এক অকুতোভয় যোদ্ধার সাম্রাজ্য-রচনা

ডিজাইন : সমীকরণ

উসমানি সাম্রাজ্য—দীর্ঘ ছয় শতাধিককাল এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত অত্যন্ত প্রতাপশালী একটি শাসনব্যবস্থা। যে সাম্রাজ্যের বীজ বপন করেছিলেন ইতিহাসের এক কিংবদন্তী পুরুষ; তিনিই আরতুগরুল গাজি
উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজি হলেও এই বিশাল যুগান্তকারী সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা নেতাই হলেন আমাদের আজকের গল্পের নায়ক।
১৪৫৩ সালের আগপর্যন্ত এ সাম্রাজ্যের উত্থান নিয়ে বিশ্বে তেমন আলোড়ন-আলোচনা ছিল না বললেই চলে। সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহের কনসটানটিনোপল বিজয়ের জয়ধ্বনি বেজে উঠতেই বিশ্ববাসী যেন একটু নড়েচড়ে বসল।
সুগুতের ছোট জায়গির। এটা সেই স্থান, যেখান থেকে এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের বিকাশ। যার স্থায়িত্ব ছয়শত বছরের অধিক। তার ইতিহাস নেহাৎই চমকপ্রদ, রোমাঞ্চকর নয় তা কি হয়? যাযাবর কায়ি গোত্রের তাবুর মধ্য থেকে এমন এক রোশনাই উদ্ভাসিত হবে তা-ই বা কে জানত!
মোঙ্গলদের বর্বরতা, উগ্রতা আর ত্রাসের রাজ্যে মুসলমানদের নাম ও নিশানা যখন মিটেই যাচ্ছিল, মুখ থুবড়ে পড়ছিল, একের পর এক মুসলমানদের সালতানাত ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ার যবনিকা প্রান্তরে, ঠিক তখনই আনাতোলিয়ার ছোট গ্রামে জেগে উঠলেন এক ক্ষিপ্র যুবক।
কিন্তু মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি? স্বগোত্রীয় তো বটেই, মুসলমানদের খেলাফত ব্যবস্থার ঝান্ডা ধরে রাখলেন যিনি সগৌরবে, সেলজুকদের রাশ টেনে ধরলেন যিনি, সেই আরতুগরুল গাজিকে ইতিহাস কী বলে?
চলুন জেনে নিই বইয়ের সারসংক্ষেপ।

