অদ্ভুত কিছু সৎকার

মৃত্যু অবধারিত। সারাবিশ্বের সব মানুষের মধ্যেই মৃত্যুর পর বিশেষ নিয়ম পালনের রীতি আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু বিজ্ঞানসম্মত আবার কিছু আছে অদ্ভুত প্রকৃতির। আমরা সাধারণত মৃত্যুর পর মৃতব্যক্তিকে কবর দেওয়া বা দাহ করে ফেলা এই নিয়মের সাথে অভ্যস্ত। কিন্তু জাতি, বর্ণ ও অঞ্চলভেদে মৃতের সৎকারের রয়েছে নানারূপ। কিছু কিছু রীতিনীতি গা শিউরে ওঠার মতো,যা অনেক মানুষের ভাবনা-চিন্তার বাইরে।

এন্ডোক্যানিবালিজম বা স্বজাতিভক্ষণ
এন্ডোক্যানিবালিজম হচ্ছে একটি বিশেষ মৃত্যু অনুষ্ঠান। আমাজন রেইনফরেস্টের ইয়ানোমামো উপজাতি, পাপুয়ানিউগিনির মেলানসিয়ানস উপজাতি এবং ব্রাজিলের ওয়ারীরা উপজাতি এই বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। তাদের সমাজে কেউ মারা গেলে তারা মৃতদেহের সৎকার না করে মৃতের মাংস খায়। তাদের বিশ্বাস, এই রীতি মেনে চললে মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে পৌঁছাতে পারবে। এই উপজাতিরা মনে করে মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী কোনো অশুভ আত্মাকে প্রেরণ করেছে। তাই এ ঘটনা রোধ করার জন্য তারা এই অনুষ্ঠান করে থাকে যাতে মৃতের আত্মা জীবিত থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে। অনেকের ধারণা মৃতব্যক্তির মাংস খাওয়ার মাধ্যমে ওই ব্যাক্তির চারিত্রিক ভালো দিকগুলো তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে।

তারা মৃতদেহকে পাতা দিয়ে মুড়ে জঙ্গলে রেখে আসে। ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরে পচে গলে যাওয়া মৃতদেহ থেকে হাড় নিয়ে আসে। কলা দিয়ে বানানো একধরনের স্যুপে মৃতদেহ পোড়ানো ছাই মিশিয়ে পান করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিশু ও মহিলারা পালন করে থাকে। অনেক নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে স্বজাতিভক্ষণ প্রাচীনকালে কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যেও প্রচলিত ছিল।

আকাশ সৎকার
ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিব্বতে মৃতদেহ সৎকারের এই আকাশ সৎকার পদ্ধতিটি শুরু হয়েছিল দ্বাদশ শতকের কাছাকাছি সময়ে। তিব্বতিদের শেষকৃত্যের এই রীতি তাদের ঐতিহ্য। তিব্বতের মালভূমির গড় উচ্চতা ১৬,০০০ ফুট। তাই এ অঞ্চলকে পৃথিবীর ছাদও বলা হয়। বৌদ্ধ ধর্মানুসারে মৃতদেহকে খালি জাহাজ মনে করা হয় যা সংরক্ষণের দরকার নেই। তিব্বতের কঠিন জলবায়ু ও পাথুরে জমিতে মৃতব্যক্তি সমাহিত করাও কষ্টসাধ্য। তিব্বতি ভাষায় এ প্রথাটির নাম ‘ঝাটর’, যার অর্থ পাখিদের খাদ্য দেয়া। এ প্রথানুযায়ী কারো মৃত্যু হলে দুই তিনদিন মৃতদেহ ঘরে রেখে দেয়া হয়। এই সময়ে সাধুরা নেচে-গেয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করে। এরপর সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে মৃতদেহটি পাহাড়ের উপরে দেহ সৎকারের স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে থাকা সাধুরা কাপড় সরিয়ে কুড়াল দিয়ে দেহটিকে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। অনেক সময় অক্ষত মৃতদেহ রেখে আসা হয়। এই মৃতদের দান করা হয় শকুনের মতো মাংসাশী শিকারী পাখিদের। শকুনেরা শুধু মাংস খেয়েই চলে যায়। তারপর মৃতের হাড়গুলোকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুড়া করে ময়দার সাথে মিশিয়ে ছোট পাখিদের খাওয়ানো হয়। আকাশ থেকে উড়ে আসা পাখিদের সাহায্যে এই সৎকারের কাজ করা হয় বলে একে আকাশ সৎকার বলা হয়।

