ইতিহাসে বহুল প্রচলিত কিছু ভুল

সিরাতুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সিরাতে সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং সিয়ারুল আইম্মাহ—মিথ্যাবাদীরা মিথ্যার জাল বিছাতে কোথাও বাদ রাখেনি। মিথ্যাবাদী ও ধৃষ্ট শ্রেণির এই লোকগুলো সবসময়ই সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। তবে ধ্রুব সত্য এই যে, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের যে-অংশেই মিথ্যা, বানোয়াট ও জাল ঘটনা তৈরি করা হয়েছে, সবগুলোই বিজ্ঞ আলিমদের কাছে ধরা পড়েছে। তারা হাদিসকে যেমন মিথ্যা থেকে ছেঁকে সত্যকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছেন, তদ্রূপ-তুলনামূলক কম হলেও ইতিহাসকেও এভাবে যাচাই করেছেন। এখানে দুই ধরনের কাজ হয়েছে। এক. মিথ্যা বর্ণনা ও ইতিহাসগুলোকে চিহ্নিত করে দেওয়া। দুই. মিথ্যা ইতিহাস ও বর্ণনা চিহ্নিত করার মূলনীতি প্রণয়ন করা। ইসলামের শুরুর যুগে আলিমগণ এই দুটি কাজই করে দিয়ে গেছেন। ইতিহাস যাচাইয়ের নিখুঁত পদ্ধতি তারা তৈরি করে দিয়েছেন। সেই আলোকে পরবর্তী আলিমগণ এমন অনেক মিথ্যা ইতিহাস ও ঘটনা চিহ্নিত করে দিয়েছেন উম্মাহর কাছে।

ইতিহাসে এজাতীয় ঘটনা প্রচুর। দাজ্জাল ও কাযযাব শ্রেণির লোকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে সবকিছু বিকৃত করবার। আজ এই জাতীয় কিছু ঘটনা এবং এর সত্যতা জানার চেষ্টা করব আমরা, ইনশাআল্লাহ।

২.
একদম সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করা যাক।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল হয়ে গেছে। সময়টা হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকাল। মুসলিমদের হাতে সিরিয়ায় বিজিত হলো। বিজিত হলো প্রথম কিবলা বাইতুল মাকদিস। বাইতুল মাকদিস বিজয় করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাবিয়ায় গেলেন। নবিজির মুয়াযযিন হযরত বিলাল হাবশি রাযিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে গেলেন খলিফার কাছে। আবেদন জানালেন, তাকে যেন শামে রেখে যান। খলিফা সম্মত হলেন। রেখে গেলেন বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। সিরিয়ায় বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু স্থায়ী হয়ে যান।
মূল ঘটনাটা ঘটল কিছুদিন পরে। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন স্বপ্ন দেখলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে তাকে বলছেন—এ কেমন রূঢ়তা বিলাল? এতদিন হয়ে গেছে, এখনো আমাকে দেখতে আসার তোমার সময় হয়নি? স্বপ্ন দেখে বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু চিন্তিত হলেন। কিছুটা ভীতও হলেন। তারপর রওয়ানা করলেন মদিনার উদ্দেশে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজার সামনে গিয়ে কাঁদলেন প্রচুর। হযরত হাসান ও হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। দুই ভাই আবেদন জানালেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যেভাবে আজান দিতেন আপনি, আমরা আবারও সেই আজান শুনতে চাই বিলাল। তাদের আবেদন মেনে বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের ছাদে ওঠেন এবং আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আজান দেন। বিলালের ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মদিনা কেঁপে ওঠে। ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলামাত্র সেই কম্পন আরও বেড়ে যায়। বিলালের কণ্ঠে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ শুনে নারীরা বেরিয়ে আসেন পর্দা ছেড়ে। সবার একটাই জিজ্ঞাসা—বিলাল, আপনাকে কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছেন? সমগ্র মদিনায় কান্নার রোল পড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর এতবেশি ক্রন্দন মদিনার লোকেরা আর কখনোই করেনি।
সন্দেহ নেই—খুবই মর্মস্পর্শী ঘটনা। কিন্তু যে ঘটনাটি মর্মে-মর্মে বেজে গেল, তা কি আসলেই প্রমাণিত? উম্মাহর মুহাক্কিক আলিমগণ কী বলেন এই ব্যাপারে?