সংক্ষেপে বইয়ের বিষয়বস্তু
ইতিহাসনির্ভর জীবনীগ্রন্থ যেহেতু, তাই বইটির মূল কেন্দ্রবিন্দু আরতুগরুল গাজি। কায়ি গোত্রের সুগুত রাজ্য নিয়ে আগেই বলেছি। আর তা ছিল বর্তমান তুরস্কের বিলেচিক প্রদেশে। অর্থাৎ বিলেচিক প্রদেশকেই তৎকালীন সময়ের সুগুত বলে জানা যায়। যার নিদর্শন আজও বিদ্যমান।
একটি ভূমিকা, ছয়টি অধ্যায়, একটি পরিশিষ্ট ও উপসংহারে সাজানো বইটির শেষ উপস্থাপন যথাযোগ্য।
কায়ি গোষ্ঠী ছিল যাযাবর। তারা ছিল যোদ্ধা জাতি। তাদের পতাকার প্রতীক IYI নির্দেশ করে তা। যেখানে Y চিহ্নিত করে ধনুক এবং II চিহ্নিত করে তিরকে। আর সেই জাতি গোষ্ঠীর লড়াকু সন্তান আরতুগরুল গাজি
অবিশ্বাস্য রূপকথার গল্প মনে হলেও ইতিহাসের পাতার সোনালি-রুপোলি আলোতে চোখ মেলে দেখেনি যে নতুন প্রজন্ম, তাদের দিগন্ত বিহারে মুসলিম সেনানির হারিয়ে যাওয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বর্ণকেশর ঘোড়ায় চড়িয়ে ক্রুসেডারদের দুর্গে দাপিয়ে বেড়ানো এক টগবগে যুবকের গল্প। যা শোনাতেই বাংলা ভাষায় যার প্রথম প্রকাশ।
তুর্কি জাতির বর্ণনা থেকে কায়ি গোত্রের পরিচিতি, সেলজুক-গজনি-সামানি সাম্রাজ্য, আব্বাসি খেলাফত, বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য, মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গল আক্রমণ, এরপর আরতুগরুল গাজির আলোচনা-শেষে উসমান গাজির পরিচয় পর্ব দিয়ে উপসংহারের প্রাক্কালে এই সাম্রাজ্যের উত্থানের দিকে আলোকপাত করা হয়েছে।
১২০০ সালের শেষের দিকে আব্বাসি খেলাফত মোঙ্গলদের মারমুখে পতনের দ্বারপ্রান্তে, সেলজুকরা যখন নামেমাত্র সিংহাসনে, তখন ইসলামি সাম্রাজ্যের জন্য এশিয়া এক নরকের নাম। টিকে থাকার লড়াই তখন নিয়ে এলো বিধ্বংসী চ্যালেঞ্জ। অপ্রতিরোধ্য মোঙ্গলদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে হতবিহ্বল সকলে। দুর্দশায় ক্ষতিগ্রস্ত, পর্যদুস্ত সৈন্যহারা কায়ি গোষ্ঠী পেল এক টুকরো জমিন। যাযাবর জীবনের অবসান বদলে দিয়েছিল ইতিহাসের গতিপথ। নবশিশুর জন্মের সময় থেকে যুবক ছেড়ে প্রবীণ হওয়ার যাত্রাটা সহজ ছিল না। প্রতি পদক্ষেপে আভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর জাল কেটে বের হয়ে আসার রোমাঞ্চকর আখ্যান। তাবুর কুপির নিংড়ানো আলো যখন প্রাসাদের দেয়ালে ঝাড়বাতির মতো ঝলমলে তখন পেরিয়েছে বহু যুগ। আলোর মিছিল বয়ে নিয়ে এল কোন মশাল? জানতে হলে বইটি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে।