মমিফিকেশন বা মমি পদ্ধতি
এটি একটি সংরক্ষণ পদ্ধতি। হাজার হাজার বছর আগে মৃতদেহের শরীরের ভেতর থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে বিভিন্ন পচনশীল পদার্থ বের করে সেখানে অন্য পদার্থ দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়া হতো। এরপর শরীরের সব আর্দ্রতা অপসারিত করে লম্বা আকৃতির লিনেন কাপড় দিয়ে দেহ মুড়ে রাখা হতো বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত এক বাক্সে। এই প্রথা তখনকার সময়ে অভিজাতদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। অধিকাংশ গবেষকের মতে, মমির উৎপত্তিস্থল হলো প্রাচীন মিসর। তবে জানা যায়, প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতারও এক হাজার বছর আগে উত্তর চিলি ও দক্ষিণ পেরুর চিনচেরাতে মমির সংস্কৃতি চালু হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে পাপুয়ানিউগিনির মধ্যভাগ ও পশ্চিম অংশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করা উপজাতিদের মধ্যে ‘দানি’ উপজাতি তাদের গোত্রপ্রধান ও যোদ্ধাদের মৃতদেহ মমি করে সংরক্ষণ করে। তারা অবশ্য তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত কৌশল অবলম্বন করে একধরনের প্রাণীজ তেল ও অল্প আগুনের আঁচে অনেকদিন ধরে রেখে এই মমিফিকেশন করে।
আধুনিক মমিফিকেশন অনেকটাই ভিন্ন। বর্তমানে মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য কিছু রাসায়নিক তরল ভর্তি পাত্রে দেহ ডুবিয়ে রাখা হয়।

ভাইকিংদের শেষকৃত্য
দশম শতাব্দীর আরব পরিব্রাজক আহমদ ইবন ফাদলানের বর্ণনায় জানা যায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিখ্যাত ভাইকিং জাতির শেষকৃত্যের কথা। ভাইকিং হলো সমুদ্রচারী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দল।
কোনো গোষ্ঠীপতি মারা গেলে প্রথম পর্বে তার মৃতদেহটি আট থেকে দশদিন একটি অস্থায়ী কবরে রাখা হতো। তার জন্য নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করা হতো। এরপর একজন ক্রীতদাসীকে বাছাই করা হতো যে কিনা মৃতের পরবর্তী জীবনের সঙ্গী হবে। মেয়েটির সাথে সকলে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতো যেটাকে মনে করা হতো মৃতের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন। এরপরই দড়ি দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে তাকে মেরে ফেলা হতো। মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঐ গোত্রের মহিলাপ্রধান তাকে ছুরিকাঘাত করতো। তারপর একটি কাঠের জাহাজে মৃতব্যক্তির সাথে তাকেও রাখা হতো। তাছাড়া সোনা-রুপাসহ আরও অনেক মূল্যবান সামগ্রী রাখা হতো। অবশেষে জাহাজটিতে অগ্নি সংযোগ করে ভাসিয়ে দেওয়া হতো সমুদ্রে।

