আমর ইবনে জামুহ

পঙ্গু তিনি। একটি পা অকেজো। দুর্বল শরীর। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটেন মদীনার পথে। সেই অটুট স্বাস্থ্য নেই। নুয়ে পড়েছে দীঘল মরুপথ পাড়ি দিয়ে, ক্লান্ত উট যেমন নুয়ে পড়ে। চলতে-ফিরতে বড়ো কষ্ট হয় তার। দলবেঁধে চললে পিছিয়ে পড়েন সকলের। জীবনের প্রতি কিছুটা বিরক্তি আছে তার। আছে দারুণ অভিমান। কারণ, খোঁড়া পায়ে তিনি যেতে পারেন না জিহাদে। ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধ-সংগ্রামে অংশ নিতে পারেন না। লোকেরা নিতে চায় না তাদের সাথে। পারবে না বলে রেখে যায় বাড়িতে। হৃদয় তখন বড্ড জ্বালাতন করে তার। চোখ ফেটে অশ্রু আসে। বৃষ্টির ফোটার মতো টপ করে ঝরে পড়ে শুকনো কপোলে।

হযরত আমর ইবনে জামুহ রাদি.। নবীজির প্রিয় সাহাবী। বড্ড ভালোবাসতেন নবীজিকে তিনি। নবীজিও ভালোবাসতেন তাকে। ইসলামের প্রতি তার অসম্ভব ভালোবাসা মুগ্ধ করতো নবীজিকে। চোখের তারা আর হৃদয়ের নিঃশব্দ ভাষায় বিরাজ করতো ইসলামের মোহনীয় দ্যুতি। খুঁড়িয়ে-খঁড়িয়ে আসতেন নবীজির দরবারে। নবীজি দুআ করতেন তার জন্য। আকুল আবেগে তিনি তাকিয়ে থাকতেন দুজাহানের সরদারের দিকে।

আমর ইবনে জামুহ’র ছিলো চার পুত্র। সকলেই তাগড়া জোয়ান। অটুট স্বাস্থ্যের দীপ্তি তাদের। তারুণ্যে ভরপুর পৌরুষ। শরীরে আরবীয় শক্তি। ভালো তীর চালাতে জানেন সকলেই। রণাঙ্গনের লড়াকু বীর তারা। সাহস ও বীরত্বে তাদের খ্যাতি সর্বত্র। জিহাদের ময়দানে ছুটে চলেন ক্ষিপ্র সিংহের ন্যায়।
উহুদ যুদ্ধের ডাক এসেছে। ঘরে-ঘরে সাড়া পড়ে গেছে। তৈরি হচ্ছে প্রতি ঘর থেকে একজন দুইজন করে। সজ্জিত হচ্ছে রণসাজে সবাই। বদরে পরাজিত মক্কার কাফেরদের সাথে ফের লড়াই বাঁধবে উহুদে। নবীজি স্বয়ং সেনাপতি।
আমর ইবনে জামুহ’র চার সন্তান প্রস্তুত হয়েছে যুদ্ধের জন্য। উহুদে যাবে তারা। লড়াই করবে কাফের-মুশরিকদের সাথে। তাদেরকে পরাজিত করে উড্ডীন করবে ইসলামের কালিমা পতাকা। নবীজির ডাকে বাঁজপাখির মতো উড়ে এসেছে তারা।
হযরত আমর ইবনে জামুহ’র কাছে এসেছেন তার চার পুত্র। তারা যুদ্ধে যাবেন। এসেছেন পিতার দুআ নিতে। বিদায় নিতে। যুদ্ধ; যেখানে গেলে ফিরে আসা অনিশ্চিত। হতে পারে শেষ বিদায়। তাই অসুস্থ ও বৃদ্ধ পিতাকে দেখে যেতে এসেছেন, যদি দুনিয়াতে দেখা না হয় আর।
আমর ইবনে জামুহ ছেলেদের মাথায় হাত রেখে দুআ করে দেন। তারপর খানিকটা তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। কোঠরাগত শক্ত চোখ দুটো হঠাৎ ভিজে উঠে। কান্নার্ত কণ্ঠে বিদায় দিলেন পুত্রদের। কাফেলার সাথে চলে যাচ্ছে তারা। পিতা তাকিয়ে আছেন তাদের যাত্রাপথে। যুদ্ধে যাচ্ছে তারা। যেখান থেকে অনেকেই ফিরে আসে না।