নিজস্ব মতামত
বইটি সাম্রাজ্যের মহান নেতা আরতুগরুল গাজির জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর আয়োজন। যদিও বইটি খুব অল্প পরিসরেই শেষ করা হয়েছে, এমনটাই লেখকের দাবি যে—ইতিহাস-বিকৃতি না ঘটিয়ে এই অবিসংবাদিত নেতার জীবনকে তুলে আনতেই পরিসর ব্যপ্তি ঘটানো হয়নি। এছাড়া বইটি পড়লে নেতার জীবনের যা কিছু আমাদের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার সবটুকু ব্যখ্যা বিস্তারিত জানতে পারব। এবং বইটির শেষ অধ্যায় তা প্রমাণও করেছে।
মহান এই কিংবদন্তীর কথা যেখানে ইতিহাসে অপ্রতুল, সেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা বেশ কষ্টসাধ্য। আরতুগরুল গাজিকে নিয়ে যা কিছু কিতাব লেখা হয়েছে তার সবই আরবি ও তুরকি ভাষায় রচিত। সেদিক বিবেচনায় বাংলায় অনেক শব্দের ভাবানুবাদ ও দূরের কথা সঠিক উচ্চারণও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তুর্কি জাতি ও জনগোষ্ঠীর আলোচনা দিয়ে শুরু করে কায়ি গোত্রের যাযাবর জীবন। এরপর সেলজুক সামাজ্যের উদয়ের গান, গজনিদের উত্থান ও পতনের সুর, আব্বাসি খেলাফতের সূচনা; শিকড় থেকে শিখরে পদার্পণের যাত্রা, বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের পতনের পদধ্বনি যেন মোঙ্গলদের আক্রমণের দামামা নিয়ে এলো। এভাবেই ৮৫ পৃষ্ঠা থেকে একটু বোধহয় দেরিতেই আরতুগরুল গাজির মঞ্চে পদধুলি পড়ল।
তার জীবনীকে আলোকপাত করতে হলে গোড়ার ইতিহাস টেনে আনতেই হতো। লেখক সে কাজে তথ্য দিয়েছেন পরিষ্কারভাবে। লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন ইতিহাসের পাতায় খুব অল্পই এই নেতা সম্পর্কে জানা যায়। নাম, বংশ, জন্ম, শৈশব, পরিণয় গোষ্ঠীর মাঝে অবস্থান, নেতৃত্ব গ্রহণ, সিংহাসন, জীবনসায়াহ্ন ও চিরভাস্বর নেতার অনন্য হওয়ার পেছনের গল্পটা শেষ করা হয়েছে ৮৫-১০৬ পাতার মধ্যে। তারপরে আবার নতুন করে তার পুত্র উসমান গাজিকে নিয়ে আলোচনা করা হলেও আরতুগরুল গাজির অসামান্য অবদানের কথা উঠে এসেছে।
গুরুত্বপুর্ণ কথাটি হলো ‘দিরিলিস আরতুগরুল’ নামে যে সিরিজ দেখে আমরা আরতুগরুল গাজিকে চেনা ও জানার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছি, তার অনেকাংশেই চরিত্রের প্রয়োজনে সংযোজিত। বাস্তব ইতিহাসের সাথে বাহ্যিগত অনেক অমিল ও অসংগতিগুলো লেখক তুলে ধরেছেন। যারা সিরিজ দেখেছেন তারা এ অমিলগুলো ধরতে পারবেন। আর তা না হলেও সঠিক ইতিহাস জানতে বইটি একটি দৃষ্টান্তমুলক গাইড বই। দিরিলিস দেখা প্রসঙ্গেও লেখক দুটি মূল্যবান কথা বলেছেন।
বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় ডাবিং করায় সকল উৎসুক জনতার মাঝে তাকে জানার হিড়িক পড়ে যায়। ঘটনা প্রবাহগুলোর সাথে বাস্তবতার মিল না থাকায় মিথ্যাচার, কল্পনাপ্রসূত কাহিনিকে দর্শক যখন ইতিহাস হিসেবে গিলে খাচ্ছে তখন এমন একটি বইয়ের খুব প্রয়োজন ছিল। তুর্কি ও আরবি ভাষায় রচিত হয়েছে বই। তবে তা বাঙালি পাঠকের জন্য নয়। মাতৃভাষায় জীবনী পড়ে আরাম পাবেন পাঠককূল।
সব তথ্যের যোগসাজশ সাজাতে, ইতিহাসের পটভূমি ও আলোচ্য বিষয়সমূহকে ক্রমান্বয়ে তুলে ধরতে একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। উচ্চারণের তারতম্যের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। আরবি ও তুর্কি ভাষার সাথে বাংলা উচ্চারণের অনেক পার্থক্য থাকায় সঠিক শব্দের উচ্চারণ পরিলক্ষিত হয় না। মানচিত্রে স্থানের বর্ণনা, দিন-তারিখ-সন, ব্যক্তিদের তালিকা, চরিত্রের গঠন সবকিছুর মাঝে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে তা লেখক অকপটে স্বীকার করেছেন। কারণ, তথ্যদাতাদের মাঝে ভিন্নমতের সম্ভার।আর এত বছর পিছিয়ে এসে সে তথ্যানুসন্ধান করা রীতিমত ধুম্রজাল।
সিনেমার নায়কের মত নয়, ইসলামের পতাকা শিখরে ধরে রাখার এই দিগ্বীজয়ী অধিনায়ককে জানার শেষ আছে বলে মনে হয় না। মনে হয় এ যেন নিতান্তই সূচীপত্র। তবু যেটুকু মুছে যায়নি, নতুন প্রজন্মের সামনে সেটুকু তুলে ধরা তাদের সামনে খোলা বইয়ের মতো। জানার আগ্রহ থেকেই হয়ত ভবিষ্যতে আরও অজানাকে জানার পরিধি তৈরি হবে।

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন আরতুগরুল গাজি

বই : আরতুগরুল গাজি
জনরা : নন-ফিকশন
সাব-জনরা : ইতিহাস
লেখক : আইনুল হক কাসিমী
সম্পাদক : নেসারুদ্দীন রুম্মান
প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক : পুনরায় প্রকাশন
কাগজ : 80gm কালারপ্রিন্ট
বাঁধাই : পেপারব্যাক
মুদ্রিত মূল্য : ২১৬৳
পৃষ্ঠা : ১৪৪

Facebook Comments