উসমানি সাম্রাজ্য : ইতিহাসের কিংবদন্তি এক মহান পুরুষের বপিত বীজের ফসল

ডিজাইন : ফয়সাল মাহমুদ

সেলজুক সাম্রাজ্য, আব্বাসি খেলাফত আর বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের ভগ্নদশা এবং আনাতোলিয়ায় মোঙ্গলদের আরোপিত শাসনব্যবস্থা না থাকা—এ সব কিছুই আনাতোলিয়ায় তুর্কিদের অবস্থান মজবুত করে তোলে। সবার মধ্যে এগিয়ে যান সুগুতের জায়গিরদার আরতুগরুল গাজি। তার মৃত্যুর পর ১২৯৯ সালে এই জায়গিরকে সাম্রাজ্যরূপে প্রতিষ্ঠা করেন আরতুগরুল-তনয় উসমান গাজি।

তখন থেকে শুরু করে ১৪৫৩ সালে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন‌সটানটিনোপল জয় পর্যন্ত উসমানি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি বলে ধরে নেওয়া যায়। এ সময়েই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সুলতানের শাসনামলে বিকশিত হতে থাকে উসমানি সাম্রাজ্য। শুরুতে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজ্যের মতো উসমানি সাম্রাজ্যও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মূলত স্থানীয় নানা সেনাপতি ও সামন্ত রাজ্যের শাসনের উপর নির্ভরশীল ছিল। ধীরে ধীরে সময় যেতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে উসমানি সাম্রাজ্যের অবস্থাও। সামরিক-অর্থনৈতিক উন্নতি তাদের রাজ্য বিস্তারের পক্ষে আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে থাকে।

এ সময়ে উসমানিদের সফলতার পেছনে একক কোনো কারণকে মূল নিয়ামক হিসেবে দাঁড়া করাতে নারাজ ইতিহাসবিদেরা। তাদের মতে, পরিবর্তিত নানা পরিবেশের সাথে দ্রুত নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারাই ছিল নবগঠিত রাজ্যের সফলতার মূল কারণ। পনের শতকের মাঝামাঝিতে তৎকালীন উসমানি সুলতান যেন প্রকৃত সুলতানির স্বাদ পেলেন। এত দিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে-ওঠা সাম্রাজ্যের সুলতানের হাতে তখন কেন্দ্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব এসেছিল। আর এর সুফল-ভোগ-করা প্রথম সুলতান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ।

তের শতকের শেষ ভাগে অঘুজ তুর্কি গোত্র-নেতা উসমান গাজির হাত ধরে আনাতোলিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে যাত্রা শুরু করে উসমানি সাম্রাজ্য। ইতিহাস-বিখ্যাত এ সাম্রাজ্য পৃথিবীর বুকে টিকে ছিল প্রায় ছয় শতাব্দীর অধিক কাল ধরে। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা ইউরোপের দিকে অগ্রসর হয় এবং পনের শতকের মাঝামাঝি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ বলকান অঞ্চল জয়ের মাধ্যমে একটি আন্তঃমহাদেশীয় শক্তির অধিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ফাতিহ উপাধি পান তিনি।

উসমানি সাম্রাজ্য এর ক্ষমতার সোনালি সময়টি পার করেছে অবশ্য ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের সময়কালটিতে। তখন তাদের নেতা হিসেবে সিংহাসনে আসীন ছিলেন সুলতান সুলায়মান কানুনি। তখন এটি একটি বহুজাতিক, বহুভাষিক সাম্র্যাজ্যে পরিণত হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ, মধ্য-ইউরোপের কিছু অঞ্চল, পশ্চিম-এশিয়া, ককেশাস অঞ্চল, উত্তর আফরিকা এবং হর্ন অফ আফরিকা বলে পরিচিত উত্তর-পূর্ব আফরিকার উপদ্বীপের উপর ছিল তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে অবশ্য দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে। প্রায় সাড়ে চারশ বছর বয়সী এ সাম্রাজ্যটিও যেন তখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়া শুরু করেছিল। ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ রাশিয়ান সাম্রাজ্য ও হ্যাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের তুলনায় তাদের সামরিক শক্তি তত দিনে হ্রাস পাওয়া শুরু করেছিল। এরই ফলস্বরূপ আঠার শতকের শেষ এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে বেশ কিছু যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে হয় তাদের।

পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার আশায় জার্মানির সাথে বন্ধুত্বের হাত মেলায় তারা। অবশ্য তত দিনে উসমানি সাম্রাজ্যের ঘরের ভেতরেও আগুন লেগে গিয়েছিল। বিশেষ করে উসমানিদের হাত থেকে মুক্তির নামে মূলত পশ্চিমাদের কলকব্জায় শুরু-হওয়া আরব-বিদ্রোহ বেশ ভালোই ঝামেলা তৈরি করেছিল সাম্রাজ্যটির অগ্রযাত্রার পথে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় উসমানি সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হওয়ার পথে চূড়ান্ত ভূমিকাটি পালন করল। এরপর তাদের অধীনে-থাকা বিভিন্ন অঞ্চলই হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকে। প্রায় ছয়শ বিশ বছরের বৃদ্ধ উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য শেষ পর্যন্ত কবর খুঁড়েছিল তুর্কিদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তুর্কিদের বিজয়ই বিশ্বে উসমানি সুলতানি শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়; পতন ঘটায় ইসলামি খেলাফতের। সে হিসেবে উসমানি রাজবংশের সুলতান দ্বিতীয় আবদুল মজিদকেই বলা যায় মুসলিম-বিশ্বের সর্বশেষ খলিফা।

দীর্ঘ ছয় শতাধিক বছর শাসনকারী বিশাল এই উসমানি সাম্রাজ্যটি ছিল ইতিহাসের কিংবদন্তি এক মহান পুরুষের বপিত বীজের ফসল। তিনি আমাদের মহাবীর আরতুগরুল গাজি—উসমানি সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা। আলাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।

আরতুগরুল গাজি বইয়ের উপসংহার শিরোনামের অধীন-আলোচনা, পৃষ্ঠা : ১৪১-১৪২

বই : আরতুগরুল গাজি
জনরা : নন-ফিকশন
সাব-জনরা : ইতিহাস
লেখক : আইনুল হক কাসিমী
সম্পাদক : নেসারুদ্দীন রুম্মান
প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক : পুনরায় প্রকাশন
কাগজ : 80gm কালারপ্রিন্ট
বাঁধাই : পেপারব্যাক
মুদ্রিত মূল্য : ২১৬৳
পৃষ্ঠা : ১৪৪

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Facebook Comments