আল মাহমুদ এবং প্রসঙ্গত কথা

‘আঞ্চলিক শব্দরাজির মধ্যে যিনি বাংলার অফুরন্ত বহমানতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনি মাঝে মধ্যে অকারণে বেছে নিচ্ছেন বাংলাদেশে প্রায় অপরিচিত নানা আরবি শব্দ’…
(শিবনারায়ণ রায়, কালের খেয়া, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)

আল মাহমুদ প্রয়াণে পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলো বিশেষ আয়োজন করেছে নিয়মতান্ত্রিক, কালের খেয়ার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সংখ্যাটি আল মাহমুদ বিশেষ সংখ্যা ছিল। উল্লেখিত অংশটুকু ‘একজন খাঁটি কবি’ শিরোনামে এ সংখ্যায় থাকা শিবনারায়ণ রায়ের লেখার খণ্ডাংশ। পুরো আলাপজুড়েই একজন সজ্জন ও আন্তরিক মানুষের খানিক স্মৃতি খানিক বোঝাপড়ার এই আলাপে চিহ্নিত অংশে চোখ আটকে যাওয়ার জোগাড় হলো।

ভাষাগত যেই ক্রিয়াকলাপ এদেশে চলমান এবং শব্দের যেই পরিচর্যা এখানে তার একটা শক্ত নিদর্শন দেখা গেছে চিহ্নিত অংশে। সবখানে ঠিকঠাক, যখন ধর্মীয় বিষয় চলে আসে তখন বড় কোনো লেখক, ভালো কোনো লেখাও অবহেলিত হয়ে যায়, তবে আবার ‘বিশ্বাস যার যেমনই থাকুক কাজে তিনি বড়’ এমনটা বলেও খানিক সহৃদয় হতে দেখা গেছে কোথাও কোথাও কাওকে কাউকে। অথচ ধর্মের সঙ্গে বা ভাষার সঙ্গে লেখার এত আঙ্গিক বোঝাপড়া যখন করতেই হবে তবে কেবল এই উর্দু আরবি শব্দের সঙ্গে বৈরিতা কেন ইংরেজি ও অন্য ভাষাতে কেন নয়। ইংরেজি তবে কি তুলনামূলক উত্তম ভাষা! তথাপি শব্দ ও ভাষা কোনোটাই ধর্মকে জাজ করার প্রধান আশ্রয় না। এখানে ধর্ম যেমন অবহেলিত আরবি ভাষা ও শব্দটাও অবহেলিত। যদি কেউ এইভাবে বলেন যে―আমি বুঝি না, পারি না। সেক্ষেত্রে বলতে হয়―হাঁ সবাই সব বুঝবে না পারবে না, স্বাভাবিক। এটা যে বা যারা বোঝে না তাদের খামতি, কেন কেবল লেখকের ওপরই দায়টা ঘুরে ঘুরে আসবে! অথচ আজকাল কবিতা ও অন্য জনরাতেও আরবি উর্দূ শব্দের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়, যেন শব্দটা এই কবিতার অলঙ্কার তখন, সুন্দর। কেবল আটকে যায় কথাসাহিত্য তথা গদ্য, গল্প, উপন্যাস, এইসবে গিয়ে। ভাবটা এমন―‘কেন এমন শব্দ লাগবে, এই শব্দ ব্যবহার না করলে লেখা হয় না!’ যেন শব্দটাই মূল, লেখাটা মূল্যহীন, ফাউ। দুঃখজনক হলেও সত্য আজকাল বহু মানোত্তীর্ণ লেখাও কেবল দু একটা আরবি উর্দু শব্দের খপ্পরে কেবল ভাগাড়ে জায়গা হয় মাত্র। যেন এই শব্দ, এই ভাষাতে ধর্মের গন্ধ লেগে আছে, তাই হয় এই শব্দ হটাও নয়তো এই লেখা ভাল হলেও অগ্রাহ্য।

ফলত বহু প্রতিভা থেমে যায় ঠিকঠাক জলে ওঠার আগেই। বাধা কেবল ধর্ম আর ধর্মের গন্ধ লেগে থাকা ক’টা শব্দতে।

২.
মূল কথা হলো অনেক আরবি উর্দু শব্দ এমন আছে যেসব আমাদের বাংলা ভাষার নিত্যসঙ্গী, চলমান, ব্যবহৃত, সেসব নিয়ে না সমস্যা আছে কারো না মাথাব্যথা। এমনকি ব্যবহৃত সেসব শব্দের উৎপত্তি কোন ভাষার সেটাও জানার দরকার হয় না তখন। ফলে বোঝা যায় সমস্যাটা আরবি উর্দু বা ধর্মের গন্ধতে না, সমস্যাটা বোঝা না বোঝার মামলায়। ফলে এর দায় কি আদৌ লেখকের ওপর চাপানো উচিত, না লেখাটাকে অবহেলায় ঠেলে দেওয়া উচিত! সঠিক বিচারের বিবেচনা রাখা দরকার।

