আরতুগরুল গাজি : যাযাবর থেকে রাজ্যজয়ের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান

অলঙ্করণ : ফয়সাল মাহমুদ

এক যাযাবর জাতি হঠাৎ করেই কি একটি সাম্রাজ্যের মালিক বনে যেতে পারে! আচমকা চোখ খুলেই কি দেখতে পায়, শিথানের পাশে পড়ে আছে নগরফটকের চাবির গোছা! অমনি নিয়ে বসে পড়ে সিংহাসনে আর হয়ে যায় শাহানশাহ! এ কি হয়? ভুঁইফোঁড় কোনো পাতিনেতা বা এলাকার হোমড়া ষণ্ডাটারও তো বলার মতো একটা কাহিনি থাকে, রোমাঞ্চকর একটা যাত্রা থাকে…

রাজার ছেলে রাজা হয়—এ-ই তো বিধি। কিন্তু ইতিহাস হয় তা-ই, যেখানে ঘটে অভূতপূর্ব কিছু। জগত তার পাথরখাতায় লিখে রাখে সেসব রোমহর্ষক কাহিনি। যদিও-বা সে ইতিহাসে বিস্মৃতির পলি পড়ে, কালে-কালে তা আবার মুছেও যায় সত্যের প্রয়োজনেই। আরতুগরুল গাজি দমকা হাওয়ায় উন্মোচিত-হওয়া তেমনই এক বিস্মৃত ইতিহাস…

*****

সুলাইমান শাহ—ভাগ্যপরাহত এক যাযাবর গোত্রনেতা তিনি। তার কোনো রাজ্য নেই। বিশাল আকাশের নিচে তাঁবুর শামিয়ানাই তার ঠিকানা। কখনো এ রাজ্যে, কখনো ও রাজ্যে তাঁবু পেতে চলে যায় জীবন। কিন্তু ভেসে-চলা ভাঙা তরীও তো তীর চায়। সুলাইমান শাহও চাইতেন। কিন্তু এমনই সময় গোত্রের বাগডোর তার হাতে, যখন শুধু তার আশপাশকার রাজ্যই নয়, পুরো পৃথিবীতেই এক মাতাল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে বড় বড় কেল্লাপতিদের দুর্গ, সাম্রাজ্যের নগরফটকে বাজছে দুদ্দার আওয়াজ। মোঙ্গলরা পৃথিবীর কানায় কানায় তখন ছড়িয়ে দিয়েছিল এমনই কলজে-হিম-করা ত্রাস। আর বসে থাকা চলে না। ছোট্ট এক গোত্রের অধিপতি সুলাইমান শাহ আবার পাঁততাড়ি গোটালেন। মনে অসহায়ত্বের ছায়া, চোখে ভরসা-হারানো দৃষ্টি—কিন্তু পথ ধরলে তো হাঁটতেই হয়। পথিক কি দেখে পথের ছায়া…

আনাতোলিয়া তখন এক নিরাপদ ভূমি। হাজারও গৃহহারা মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সেখানে। সুলাইমান শাহও এখানে ঠাঁই নিলেন। পৃথিবীর নারকযজ্ঞে তাদের কী চিন্তা, মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েই যাদের উদয়াস্ত হয়! তবু চিনচিনে একটা চিন্তা তো ছিলই সারা জীবন—কায়ি গোত্রের একটি স্থায়ী আবাস! এই স্বপ্ন নিয়েই অনেক আঁধার কেটে একদিন বিগত হলেন সুলাইমান শাহ। তত দিনে অনেক আশার আলো ফুটেছে—উঁকি দিচ্ছে আরও অনেক পাওয়ার আভাস। কায়ি গোত্রপতি তখন সুলাইমানপুত্র আরতুগরুল। বাবার স্বপ্নকে তিনি রূপ দিতে থাকলেন শুরু থেকেই।

*****

অসীম সাহসী বীর কায়ি গোত্রপতি আরতুগরুল একদিন এক হঠাৎ-যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধমান দুই পক্ষের দুর্বল পক্ষের হয়ে লড়েন তিনি। লড়াইটি ছিল সেলজুক আর খাওয়ারিজমদের। যুদ্ধে সেলজুকদের জয় হয়। পরাজিতপ্রায় এই জয়ে ছিল আরতুগরুলের অনুপেক্ষ অবদান। সেলজুক সুলতান খুশি হয়ে আরতুগরুলের প্রতি বাড়িয়ে দেন বন্ধুত্বের হাত। বাইজেনটাইন-সীমান্তঘেঁষা সুগুতের জায়গির প্রদান করেন নজরানা হিসেবে। কায়িরা হয়ে ওঠেন সেলজুক সাম্রাজ্যের মহান সীমান্ত-রক্ষক। দুঃখ-দিনের শেষ হতে শুরু করে। তখনো কেউ জানে না, এই শেষ থেকে এক নতুন দিনের পৃথিবীর আয়োজন চলছে। অদৃশ্য থেকে এক কারিগর নানা কলকাঠি নাড়ছেন…