আমর ইবনে জামুহ অনুভব করছেন, তার হৃদয় আকাশের মতো বিশাল হয়ে গেছে। চারপুত্র তার জিহাদে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড়ো সৌভাগ্য আর কী হতে পারে আমর ইবনে জামুহ’র জন্য! ডাগর-ডাগর চোখে গর্ব ও সাফল্যের সে পুলক দৃশ্য দেখে আপ্লুত ও আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন তিনি। তার হৃদয়-মনে তখন অপার্থিব উল্লাস।
হঠাৎ বেদনায় নীল হয়ে যায় আমর ইবনে জামুহ’র মন। হৃদয় তার উপচে উঠে অবর্ণনীয় দুঃখে। আফসোসের চোরাবালি ঘিরে ধরে চারদিক থেকে। টেনে নিয়ে যায় মাটির অতলে। অবর্ণনীয় এ কষ্ট ও দুঃখ আর কিছুর জন্য নয়; নবীজির সাথে জিহাদে যেতে না পারায়। সন্তানদের চোখে-মুখে তিনি শাহাদাতের যে অদম্য স্পৃহা প্রত্যক্ষ করছেন তা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। আহ! যদি তিনিও আজ শামিল হতে পারতেন তাদের সাথে। নবীজির পেছনে পেছনে তরবারি হাতে দৌড়াতে-দৌড়াতে ছুটতেন উহুদের রণাঙ্গনে। তাহলে কতো সৌভাগ্যই না হতো তার। শাহাদাতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন তিনি। পঙ্গু পা তাকে বিরত রেখেছে মহাসৌভাগ্য থেকে।
দরজায় বসে কাফেলার যাত্রাপথে তাকিয়ে আছেন। ভাবছেন তিনি। ওরা আমার আগেই বুঝি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাবে। শাহাদাতের পেয়ালায় চুমু দিয়ে উড়বে বেহেশতে পাখি হয়ে। আমি খোঁড়া পা নিয়ে বার্ধক্যে জর্জরিত হয়ে দুনিয়ার উর্মিমালায় হাবুডুবু খেতে থাকবো অবিরাম। চোখে কাতর-কাতর চাহনী আমর ইবনে জামুহ’র। হৃদয়ে অনন্ত পিয়াসা।
একদিকে পুত্রদের যুদ্ধে যাবার আনন্দ; অন্যদিকে নিজে যেতে না পারার বেদনা। দুঃখ-বেদনা আর হাসি-আনন্দের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাহিরে। একটি পা তার। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। লাটিতে ভর করে।
দেখেন এক কিশোর। দৌড়ে ছুটছে মসজিদে নববীর দিকে। তরবারি হাতে। ছুটছে বীর দর্পে। তরবারির ভারে নুয়ে পড়ছে তার হাত।
কিশোর বালককে দেখে আরো অধিকতর অস্থির হয়ে উঠেন আমর ইবনে জামুহ। হৃদয়ে তার দাপাদাপি শুরু করেছে ক্ষিপ্র সাইমুম। বালকের স্পৃহা ও উচ্ছ্বাস বাড়িয়ে দেয় তার আগ্রহ। অস্থির মনে পায়চারি করতে লাগলেন উঠোনে। বারবার স্মরণ হতে লাগলো উহুদের কথা। শাহাদাতের কথা। ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গের কথা।
উঠোনে দাঁড়িয়ে সজোরে ডাকলেন স্ত্রীকে। বললেন, আমিও যাচ্ছি জিহাদে। উহুদে।
: এ কেমন কথা! এক পা আপনি চলতেই তো পারেন না; জিহাদে যাবেন কীভাবে? উহুদ তো অনেক দূরের পথ।
: তাতে কী হয়েছে! দেখছো না, কিশোররা পর্যন্ত উহুদে যাচ্ছে। তাহলে আমি কেন বসে থাকবো ঘরে?