ঘটনাটি তাহকিক করার আগে এর হদিস অনুসন্ধান করা যাক।
এই ঘটনাটি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেছেন হাকিম আবু আহমাদ নাইসাবুরি। তার থেকে বর্ণনা করেছেন হাফেয ইবনে আসাকির রহ., তারিখে দিমাশকে। সংক্ষিপ্ত আকারে বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে এবং বিস্তারিতভাবে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদের জীবনীতে। উপরে বর্ণিত ঘটনাটি যার সারসংক্ষেপ। [তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৭/১৩৬-১৩৭]
ইবনে আসাকির থেকে নিয়েছেন অন্যরা। পরবর্তীতে তাকিউদ্দিন সুবকি রহ. (৭৫৬ হি.), [শিফাউস সাকাম ফি যিয়ারতি খাইরিল আনাম, ১৮৭ পৃ., দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম সংস্করণ] ইবনে হাজার হাইতামি রহ. (৯৭৩ হি.) [তুহফাতুয যাও-ওয়ার ইলা কাবরিন নাবিয়্যিল মুখতার, পৃ. ৬৭-৭০, দারুস সাহাবা লিত-তুরাস, প্রথম সংস্করণ]। এছাড়াও হাফেয ইবনুল আসির আল-জাযারি রহ. (৬৩০ হি.) ঘটনাটি এনেছেন। তবে তিনি সনদ উল্লেখ করেননি। কোত্থেকে নিয়েছেন—সেটাও বলেননি। [উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃ. ১৩৪, দার ইবনে হাযম, এক ভলিয়মে করা, প্রথম সংস্করণ]
আমরা তিনজনকে সামনে রেখে বিষয়টি পর্যালোচনা করব।
ইবনে আসাকিরের ওফাত ৫৭১ হিজরিতে, ইবনুল আসিরের ওফাত ৬৩০ হিজরিতে, এবং তাকিউদ্দিন সুবকির ওফাত ৭৫৬ হিজরিতে এবং ইবনে হাজার হাইতামির ওফাত ৯৭৩ হিজরিতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে—উপরোক্ত চারজনের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যক্তি হলেন ইবনে আসাকির রহ.। ইবনুল আসির রহ. যদিও উল্লেখ করেননি তিনি কোত্থেকে নিয়েছেন, আবার নিজস্ব সনদও উল্লেখ করেননি—তাই ধরে নেওয়া যায় তিনিও ইবনে আসাকির থেকেই নিয়েছেন।
ইবনুল আসির উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবা কিতাবে বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। তবে এরপর কোনো মন্তব্য উল্লেখ করেননি। তাই ইবনুল আসিরকে নিয়ে আলাদা পর্যালোচনার প্রয়োজন নেই।
ইবনে আসাকির রহ.ও তারিখে দিমাশকে অনুসৃত সাধারণ নিয়ম অনুসারে ঘটনাটি উল্লেখ করার পর কোনো মন্তব্য করেননি। তবে যেহেতু সনদসহ দিয়েছেন, তাই যাচাই করে নেওয়া পরবর্তীদের কর্তব্য। সমস্যা বেঁধেছে অন্য দুজনকে নিয়ে। তাকিউদ্দিন সুবকি রহ. এবং ইবনে হাজার হাইতামি রহ.—দুজনেই ইবনে আসাকিরের সনদকে বলেছেন ‘জায়্যিদ সনদ’। অর্থাৎ—তাদের দুজনের মতে এই বর্ণনাটি প্রমাণিত এবং সনদটি সহিহ।
তাহলে আমাদেরকে দেখতে হবে—আসলেই সনদটি সহিহ কি না। এক্ষেত্রে আমরা নিজস্ব তাহকিকের অনুসরণ না করে অন্য গরিষ্ঠ মুহাক্কিক আলিমদের তাহকিক দেখব।