*****

মোটামুটি ১২০০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিক থেকে শুরু হয় পৃথিবীর বাঘা বাঘা মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর পতনের ডামাডোল। ধ্বংসযজ্ঞী মোঙ্গলরা তখন সারা পৃথিবীর ত্রাস! এদিকে আব্বাসি খেলাফতের পতন ঘটিয়ে মোঙ্গলরা হানা দিয়েছে মধ্য-এশিয়ার খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যে। খাওয়ারিজমরা তখন সেলজুকদের অধীন নয়; মুক্ত—স্বাধীন—সার্বভৌম একটি রাজ্যব্যবস্থা। কিন্তু হলে কী হবে! তারা তো তখন মোঙ্গলদের শিকার। আসলে কি মোঙ্গলদের কোনো উদ্দেশ্য ছিল এশিয়াতে হানা দেওয়ার! না-থাকলে কাদের প্ররোচনায় নিজেদের নারকযজ্ঞ তারা বিস্তার করেছিল এশিয়াতেও! কে সেই প্ররোচক? প্ররোচকও কি জানতেন, তিনি প্ররোচনা দিচ্ছেন বিধ্বংসী এক জাতিকে!

ওদিকে সেলজুকরা তখন নামেমাত্র নিজেদের সাম্রাজ্য ধরে আছে। সেখানেও হামলে পড়েছে মোঙ্গলদের পাশবিক থাবা। কিন্তু সেখানে সাম্রাজ্য গড়ার কোনো অভিপ্রায় মোঙ্গলদের ছিল না। তাই বলে সেলজুক সাম্রাজ্য ছেড়ে যায়নি মোঙ্গলরা; পরিণত করেছিল নিজেদের করদরাজ্যে। কোনো স্বাধীন সত্তা যেমন পরাধীন হয়ে থাকতে পারে না, স্বাধীন হয়েই বাঁচতে চায়—সেভাবে সেলজুকরা এভাবে টিকতে পারছিল না; আবার দুর্বারবেগে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে দাঁড়াতেও পারছিল না মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে।

আবার মহা পরাক্রমশালী বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যও তখন ঘোর দুর্দশায়। একে তো সেলজুকরা তাদের রাজ্য ছিনিয়ে নিতে নিতে জেরবার অবস্থা, তার ওপর ল্যাটিনদের আক্রমণে পুরোপুরি পর্যদুস্ত হয়ে পড়েছে এ পরাশক্তি। আর সীমান্তে নিয়মিত কায়িদের হামলায় বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য তখন আক্ষরিক অর্থেই শাঁখের করাত। এমনকি অনান্য খ্রিস্টশক্তির কাছ থেকে না অর্থ-সাহায্য, না সৈন্য-সাহায্য—কোনোটিই পাচ্ছিল না তারা। পৃথিবীর সব রাজ্যের উদয়পথেই তখন এমন ঘনায়মান না-শেষ-হওয়া আঁধার…

*****

এই ঘনীভূত আঁধারেও এক স্বপ্ন-অনড় নেতা বিন্দুমাত্র পিছপা হন না। চতুর্পার্শ্বের হাজারও ধ্বংসের ডগমায় তিনি নিজ লক্ষ্যে অবলীল নিবেদনে পথ চলতে থাকেন। অবিচলতার এ অনুপম গাথা আরতুগরুল গাজি বইতে বিবরণ হয়েছে এভাবে—

এক দিকে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, আরেক দিকে আব্বাসি খেলাফতের ভগ্নদশা, পরন্তু মোঙ্গলদের কাছে সেলজুকদের পরাজয়বরণ এবং সবশেষে মোঙ্গলদেরও কোনো আরোপিত শাসনব্যবস্থা না থাকায় পুরো আনাতোলিয়ায় কেমন যেন এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বলতে গেলে আনাতোলিয়া হয়ে পড়েছিল অরক্ষিত। মগের মুল্লুক বললেও অত্যুক্তি হবে না।

তখনকার বড় বড় ওইসব সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, আনাতোলিয়ায় রাজনৈতিক অরাজকতা, সুষ্ঠু বিচার ও শাসনহীনতার সময় কায়ি গোত্রপতি আরতুগরুল গাজির ক্ষমতা-যোগ্যতা-বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার গুণ তাকে শাসনের যষ্টিধর বানিয়ে দেয়। পশ্চিম আনাতোলিয়ার সুগুত থেকেই আগামীর উসমানি সাম্রাজ্যের নতুন আরেক সূর্য উদিত হতে শুরু করে; ছয় শতাধিক বছর ধরে তিন মহাদেশ জুড়ে যে সাম্রাজ্য মুসলিম-বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু কে জানত—মহান এই সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েই ইতিহাসে জায়গা করে নেবেন আরতুগরুল গাজি!