: আপনার চার পুত্র তো সবার সাথে গিয়েছে। আপনার আবার যেতে হবে কেনো? তাছাড়া আপনি তো অসুস্থ। খোঁড়া।
: না, এ কথা তুমি বলো না। আমি চাই, শহীদদের কাফেলায় শামিল হতে। যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে দূর করবে কুফর ও শিরকের অন্ধকার। উড্ডীন করবে ইসলামের বিজয় পতাকা। আমি জিহাদ করতে চাই রাসুলের পেছনে। শহীদ হতে চাই আল্লাহর পথে।
: বেশ তাহলে যান। তবে যাবার আগে নিজের পায়ের দিকে তাকান একবার।
: চুপ থাকো তুমি। আমি যাবই আজ উহুদে।
: ভালো কথা। যান। এক্ষুণি যান। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, আমি যেনো দেখছি, আপনি খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে জিহাদের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসছেন।

উঠোন ছেড়ে দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলেন আমর ইবনে জামুহ। তরবারি হাতে বেড়িয়ে এলেন। চোখে-মুখ থেকে সাহসের অগ্নি ফুলকি ছিটকে পড়ছে। দুর্বল পেশি শক্ত হয়ে উঠে। উঠোনে দাঁড়িয়ে দু’হাত উপরে তুলে এ বলে ফরিয়াদ করেন আল্লাহর কাছে, হে আল্লাহ! ‘হে আমার প্রভু! উহুদের প্রান্তর থেকে আমাকে আর ফিরিয়ে এনো না। আমাকে তুমি তৃপ্ত করো শাহাদাতের শরাপ পান করিয়ে।’
বেরিয়ে পড়েন তিনি উহুদের দিকে। হাঁটতে থাকেন। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। এক হাতে চলার লাঠি। অপর হাতে তরবারি। ঠক ঠক করে। এক পা দুই পা করে। হেঁটে চলছেন এক খোঁড়া মুজাহিদ। মদীনার আকাশ তাকিয়ে দেখছে অসীম প্রেরণায় সমৃদ্ধ নবীজির সাহাবী ইসলামের এক সিপাহসালারকে।
উহুদের প্রান্তর রণসজ্জিত। দু’পাশে প্রস্তুত দুই দল। মুসলমানদের সেনাপতি রাসুল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে। কাফের দলের সেনাপতি আবু সুফিয়ান। বেজে উঠলো যুদ্ধের ডঙ্কা। মুখোমুখি হলো দুই দল। তীব্র লড়াইয়ে কেঁপে উঠলো উহুদের বিশাল পাহাড়। রক্তে লাল ছোপ-ছোপ জিহাদের ময়দান। তাজা রক্তে আছড়ে পড়ছে ঘোড়ার পা। ছিন্ন মস্তক ছিটকে পড়ছে এখানে-সেখানে। উহুদের রণাঙ্গনে কেয়ামত নেমে এসেছিলো সেদিন।
যুদ্ধ শেষ। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। উহুদের আকাশ-বাতাস শহীদদের বিচ্ছেদ-বেদনায় ভারাক্রান্ত। মদীনার ঘরে-ঘরে স্বজন হারানোর বেদনা। বহু মুসলমান শহীদ হয়েছেন উহুদের যুদ্ধে। স্ত্রী হারিয়েছে স্বামীকে। পিতা পুত্রকে। মা ছেলেকে। পুত্র পিতাকে। ভাই তার ভাইকে। কারো ঘরে শহীদের সংখ্যা একজন। কারো ঘরে দুইজন। কারো ঘরে তারও বেশি। কারো ঘরে কেউ নেই। সবাই শহীদ হয়েছে।
লাশগুলো জমা করছে মুসলমানরা। বিশাল উহুদ প্রান্তরে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য শহীদের মরদেহ। রক্তাক্ত। ছিন্ন-ভিন্ন। কর্তিত।
উহুদের আকাশ মলিন প্রান্তরে সেদিন অনেক বেদনার্ত দৃশ্যের অবতারণ হয়েছিলো। লাশের সাড়িতে পাওয়া গেলো হযরত আমর ইবনে জামুহ ও তার চার পুত্রকে। কেউ বেঁচে নেই তাদের।