মূল সনদটি হলো—আবু মুহাম্মাদ ইবনুল আকফানি> আব্দুল আযিয ইবনে আহমাদ> তাম্মাম ইবনে মুহাম্মাদ> মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান> মুহাম্মাদ ইবনুল ফায়য> আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে বিলাল ইবনে আবু দারদা> আবু মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান> সুলাইমান ইবনে বিলাল> উম্মে দারদা> আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু।
সুবকির বিভিন্ন বিষয়ের জবাব নিয়ে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল হাদি আল-মাকদিসি (৭৪৪ হি.) রহ. লিখেছেন—‘আস-সারিমুল মুনকি ফির-রদ্দি আলাস-সুবকি।’ সুবকির কিতাব থেকে বিস্তারিত ঘটনাটি উল্লেখ করার পর ইবনে আব্দুল হাদি লেখেন—‘বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে উল্লিখিত আসারটি সহিহ নয়…। আর তিনি যে বলেছেন সনদটি জায়্যিদ, এটি তার ভুল। হাকিম আবু আহমাদ নাইসাবুরি থেকে ইবনে আসাকির বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটি গরিব ও মুনকার বর্ণনা। সনদটি মাজহুল। আবার ইনকিতা’ও আছে।
ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ থেকে ঘটনাটি মুহাম্মাদ ইবনুল ফায়য আল-গাসসানি এককভাবে বর্ণনা করেছে। আর এই ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ এমন একজন শায়খ; তার সিকাহ হওয়া, আমানতদারিতা বা মুখস্থশক্তি ও নির্ভরযোগ্যতার কথা জানা যায় না। … মুহাম্মাদ ইবনুল ফায়য ছাড়া এই মুনকার ঘটনাটি আর কেউ বর্ণনা করেনি।’ [আস-সারিমুল মুনকি ফির-রদ্দি আলাস-সুবকি, পৃ. ২২৮]
ইবনে আব্দুল হাদি এই সনদের প্রতিটি রাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এক পর্যায়ে সুবকি কেন এর সনদকে ‘জায়্যিদ’ বলেছেন, তা নিয়ে খেদ ঝেড়েছেন। যার সারকথা হলো—ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদের এই সনদকে সুবকির আগে কেউ ‘জায়্যিদ’ বলেননি। ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদকে কেউ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্যও বলেননি। সুতরাং, এই সনদের ব্যাপারে জায়্যিদ তথা সহিহ বলার মতো পর্যাপ্ত দলিল পাওয়া যায় না।
বিস্তারিত আলোচনা শেষে তিনি খোলাসা টেনে বলেছেন—‘এই ধরনের সনদের ওপর নির্ভর করা যায় না… এবং তা সহিহ-সাবিতও নয়।’ [প্রাগুক্ত]
একইভাবে এই ঘটনা উল্লেখ করার পর হাফেয যাহাবি রহ. (৭৪৮ হি.) লিখেছেন—‘এর সনদ দুর্বল এবং ঘটনাটি মুনকার।’ [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১/৩৫৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ]
হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২ হি.) লিখেছেন—‘ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ কর্তৃক বর্ণিত বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাম গমন, সেখান থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে আযান দেওয়া এবং কান্নায় মদিনাবাসী কাঁপতে থাকার যে-ঘটনা, তা সুস্পষ্ট বানোয়াট।’ [লিসানুল মিযান, ১/৩৫৯, মাকতাবুল মাতবুয়াতিল ইসলামিয়া, ১৪২৩ হি.]