টোটেম পোলস
টোটেম পোলস হলো একটি দণ্ডাকৃতি স্তম্ভ যেখানে নানা ধরনের পশু-পাখির প্রতিমূর্তি তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত স্থানীয় সভ্যতার বিভিন্ন গল্প তুলে ধরতে তৈরি করা হয়। ‘হায়দা’ উপজাতিরা মৃতব্যক্তির শরীরকে পেটাতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত তা একটি ছোট বাক্সে এঁটে যায়। এরপর এই বাক্সটি একটি টোটেম পোলের উপর রেখে মৃতব্যক্তির বাড়ির সামনে রেখে আসা হয়।

আঙুল কাটার রীতি
পাপুয়া নিউগিনির ‘দানি’ উপজাতির মহিলাদের কাছে পরিবারের কারো মৃত্যু শুধু মানসিক যন্ত্রণার নয়, শারীরিক যন্ত্রণারও বটে। পরিবারের কেউ মারা গেলে শোকের তীব্রতা বোঝাতে মহিলারা স্বেচ্ছায় আঙুল কেটে ফেলেন। এরপর কাঁদা ও ছাই মুখে মেখে মৃতব্যক্তির জন্য শোক পালন হয়। মনে করা হয়, যে যত বেশি আঙুল কাটে তার শোকও তত গভীর। কাটার আগে আঙুলগুলোকে অসাড় করার জন্য শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় অনেকক্ষণ। কাটা হয়ে গেলে আঙুলের অংশগুলোকে পুড়ে ফেলা হয়। যদিও খুব কম তবে এই রীতি আজও প্রচলিত আছে।

রেজোমেশন
মৃতদেহ সৎকারের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হচ্ছে রেজোমেশন। মৃতদেহকে পানি ও ধোয়া-মোছায় ব্যবহৃত তরল ক্ষারের মিশ্রণের সঙ্গে উচ্চতাপে প্রায় ৩২০° ফারেনহাইট তাপে রেজোমেটর নামক মেশিনে উত্তপ্ত করা হয়। এর ফলে মৃতদেহের সাদা বর্ণের ধুলার মতো অবশেষ পাওয়া যায়। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কম নিঃসরণ ও শক্তি সাশ্রয়ী পদ্ধতি বলে একে পরিবেশবান্ধব বলা হয়।

ফামাদিহানা বা মৃতের পুনর্জাগরণ
মাদাগাস্কারের ‘মালাগাসী’ জাতির মধ্যে এটি একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পরপর এটি পালন করা হয়। মালাগাসীরা তাদের আত্মীয়ের মৃতদেহকে তুলে নতুন কাপড় পরিয়ে সমাধিস্থলের কাছাকাছি সংগীত সহযোগে নাচ করে থাকে। পারিবারিক ভোজে মৃতদেহকে বসিয়ে রাখা হয়। মালাগাসী জাতি মনে করে এইভাবে মৃতব্যক্তি পারিবারিক পুর্নমিলন উৎসবে যোগ দিতে পারছে। এই অনুষ্ঠান ‘হাড়ের বাঁক’ বা ‘মৃতের সঙ্গে নাচ’ এই নামেও পরিচিত।

মহাসমুদ্রে মহাযাত্রা
মৃতদেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়ার ইতিহাস বহু পুরনো। তবে তা করা হয় নানা প্রেক্ষিতে। যেমন: যুদ্ধবিগ্রহ বা প্রাকৃতিক কারণে যারা সমুদ্রের বুকে মৃত্যুবরণ করেন।
কিন্তু গত শতকের শেষদিকে স্থলভূমিতে মারা গিয়েও নিজেকে প্রবালের মাঝে শায়িত করার শখ দেখা যায় অনেকের মধ্যে। মৃত্যুর পূর্বে তারা তাদের এই কথা পরিবারকে জানিয়ে যান।
প্রথমে মৃতব্যক্তির ছাইকে কনক্রিটের সঙ্গে মিশিয়ে প্রবালের বল বানানো হয়। এরপর বলটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ দিকে সমুদ্র উপকূলের নিদিষ্ট জায়গায় বা মৃতব্যক্তি অথবা তার আত্মীয়স্বজনের পছন্দের জায়গায় ডুবিয়ে দেয়া হয়।