*****

সেলজুক-সুলতান গোত্রপতি আরতুগরুলকে যে ছোট্ট জায়গির উপহার দিয়েছিলেন, সুগুতের সেই ছোট্ট জায়গিরটুকু একদিন হয়ে উঠেছিল একটি সাম্রাজ্যের বীজতলা! অনেক কষ্টেও না-মনে-পড়া বিস্মৃত বা অখ্যাত কোনো সাম্রাজ্য নয়, এমন এক সাম্রাজ্য, যার স্থায়িত্বের শেকড় পোঁতা থাকবে ছয়শ বছরেরও অধিক সময়ের গভীরে! যা নিয়ে আমরা রোমাঞ্চিত হব—লেখা হবে অনেক অনেক লেখা, কেউ তা ধরতে চাইবেন সেলুলয়েডের ফিতায়।

আমরা জানব—যদি সেদিন অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষায় স্থির না থাকতেন আরতুগরুল গাজি, হতেও পারত, আলোর মুখ দেখত না একটি খেলাফত-ব্যবস্থা। উসমানি সাম্রাজ্য বলে ছয়শ বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ কোনো রাজ্যের পত্তন ঘটত না। ভাবতে আজব কী, ৬০০ বছর আগেই লুপ্ত হত খেলাফত!

কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ বদলে গিয়েছিল—বদলে দিয়েছিলেন এক মহান নেতা; আরতুগরুল গাজি তার নাম। তিনি বরণীয় উসমানি সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। এ যাবৎ বাঙলা-ভাষায় তাকে নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়নি; এবার প্রথম পুনরায় প্রকাশন থেকে এল—উসমানি সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা আরতুগরুল গাজি—নামে।

বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা রয়েছে—

একজন বলিষ্ঠ নেতার ভূমিকায় জাতির জীবনের গতিপথ বদলে যায়। যাযাবরও বেছে নেয় রাজকীয় অভিমুখ। উসমানি সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা আরতুগরুল গাজি সেই মহান নেতা! তারই জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর আয়োজনে বিধৃত এই বই─তাকে নিয়ে বাংলা-ভাষার প্রথম প্রকাশনা।

উল্টো-প্রচ্ছদে লেখা—

হয়তো মহান বিধির খেয়ালই ছিল এমন! মুছে-যাওয়া একটি নাম শত বর্ষ পরে ইতিহাসের ধুলোবালি থেকে খুঁড়ে আনবেন কোনো নওল গবেষক। কিছুই না-বুঝতে-পারা অস্পষ্টের ওপরে ধরবেন অনুসন্ধানের গভীর আতশি কাচ। কান পেতে শুনে নেবেন—ঘোড়ার খুরের আওয়াজ, নতুন শিশুর জন্মনাদ আর তাঁবুর অন্ধকার অন্দরে বেজে-ওঠা মৃদু কোনো নূপুরের নিক্কণ; ট্রেনের দুরন্ত বগির জানলায় দৃশ্যপটের সবই যেমন আধোআধো, তেমন করেই হয়তো চোখে ভেসে উঠবে—ঈগল পাখির ডানার ছায়া-পড়া সুগুতের ছোট্ট জায়গির, ভেড়ার পাল, দাঁড়িয়ে-থাকা একটি বালক—যে কিনা কাল শরণার্থীর এ জীবন ছেড়ে যুবক হবে উসমানি সাম্রাজ্যের স্বাধীন-সার্বভৌম রাজ্যের সনিকেত প্রতিবেশে। আর তাদের এসব আখ্যান আরও শত বর্ষ পর, টিমটিমে তথ্যের পুঁজি নিয়ে প্রথমবারের মতো লিপিত হবে বাঙলা-ভাষায়!

চলুন আরতুগরুল গাজি পাঠের মধ্য দিয়ে শামিল হই ইতিহাসের রোমাঞ্চকর ভুবনে। আমাদের ডাকছে—সুগুতের ছোট্ট জায়গির, শিকারে-নামা কায়ি গোত্রের যোদ্ধাদের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ, ইবনে আরাবির আলো-ঝলমলে দরসের নুরানি ফরশ, মাথার ওপরে তারস্বরে-ডাকা স্বর্ণ-ঈগল আর উসমানি সাম্রাজ্যের প্রাসাদগম্বুজে ঠিকরে-পড়া খেলাফতের অবারিত রোদ্দুর।

*****

বই : আরতুগরুল গাজি
জনরা : নন-ফিকশন
সাব-জনরা : ইতিহাস
লেখক : আইনুল হক কাসিমী
সম্পাদক : নেসারুদ্দীন রুম্মান
প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক : পুনরায় প্রকাশন
কাগজ : 80gm কালারপ্রিন্ট
বাঁধাই : পেপারব্যাক
মুদ্রিত মূল্য : ২১৬৳
পৃষ্ঠা : ১৪৪

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Facebook Comments