মোল্লা আলি কারি রহ. (১০১৪ হি.) হাফেয সুয়ুতির ‘যাইলুল লাআলিল মাসনুআ’র বরাতে এই ঘটনাটিকে সুস্পষ্ট বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন।
এছাড়াও হাফেয সুয়ুতি রহ., আল্লামা শাওকানি রহ. (১২৫০ হি.)-এর মতো মুহাক্কিক আলিমগণ ঘটনাটিকে সুস্পষ্ট বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন।
তাহলে আলোচনার সারকথা যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো—মূল বর্ণনা আবু আহমাদ নাইসাবুরির। তার সনদে বর্ণনা করেছেন হাফেয ইবনে আসাকির। ইবনুল আসির সম্ভবত ইবনে আসাকির থেকেই নিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু সনদবিহীন এনেছেন, তাই আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। ইবনে আসাকির থেকে পরবর্তীতে তাকিউদ্দিন সুবকি এবং ইবনে হাজার হাইতামি নিয়েছেন। তবে সুবকি সনদটিকে জায়্যিদ বা সহিহ বলেছেন। সুবকির অনুসরণে হাইতামিও একই কাজ করেছেন।
সনদের বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল হাদি আল-মাকদিসি রহ.। সনদে কয়েক ধরনের সমস্যা আছে। এক. মাজহুল রাবি। দুই. মুনফারিদ রিওয়ায়াত। তিন. ইনকিতা’। এমন সমস্যাবহুল সনদে বর্ণিত ঘটনার ওপর নির্ভর করা যায় না।
সনদের কথা বাদ দিলেও মূল ঘটনাটি প্রমাণিত নয়; বরং বানোয়াট এবং জাল ইতিহাস। ইবনে আব্দুল হাদি, ইমাম যাহাবি, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি, হাফেয সুয়ুতি এবং মোল্লা আলি কারি রহ.-এর মতো মুহাক্কিক আলিমগণ একে সুস্পষ্ট জাল ও বানোয়াট বলেছেন। সুতরাং এই ঘটনা ঐতিহাসিক কোনো সূত্র দিয়ে প্রমাণ করার সুযোগ নেই।

৩.
‘রবিয়ার পিতা আবু আব্দুর রহমান ফররুখ। রবিয়া যখন মায়ের গর্ভে, ফররুখ তখন খোরাসানে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যান। সময়টা তখন উমাইয়া খেলাফতের। যাওয়ার সময় স্ত্রীর কাছে রেখে যান ৩০ হাজার দিনার।
ফররুখ ২৭ বছর পর মদিনায় ফিরে আসেন। হাতে বর্শা। ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশ করেন বাড়ির আঙিনায়। বর্শা দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই রবিয়া বেরিয়ে আসেন। হুঙ্কার ছেড়ে ধমকে ওঠেন—‘আল্লাহর শত্রু, তুমি আমার ঘরে হামলা করতে এসেছ?’ ফররুখ পাল্টা হুঙ্কার ছাড়েন—‘আমি হামলা করতে আসিনি। তুমি বরং আমার হেরেমে প্রবেশ করেছ।’
দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। চারপাশে মানুষ জমা হয়ে যায়। ইমাম মালেক মধ্যস্ততা করতে আসেন। ইতোমধ্যে ভেতর থেকে রবিয়ার মা ফররুখের গলার আওয়াজ চিনতে পেরে বেরিয়ে আসেন। এসে সমাধান করেন। বাবা-ছেলের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয় পেয়ে একে-অপরকে জড়িয়ে ধরেন।’
সন্দেহ নেই—খুবই আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ ঘটনা। চমকপ্রদ অংশ আরও একটু বাকি আছে।
‘পরিচয় শেষে রবিয়া বেরিয়ে মসজিদে নববিতে চলে যান। দরসের মসনদে উপবিষ্ট হন। দরসে ঘিরে বসেন মালিক ইবনে আনাস, হাসান ইবনে যায়দের মতো মদিনার সম্ভ্রান্ত আলিমগণ। রবিয়া দরস দিচ্ছেন। এমন সময় তার বাবা ফররুখ মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। নামাজ শেষে এত বড় মজলিস দেখে ফররুখ একজনকে জিজ্ঞেস করেন—মসনদে কে বসা? রবিয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান—লোকটি জবাব দেয়। ফররুখ ছেলের সম্মান দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন।
বাড়িতে ফিরে উম্মে রবিয়ার কাছে উচ্ছ্বাস ও আবেগ প্রকাশ করেন। উম্মে রবিয়া জানান—আপনার রেখে যাওয়া ৩০ হাজার দিনার আপনার ছেলের ইলমের পেছনে ব্যয় করেছি।’ [তাহযিবুল কামাল, ৯/১২৬-১২৭, হাফেয মিযযি, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ]
এই হলো মূল ঘটনা। এই ঘটনার সত্যতা কতটুকু? আসলেই কি রবিয়ার বাবা ফররুখ ২৭ বছর পর ফিরে এসেছিলেন? এই ঘটনা কি আসলেই ঘটেছিল? ইমামগণ কী বলেন এই সম্পর্কে?
