতে লাগল প্রশাসনের লোকেদের জন্য।

সে বাড়ির বাহিরে রাস্তার ধারে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল প্রশাসনের লোক আসবে বলে।

ঠিক এমন সময় গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল প্রশাসনের লোকেরা। আক্কাস আলীকে দেখে তারা এগিয়ে এলো।

রাগত্বস্বরে একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার মুখে মাস্ক কই?’

পানের লাল দাগ ফালানো বত্রিশটা দাঁত বের করে আক্কাস আলী উত্তর দিলো, ‘স্যার, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুলে বাড়ি ফেলে এসেছি।’
‘এভাবে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছেন কেন? জানেন না এলাকার অবস্থা এখন ভালো নয়?’

পাশ থেকে আরেকজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি বলতে পারবেন আক্কাস আলীর বাড়িটা কোথায়?’

আক্কাস আলী দাঁত কেলিয়ে বলল, ‘আমিই তো আক্কাস আলী। আপনারা আসবেন বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি যাতে বাড়ি চিনতে ভুল না করেন।’

আক্কাস আলীর কথা শেষ হতেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা একে অপরের দিকে হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তারপর আক্কাস আলী মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আক্কাস আলী হাসিমুখ করেই বলল, ‘চলুন আপনারা, বাড়ির ভেতরে। আমার স্ত্রী আপনাদের জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করেছে।’

প্রশাসন কর্মকর্তাদের একজন বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, ‘করোনাকালে আরও কত কিছুই না দেখতে হয় কে জানে!’

Facebook Comments