ঝুলন্ত কবরস্থান
এই পদ্ধতিটি প্রাচীন চীন বংশের মধ্যে দেখা যায়। তারা মৃতদেহকে কফিনে রেখে উঁচু পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত শিলার উপর ঝুলিয়ে রেখে দিতো। তারা মনে করতো মৃতদেহ আকাশের কাছাকাছি রাখা উচিত যাতে করে তা বন্যপ্রাণীদের নাগালের বাইরে এবং সৃষ্টিকর্তার নাগালের মধ্যে বা কাছাকাছি থাকতে পারে।

মৃতের পেশা অনুযায়ী কফিন
এই রীতি অনুযায়ী কোনো মৃতব্যক্তিকে এমন কফিনে রাখা হয় যা তার জীবন বা পেশাকে উপস্থাপন করে। যেমন: কোনো বিমান চালককে বিমানরূপী কফিনে আবার কোনো ধনী ব্যবসায়ীকে একটি দামী গাড়িরূপী কফিনে রাখা হয়।

চোখ বেঁধে পারলৌকিক কার্য
এই রীতি অনুযায়ী মৃতদেহের চোখ বেঁধে তাকে বাড়ির মুখ্য দরজার সামনে রেখে দেয়া হয়।উত্তর পশ্চিম ফিলিপাইনে এটি দেখা যায়।

আতশবাজি ফিউনারেল
মানুষ আসলেই খুব অদ্ভুত। কেউ কেউ আতশবাজিকে এতটাই পছন্দ করেন, এতেই তার শেষ দেখতে চান। এক্ষেত্রে মৃতদেহের কিছু অংশকে প্রথমে আতশবাজির দাহ্য পদার্থগুলোর সাথে মিশিয়ে তারপর বাজি ফাটানো হয়। ধারণা করা হয়, আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে মৃতের আত্মা আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

বসে থাকা মৃতদেহ
ফিলিপাইনের ইফুগাঁও অঞ্চলের কেউ মারা গেলে তার পরিবার মৃতদেহটি ঘরের সামনে বসিয়ে রাখে। হাত-পা বেঁধে বসিয়ে রাখে যাতে সদ্য মৃতব্যক্তিটি পড়ে না যান। দেখলে মনে হবে, বাড়ির উঠানে লোকেরা কাজ করছে আর সে বসে তদারকি করছে। এইভাবে আটদিন পর্যন্ত মৃতদেহ রেখে দেয়া হয়। আত্মীয়স্বজনরা মৃতদেহকে ঘিরে নানা আচার অনুষ্ঠানে মেতে উঠে। শোকপ্রকাশ, হাসিঠাট্টা, অ্যালকোহল পান এসবই চলে মৃতদেহকে ঘিরে।