তার আগে রবিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে নেওয়া যাক।
রবিয়া ইবনে আবু আব্দুর রহমান। প্রসিদ্ধ নাম—রবিয়াতুর রায়। ইমাম যাহাবি তার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন—‘আলিমুল ওয়াকত’; সহজ বাংলায়—যুগশ্রেষ্ঠ আলেম। রবিয়াতুর রায় একজন তাবেয়ি। ওফাত লাভ করেছেন ১৩৬ হিজরিতে। ফিকহ ও হাদিস—উভয়ের ইমাম ছিলেন। রবিয়াকে বলা হতো ‘মুফতিল মাদিনাহ’—মদিনার মুফতি। [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৮৯, ইমাম যাহাবি, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ]
বিশিষ্ট সাহাবি আনাস ইবনে মালিক তার উস্তাদ। মদিনার সপ্তফকিহের একজন সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের কাছ থেকেও ইলম নিয়েছেন। উস্তাদের পাল্লা যেমন ভারী, তার ছাত্রদের নামগুলোও জগদ্বিখ্যাত। ইমাম শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ, আউযায়ি, সুফিয়ান সাওরি, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, মিসআর ইবনে কিদাম এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের মতো উম্মাহর মহান ইমামগণ তার ছাত্র। [আল-কামাল ফি আসমাইর রিজাল, ৪/৪৬৬, আব্দুল গনি মাকদিসি]
ইমাম মালিক ইবনে আনাস রবিয়ার ইন্তেকালের পর আফসোস করে বলেছেন—‘রবিয়া যেদিন মারা গেছেন, সেদিন থেকে ফিকহের স্বাদ চলে গেছে।’ [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৯১, ইমাম যাহাবি, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ]
রবিয়াতুর রায় রহ. ও তার পিতা ফররুখকে নিয়ে এই ঘটনাটি বহুল আলোচিত ও প্রসিদ্ধ। সন্তানের ইলমের জন্য মায়ের ত্যাগ ও নারীর দৃঢ়তা বোঝাতে অনেকেই ব্যবহার করেন। কিন্তু এই ঘটনাটি কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়। হাফেয মিযযি রহ. এই ঘটনাটি উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করেননি। বিষয়টিকে সনদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে, ইমাম যাহাবি রহ. ঘটনাটি উল্লেখ করতে গিয়ে শুরুতেই লিখেছেন—‘রবিয়া সম্পর্কে একটি বাতিল ঘটনা বর্ণিত আছে।’ এই বলে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা শুরু করেন। ঘটনা বর্ণনা শেষ করে অভ্যাসবশত ‘কুলতু’ বলে নিজের মন্তব্য পেশ করতে শুরু করেন।
হাফেয যাহাবি লেখেন—‘ঘটনাটি যদি সহিহ হতো তাহলে এক হাজার দিনারই যথেষ্ট হতো। বরং এর অর্ধেকেও চলে যেত। ৩০ হাজার দিনার বহু দূরবর্তী অনুমাননির্ভর এক সংখ্যা। তারপর রবিয়ার বয়স যখন ২৭ বছর, তখন তিনি ছিলেন যুবক। দরসের কোনো হালাকা তার ছিল না। বরং দরসের মসনদ ছিল তখন সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়া ইবনে যুবাইর এবং রবিয়ার উস্তাদদের। এখানে ইমাম মালিকের কথা এসেছে। তখন ইমাম মালিকের জন্মই হয়নি। আর জন্ম হলেও তখন তিনি দুধের শিশু।… আর, এই ঘটনার সনদও মুনকাতি’।’ [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৯৪-৯৫, ইমাম যাহাবি, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ] সুতরাং এই ঘটনাকে কোনোভাবেই রবিয়ার দিকে নিসবত করে বলার সুযোগ নেই।
এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো—কোনোকিছু গুরুত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব বা মর্যাদা বোঝাতে ভুলভাল, বাতিল ও অপ্রমাণিত ঘটনার আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিটি বিষয়ের স্বপক্ষে এমন শত-শত ঘটনা ইতিহাস ও জীবনীগুলোতে পাওয়া যাবে।

৪.