উহুদের বিপর্যয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে মদীনায়। নারী-শিশু সকলেই ছুটে তারা। অনেকের সাথে এসেছেন আমর ইবনে জামুহ’র স্ত্রী। কারণ তার তো আর কেউ নেই বাড়িতে যে এসে সংবাদটুকু নিয়ে যাবে। স্বামী ও চার সন্তান সকলেই চলে এসছেন। অস্থির চিত্তে তিনি শিবিরের দিকে ছুটলেন। আর চোখ ফেলে এদিক-সেদিক খুঁজে ফিরছেন অন্তত কেউ একজনকে। কিন্তু না, পাঁচজনের কাউকেই দেখছেন না। আহত নবীজিকে ঘিরে আছেন অনেকে। সেদিকে ছুটলেন।
বেদনাবিধুর সে সংবাদ শুনে সামান্য বিচলিত হননি তিনি। স্বামী-পুত্রদের খবর পেতে অস্থির তিনি ছুটে এসেছেন মদীনা থেকে। কিন্তু যেই তাদের শাহাদাতের সংবাদ শুনলেন অমনি হয়ে গেলেন অটল ও অবিচল। হয়তো নির্বাক ও নিশ্চল। মুখে রা নেই কোনো। ভারি প্রশান্ত তার মুখমণ্ডল। হঠাৎ হেসে আনন্দে হেসে উঠেন তিনি। এখন তিনি চার শহীদের জননী। শহীদ স্বামীর স্ত্রী। কত বড়ো সৌভাগ্য। মদীনার আর কে আছে এমন।
উটের পিঠে চার পুত্র ও স্বামীর লাশ উঠালেন তিনি। নিয়ে যাবেন তাদেরকে মদীনায়। সেখানে দাফন করবেন। কিন্তু এ কী! উট যে নড়ছে না এক পা। বহু চেষ্টা করেও উটকে তার জায়গা থেকে নড়ানো সম্ভব হলো না।
আমর ইবনে জামুহ’র স্ত্রী এবার গেলেন নবীজির কাছে। বললেন সমস্যার কথা। উট নড়ছে না তার। তিনি যেতে পারছেন না মদীনায়। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে। মদীনায় গিয়ে দাফন করতে হবে তাদের।
নবীজি ভারি আশ্চর্য হলেন। হৃদয় তার বেদনায় ভরা। ব্যথিত হৃদয়ে নবী আকাশের দিকে তাকালেন। উহুদের আকাশ। এলোমেলো মেঘ উড়ছে পেঁজাতুলোর মতো। আকাশ ও মেঘ যেনো তাকিয়ে আছে উহুদের দিকে। দেখছে শহীদদের। নবীর বেদনায় উহুদের আকাশ-মাটিও ব্যথিত আজ। নবীর দৃষ্টি আকাশ মেধ বিদীর্ণ করে পৌঁছে গেছে দূর লোকে। প্রভুর সান্নিধ্যে। অদৃশ্যে কথা বললেন আরশের অধিপতির সঙ্গে। তারপর বাতাসে দোল খাওয়া গোলাপের পাপড়ির মতো মৃদু দুলে উঠলো নবীজির ঠোঁট দু’টি।
বললেন, ‘হ্যাঁ, উটকে না চলার নির্দেশই দেওয়া হয়েছে।
আচ্ছা, যুদ্ধে আসার আগে আমর ইবনে জুমুহ কী বলে এসেছে কিছু?’
জিজ্ঞেস করেন নবীজি।
: হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল, ঘর থেকে বের হবার সময় তিনি দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন তিনি, ‘হে আল্লাহ! হে আমার রব! আমাকে উহুদের প্রান্তর থেকে আর ফিরিয়ে এনো না।’
নবীজি বললেন, ‘তার দুআ কবুল করেছেন আল্লাহ। তিনি আর মদীনায় ফিরে যাবেন না। তুমি তাকে উহুদেই কবর দিয়ে দাও।’
উহুদের রক্তাক্ত কোলে আমর ইবনে জামুহ ও তার চার পুত্রকে কবর দেওয়া হলো।
কী অপার সৌভাগ্য তার। কী অপার সৌভাগ্য তাদের। স্বামী, স্ত্রী ও তাদের সন্তানদের।
আজো উহুদের মাটিতে শুয়ে আছেন তারা। আজো উহুদের মাটিতে কান পাতলে শোনা যায় তরবারির ঝঙ্কার। উহুদের মাটি শুকলে পাওয়া শহীদদের রক্তের ঘ্রাণ।

তথ্য ও অবলম্বন
আল ইসাবাহ ২/৫২৯
ছুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা ১/৭৫
হায়াতুস সাহাবা ১/৫৫৩

Facebook Comments