একটা লেখাতে ব্যক্তির চলন বলন ধ্যান ধারণা ও বিশ্বাসের দিকটা না আসা যেমন স্বাভাবিক, আসাটাও তেমনই স্বাভাবিক, এই কথা বলা উচিত হবে না যে লেখাটা সবার উপযোগী করা উচিত ছিল। সুতরাং ধর্মের সঙ্গে সাযুজ্য থাকার সুবাদে লেখকের কোনো শব্দ বা আচরণ লেখাতে ধর্মের আঙ্গিকে ফুটে উঠলে সেটাকে ধর্মের বিবেচনায় জাজ না করে মৌলিক ভালো মন্দের, শুদ্ধ অশুদ্ধের বিবেচনায় মূল্যায়ন করা কাম্য। তাছাড়া এইযে সবার উপযোগী করে লেখা বা ধর্মের বা শ্রেণীর যেই গন্ধ ও সুর লেখাতে টের পাওয়া না পাওয়ার বিষয় এর জন্য দায়টা লেখককে না দেয়াই শ্রেয়তর, কারণ এটা লেখকের স্বাধীনতা। লেখক লিখবেন, সেখানে তার লেখার মান যাচাই হতে গিয়ে ধর্মের গন্ধ, শব্দের অপ্রচল ব্যবহার এইসব আসার হেতু কী! বহু শব্দ লেখকদের হাত ধরেই যাত্রা করেছে বাংলা ভাষায় যার কোনো ইয়ত্তা নেই, তবে কেন অপ্রচল বলার রীতি! বরং এই শব্দ ও এর ব্যবহার এখান থেকেই আরো কেউ শুরু করুক! তাই বরং ভালো নয় কি! তাছাড়া এটা লেখকের স্বাধীনতাকে হরণ করার মতো অনেকটা। যে যেই ধর্মের, যে যেই মানসিকতা ও ধ্যান ধারণার, তার লেখায় সেই ছাপ সেই ভাষা ও শব্দের বহুল না হলেও সীমিত বা পরিমিত প্রকাশ ঘটা স্বাভাবিক। এটাকে এই দায়ে ফেলা ঠিক না কেন লেখাটা সবার উপযোগী হলো না। লেখাটা যে পড়বে লেখাটা তো তারও। তবে যিনি লিখছেন যেহেতু তার আঙ্গিকটাই এখানে বিবেচ্য ফলে লেখার ছবিটাও তার অনুরূপই প্রকাশ পাওয়া স্বাভাবিক, হ্যাঁ সবার মতো করে লেখাটা বা সবার উপযোগী করে লেখাটা যেতে পারত, তবে এই না হওয়াটাকে অন্যায় বা অনুচিত বলার দোষে দোষারোপ করা, অবহেলা করা নিতান্ত অশোভন, অন্যায়।


সুতরাং শিবনারায়ণ রায় বা এমনতর যারাই এইসব বিষয়ে প্রকাশ্যে গোপনে বলেন ধারণা রাখেন তারা নিশ্চয়ই এটাও মানেন নিজের ভেতর অন্তত―যে তিনি বড় কবি-শিল্পী। তাহলে আর এই খুচরো দুটো বাক্যব্যয় কী হেতুতে! অনেকটা অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন হয়ে গেল না!

সবরকম দন্ধ আর ক্রিয়াকলাপ থেকে বের হয়ে কেবল একজন বড় কবি-শিল্পী হিশেবেই তাকে দেখা উচিত।

হাঁ এটাও সত্য, আরবের অনেক কাফের মুশরেক বাহ্যত স্বীকার না করলেও ভেতরে ভেতরে খোদা একজন আছে বলে যেমন বিশ্বাস করতো, মানতো, আজকাল যারা উপরি উল্টা কথা কয় ভেতরে তারাও অস্বীকার করার শক্তি রাখে না যে তিনি বড় কবি-শিল্পী।

সর্বপরি বিশ্লেষণ ও ভাববেদনা সবই সত্য ও সুন্দরের পথে হওয়া দরকার, সত্যকে বহু মিথ্যার পরিবেষ্টনে আবিষ্ট করলেও সত্য সত্যের মতোই ধ্রুব, জলজলে এক নক্ষত্র। আধাঁরেও যা নিজস্ব আলোয় জলতে থাকা প্রদীপ।

Facebook Comments