এধরনের আরেকটি ভুল বিষয় প্রচলিত আছে মুহাম্মাদ বিন কাসিম রহ.কে নিয়ে। এর পেছনে কারণ হিসেবে বলা যায় মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে নিয়ে রচিত উপন্যাসগুলোকে। উপন্যাসগুলোতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে দেখানো হয়েছে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের চাচা হিসেবে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কি আসলেই মুহাম্মাদ বিন কাসিমের চাচা?
এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য প্রথমেই দুজনের বংশধারা দেখা যাক। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের পুরো নাম হলো—মুহাম্মাদ বিন কাসিম বিন মুহাম্মাদ বিন হাকাম বিন আবি আকিল। আর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পুরো নাম হলো—হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিন হাকাম বিন আবি আকিল। (জামহারাতু আনসাবিল আরব, পৃ. ২৬৭-২৬৮, ইবনে হাযম আন্দালুসি, দারুল মাআরিফ, পঞ্চম সংস্করণ)
তাহলে দেখা যাচ্ছে—হাজ্জাজের বাবা হলেন ইউসুফ এবং মুহাম্মাদের পিতা কাসিমের বাবা হলেন মুহাম্মাদ। অর্থাৎ, দুজন ভাই নন। তবে ইউসুফ এবং মুহাম্মাদের পিতা হলেন হাকাম ইবনে আবি আকিল। অর্থা, হাজ্জাজ এবং কাসিমের পিতা পরস্পর ভাই-ভাই। তাহলে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো—হাজ্জাজ এবং কাসিম পরস্পর ভাই নন, বরং তাদের পিতা পরস্পর ভাই। আর কাসিম ও হাজ্জাজ হলেন পরস্পর চাচাতো ভাই। সুতরাং মুহাম্মাদ বিন কাসিম হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাতিজা নন; বরং তারা একই বংশের লোক।
উপমহাদেশীয় হিসেবে একে চাচাতো চাচা বলা গেলেও আরবের পরিবারব্যবস্থায় চাচাতো চাচাকে কখনোই চাচা বলা হয় না। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন—‘উমর, জানো না চাচা বাবার সমতুল্য?’—সেখানেও চাচার কথাই বলা হয়েছে, চাচাতো চাচা নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৯৮৩)
দ্বিতীয় কথা হলো—ইতিহাসের গ্রহণযোগ্য কোনো মাসাদিরেও হাজ্জাজকে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের চাচা বলা হয়নি। সুতরাং হাজ্জাজ মুহাম্মাদ বিন কাসিমের চাচা ছিলেন—এই কথা ঠিক নয়।

ইতিহাসে এমন নানাধর্মী ভুল প্রচলিত আছে। সেসবের যাচাই ও বিশ্লেষণও করা আছে। প্রয়োজন শুধু সেগুলো অনুসন্ধান করে অধ্যয়ন করা।

Facebook Comments