মৃতের সঙ্গে বসবাস
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের ‘টোরাজা’ উপজাতিরা মৃতব্যক্তির সাথে বসবাস করে। তারা মৃতদেহের সৎকার না করে রেখে দেয় বছরের পর বছর। মৃতের জন্য আলাদা ঘর, আসবাবপত্র, জামাকাপড় এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। প্রতিদিন খাবারও দেয়া হয়। যতদিন পর্যন্ত তার শ্রাদ্ধের জন্য জমকালো আয়োজন করার অর্থ জোগাড় করা সম্ভব না হয় ততদিন পর্যন্ত তারা মৃতের সাথে অদ্ভুত এই জীবনযাপন করে। বিদায়ের দিন মহিষ বলি দিয়ে মহাআয়োজন করা হয়। তারা বিশ্বাস করে মহিষ মৃতব্যক্তির আত্মা স্বর্গে পৌঁছে দিবে।
প্রতি বছর মানেনে নামক এক উৎসবে মৃতদেহকে কফিন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।জামাকাপড় পরিয়ে তাদের ঘোরানো হয় পুরো গ্রাম। শিশু থেকে শুরু করে অনেক বছরের পুরনো মৃতদেহগুলোও বাদ যায় না।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের প্রথা
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মধ্যে কবর দেয়া, মৃতদেহ পোড়ানো, মমিতে পরিণত করা এমনকি মৃতদেহ খেয়ে ফেলার প্রচলনও রয়েছে। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলে আদিবাসীরা প্রথমে মৃতদেহটি উঁচু খোলা জায়গায় রেখে আসে। গাছের শাখাপ্রশাখা দিয়ে ঢেকে রাখা দেহটি পচতে মাসখানেক সময় লাগে। কয়েক মাস পর তারা সেখানে গিয়ে হাড়গুলো নিয়ে আসে এবং সেগুলোতে লাল রং দিয়ে সাজায়। রং করার পর হাড়গুলো কোনো গুহায় বা গাছের ফাঁপা গুঁড়িতে রেখে আসা হয়। কখনো আবার মৃতের আত্মীয়রা হাড়গুলো এক বছর সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

মৃতের বিয়ে
চীনের শাৎসি গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, যে বাড়ির ছেলে অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেছে সে বাড়ি অভিশপ্ত বাড়িতে পরিণত হয়। এভাবে মারা গেলে মৃতের আত্মা শান্তি পায় না এমনকি পরিবারও শান্তিতে থাকতে পারে না বলে তাদের ধারণা। তাই মৃত ছেলের বিয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠে পরিবার। অবিবাহিত মৃত কনের খোঁজ শুরু হয়ে যায়। এই গ্রামের বেশিরভাগ লোকজন খনিতে কাজ করে বিধায় অল্প বয়সে মারা যাওয়াটা স্বাভাবিক। অনেক সময় মৃত ছেলের জন্য মৃত অবিবাহিত পাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে না পেলে মৃত ছেলেকে সমাধিস্থ করা হয়। পাত্রীর খোঁজ পাওয়া গেলে কবর থেকে মৃতদেহ তুলে বিয়ে দেয়া হয়।

সতীদাহ
সতীদাহ প্রথার প্রচলন হিন্দু ধর্মে বর্তমানে নিষিদ্ধ, একটা সময়ে এইভাবে সৎকার হিন্দু ধর্মের সনাতনী ঐতিহ্য হিসেবে মানা হতো। এই রীতি অনুযায়ী, মৃতব্যক্তির স্ত্রীকে বধূবেশে সেজে একই চিতায় মৃত্যুবরণ করতে হতো। ধারণা করা হতো, এর মাধ্যমে স্ত্রী সতিরূপে স্বর্গলাভ করবে।
কিন্তু মানব প্রবৃত্তি অনুযায়ী গায়ে আগুন লাগার পর সেই নারী নিজেকে বাঁচাতে পালাতে চেষ্টা করত। সে যাতে তা করতে না পারে তাই বাঁশ নিয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে থাকতো। বিধবা নারী উঠতে চাইলেই বাঁশ দিয়ে আঘাত করে তাকে আগুনে ফেলা হতো। আবার কখনো কখনো হাত-পা বেঁধেই চিতায় দেয়া হতো।
১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতীদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এসময় বেঙ্গলের গভর্নর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক। রাজা রামমোহন রায়ের সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এ আইনী কার্যক্রম গৃহীত হয়। বিভিন্ন গোড়া সমাজে এরপরও এটা চলতে থাকে। তাই ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় ও ১৯৮১ সালে তৃতীয়বারের মত অমানবিক এ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় সরকার।

মৃতদেহ সৎকারের এই উদ্ভট রীতিনীতি অনেক জায়গায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিছু কালের বিবর্তনে বিলুপ্তপ্রায়। তবে বিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় আজও এই রীতি পালিত হয়।

Facebook Comments